জামায়াতের বিরোধিতা করতে নির্বাচনী প্রচারণায় কেন হঠাৎ মুক্তিযুদ্ধকে সামনে আনছে বিএনপি?
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতাদের বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কথা তুলে ধরে সমালোচনা করছেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর বিতর্কিত ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুল আলোচিত বিষয়। অন্যদিকে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দল হিসেবে দাবি করে আসছে।
এবারের নির্বাচনে ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত থাকায় জামায়াতে ইসলামীই বিএনপির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে। যদিও অতীত ইতিহাস বলছে, একটি দীর্ঘ সময় ধরে এই দুই দল জোটবদ্ধভাবেই রাজনীতি করেছে।
মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে অবস্থানের দাবি থাকা সত্ত্বেও বিএনপি অতীতে একাধিকবার জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচন করেছে, আন্দোলন করেছে এবং সরকার গঠন করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের বিরোধিতা করতে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ সামনে আনার পেছনে বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল, ভোটের হিসাব এবং বর্তমান বাস্তবতা—সবকিছুই কাজ করছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, এটি আদর্শগত পুনর্মূল্যায়ন, নাকি শুধুই নির্বাচনী প্রয়োজনে অবস্থান বদল।
বিএনপির বক্তব্য, একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা তাদের ‘নীতিগত অবস্থান’। তবে জামায়াতে ইসলামী বলছে, একটি ‘মীমাংসিত বিষয়’ নিয়ে এখন কথা বলা অবান্তর।
নির্বাচনী প্রচারণায় মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে জোর
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত তিনটি রাজনৈতিক দল হলো বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এনসিপি এবার জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় জোটের বাইরে থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। ফলে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভোটের মাঠে রয়েছে তাদের এক সময়ের মিত্র জামায়াতে ইসলামী।
নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, দুই দলের মধ্যে বাগযুদ্ধ ও তিক্ততা তত বাড়ছে। যদিও এর আগে উভয় পক্ষই দোষারোপের রাজনীতি না করার কথা বলেছিল।
একদিকে জামায়াতে ইসলামী অতীতে বিএনপির শাসনামলে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলছে, অন্যদিকে বিএনপি জামায়াতের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার বিষয়টি সামনে আনছে।
গত ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু হলে সেদিনই বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান সিলেটের এক নির্বাচনী সমাবেশে মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ১৯৭১ সালে ‘মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার সময় অনেকের ভূমিকা আমরা দেখেছি।’
তিনি বলেন, ‘আপনাদের তো মানুষ একাত্তরে দেখেছে। ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। একাত্তরে মানুষ দেখেছে আপনারা কীভাবে দেশের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।’
ওই দিনটির আগে ও পরে তারেক রহমান তার বিভিন্ন বক্তব্যেও একই প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। শুধু তারেক রহমানই নন, বিএনপির শীর্ষ নেতারাও একাত্তর ও জামায়াত প্রসঙ্গে একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে আসছেন।
২৮ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে এক সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এই দলটা ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। এই দলটা সেই দল, যারা আমাদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে নাই।’
তিনি ভোটারদের উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন, ‘যারা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, তাদের হাতে কি দেশ চালানোর দায়িত্ব দেওয়া যায়?’
জামায়াত ও বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক
২০০৮ সালের পর টানা দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলই রাজনীতিতে কোণঠাসা অবস্থায় ছিল। এ সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দলের বহু নেতা মামলা, হামলা ও কারাবরণের শিকার হন।
অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গোলাম আযমসহ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের বিচার শুরু হয় এবং কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারবিরোধী আন্দোলনে দুই দলকে পাশাপাশি দেখা গেছে। তবে তার আগেও তাদের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতাকারী শক্তিগুলোর পুনর্বাসনে ভূমিকা রেখেছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বিশ্লেষকদের মতে, বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে আওয়ামী লীগবিরোধী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করাই ছিল তার মূল লক্ষ্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন বলেন, আওয়ামী লীগ বিরোধিতার জায়গা থেকে বিএনপি ও জামায়াত আদর্শিকভাবে কাছাকাছি ছিল এবং জামায়াতকে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে বিএনপির বড় ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৩৮ ধারা অনুযায়ী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ হয়। ফলে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক তৎপরতা তখন কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। তবে ১৯৭৬ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে পরিস্থিতি বদলে যায়।
পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামী সরাসরি আত্মপ্রকাশ না করে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) নামে একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে রাজনীতিতে ফেরে। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে আইডিএলের ব্যানারে জামায়াতের নেতারা সংসদে আসেন।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসনে জয় পায় এবং বিএনপির সঙ্গে জোট গড়ে সরকার গঠন করে। ২০০১ সালেও বিএনপি–জামায়াত জোট সরকার গঠন করে। সে সময়ের চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় ছিলেন জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, যাদের পরে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে বিএনপির সাম্প্রতিক সমালোচনাকে ‘ভোঁতা হাতিয়ার’ আখ্যা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আদর্শিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েই বিএনপি এই ইস্যু সামনে আনছে।
তিনি দাবি করেন, শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে এসব বিষয় মীমাংসা করে গেছেন, কিন্তু পরবর্তী সময়ে দলীয় স্বার্থে সেগুলো ব্যবহার করা হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট ছিল কেবল নির্বাচনী কৌশলের অংশ। তিনি বলেন, ‘এর অর্থ এই নয় যে জামায়াতের অতীতের ভূমিকা মুছে গেছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্ম—এই দুই ইস্যুকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীনের ভাষায়, মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের আবেগের বড় জায়গা হওয়ায় জামায়াতকে আক্রমণের মাধ্যমে সেই ভোট ব্যাংক টানার চেষ্টা করছে বিএনপি।
তবে বিশ্লেষকরা এটাও মনে করেন, নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে বক্তব্যের তীব্রতা বাড়লেও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভবিষ্যতে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।