০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:০০

নির্বাচনী প্রচারণায় জামায়াত আমির কি একটু বেশিই আত্মবিশ্বাসী?

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা শফিকুর রহমান  © টিডিসি সম্পাদিত।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে মুহূর্তে জেলায় জেলায় সফর করছেন দেশের বড় দলগুলোর শীর্ষ নেতারা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সফরগুলো বেশ প্রচারণা পাচ্ছে।

দলগুলোর কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তারেক রহমান ও শফিকুর রহমান বিভিন্ন সময় নানা অভিযোগ এনেছেন আবার সমালোচনাও করেছেন। বিএনপির জনসভাগুলোতে মূলত ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ড দেয়ার উপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কার, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট করছেন। অপরদিকে জামায়াত আমির তার জনসভাগুলোতে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করছেন। পাশাপাশি ঘরে বাইরে ও কর্মস্থলে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, কার্ড নয় কর্মসংস্থান নিশ্চিত, বিদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে জোর দিচ্ছেন।

জামায়াত আমির ও বিএনপি চেয়ারম্যানের জনসভাগুলোতে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর সমাগম ঘটছে। এসব জনসভায় দীর্ঘ ১৭ বছর পরে দেশে ফেরা তারেক রহমান নিজের বক্তব্যের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের উজ্জিবিত করছেন। আর ডা. শফিকুর রহমান অনেকটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে নেতাকর্মীদের বিভিন্ন বিষয়ে আশ্বাস দিচ্ছেন। এছাড়া গণভোটের বিষয়েও প্রচারণা চালাচ্ছে উভয় দল। যদিও প্রথম দিকে তারেক রহমানকে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে ভোট চাইতে দেখা যাচ্ছে না, তবে এখন তিনিও হ্যাঁ ভোটের পক্ষে ভোট চাচ্ছেন।

কেন আত্মবিশ্বাসী জামায়াত?

রাজনীতির মাঠে ভোটের আগে এমন আত্মবিশ্বাসী জামায়াতকে আগে দেখা যায়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন দমে মাঠে নামে দলটি। নতুন আবহে কাজ শুরু করে সমমনা আদর্শিক ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। ইতোমধ্যে ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভুমিধস জয় পেয়েছে শিবির। এই জয়ও জামায়াতকে বেশি আত্মবিশ্বাসী করেছে বলে মনে করছেন জামায়াতের কর্মীরা।

গত ফ্যাসিস্ট আমলে জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মীরা বেশি নির্যাতিত হয়েছিল যেসব জেলায় তার মধ্যে অন্যতম সাতক্ষীরা। জেলার বাসিন্দা ও ইসলামী ছাত্রশিবির শহর শাখার নেতা আবু সালেহ সাদ্দাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অন্যবারের তুলনায় আমাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বেশি। মানুষ আমাদের পছন্দ করছেন, গ্রহণ করছেন। ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ চায় দেশের মানুষ। এক্ষেত্রে ছাত্রসংসদ আমাদের অন্যতম মডেল। শিবির বিজয়ী হওয়ার পরে ক্যাম্পাসগুলোর চিত্র পাল্টে গেছে। যুব সমাজ এখন জামায়াতের পলিসিতে আস্থা রাখছে। 

৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাংলদেশের হিন্দু ধর্মের মানুষের বাড়িঘর এবং ধর্মীয় উপাসনালয় দিনের পর দিন পাহারা দিয়েছে জামায়াত। এই কারণে তারা হিন্দুদের কাছে আস্থাভাজন হতে পেরেছে বলে মনে করেন দলটির নেতাকর্মীরা। হিন্দু ধর্মের বেশি বসবাস এমন একটি এলাকা খুলনার দাকোপ উপজেলা। হিন্দু-অধ্যুষিত খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) আসনে জামায়াতের প্রার্থী করা হয়েছে কৃষ্ণ নন্দীকে। সম্প্রতি তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি ২০০৩ সাল থেকে জামায়াত করি। এই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে শৃঙ্খলা এবং নিয়ম মেনে চলার প্রবণতা রয়েছে। আমি আশা করছি শুধু আমার আসনেই নয়, দেশের সবপ্রান্তের হিন্দু জনগোষ্ঠী জামায়াতকে ভোট দিবেন। জামায়াতের কাছে নিজেদের নিরাপদ বলেও মনে করেন এই প্রার্থী। 

তিনি বলেন, জনগণ আমাকে সুযোগ দিলে বাংলাদেশের সংসদে দাঁড়িয়ে হিন্দুদের অধিকার নিয়ে কথা বলবো। তাদের সমস্যা সমাধানে নিজের সবটুকু দিয়ে কাজ করবো।

আরও পড়ুন : জামায়াতের প্রার্থী তালিকায় রাবি-চবির আধিপত্য, ঢাবি-জাবি-জবি-ইবি থেকে কতজন?

আসনটি চালনা পৌরসভা জামায়াতের আমির নজরুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, দল হিসেবে আমরা মজলুম ছিলাম। ফ্যাসিস্ট দল আওয়ামী লীগ শেষ মুহূর্তে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, কিন্তু আমরা থেমে যাইনি। স্বাভাবিকভাবেই আমরা এবার আত্মবিশ্বাসী। আমরা ঘরে ঘরে যাচ্ছি জনগণ আমাদের গ্রহণ করছেন। এই মেসেজ কিন্তু দলের শীর্ষ পর্যায়ে যাচ্ছে, তাই আমাদের আমির ডা শফিকুর রহমানও আত্মবিশ্বাস পাচ্ছেন, সেটি বক্তব্যেও ফুটে উঠছে।

নারীদের মধ্যে আগে থেকেই কাজ করে আসছেন জামায়াতের মহিলা বিভাগের নেতাকর্মীরা। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটের তফশিল ঘোষণার আগেই ভোট চেয়েছেন তাদের কর্মীরা। এমনকি প্রচারণা শুরুর পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় জামায়াতের নারী কর্মীদের অপর হামলা ও হেনস্তার অভিযোগও উঠেছে। প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন নারী কর্মীরা। জামায়াত আমির তার সবগুলো জনসভায় এই বিষয়গুলো তুলে আশ্বাস দিচ্ছেন, দলটি সরকার গঠন করলে নারীদের সুরক্ষার নানা কাজ করবে। ঘরে বাইরে ও কর্মস্থলে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি মায়েদের জন্য ডে কেয়ার ও আলাদা ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার করার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত। 

জামায়াতের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নূরুন্নিসা সিদ্দীকা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে কাজ করেছেন। নারীরা এখন জামায়াত নেতৃত্বকে নিরাপদ মনে করছে। সারা দেশে জামায়াতের পক্ষে গণজোয়ার উঠেছে। আমরা আশাবাদী জনগণ আমাদের পলিসিগুলোর উপর ভরসা করে দায়িত্ব দিলে আমরা অধিকার নিশ্চিত করবো ইনশাআল্লাহ।

এছাড়াও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়, অতিতে দায়িত্বে থাকা জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ না থাকা এবং চাঁদাবাজি ও দখলবাজদের বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণে জনগণ তাদের গ্রহণ করবে বলেও বিশ্বাস জামায়াত নেতাকর্মীদের। 

ভাঙতে পারে আত্মবিশ্বাস

জামায়াত আমিরের এমন দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রচারণার পরও কতটা সফল হবে দলটি? বিষয়টি নিয়ে চলছে আলোচনা। কারণ ইতোপূর্বে ভোটে অংশ নিয়ে কোন জাতীয় নির্বাচনেই খুব একটা ভালো ফলাফল নেই জামায়াতের। সবমিলিয়ে কোন নির্বাচনেই ভোটের শতাংশে দুইঅঙ্কের ঘর পেরাতে পারেনি দলটি।

এছাড়া ১৯৭১ সালে সংঘটিত মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের অবস্থান নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। ইস্যুটি নিয়ে জামায়াতকে অনেকে দেশের রাজনীতিতে কোণঠাসা করার চেষ্টা করে আসছে। এছাড়া ইসলামী দল হওয়ায় তারা ক্ষমতার মসনদে বসলে নারীদের স্বাধীনতা হরণ করতে পারে বা ইসলামী শরীয়া আইন চাপিয়ে দিতে পারে বলেও অভিযোগ অনেকের। যদিও দলটির পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে নারীরা স্বাধীনভাবে চলতে পারবেন এবং শরীয়া আইন চাপিয়ে দেয়া হবে না। তবে এসব কথা ভোটারদের কতটা মনে ধরবে তার জন্য অবশ্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

জামায়াত ভোটের মাঠে বেশ আত্মবিশ্বাসী হলেও জনসভার বক্তব্যগুলো একটু কড়া উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, তারা (জামায়াত) আত্মবিশ্বাসী ভোটের জেতার জন্য কিন্তু তাদের যে বক্তব্যগুলো সেখানে আরো সংযত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। যেহেতু বক্তব্যগুলো এক প্রকার ভায়োলেন্সের দিকে চলে যায় বা ভায়োলেন্সকে উৎসাহিত করে। উনি যখন বলেন, পেটের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে পাচার করা অর্থ বের করে আনা হবে, তখন কর্মীরা কিন্তু উদ্বুদ্ধ হবে।

তারেক রহমান দীর্ঘদিন পরে দেশে ফেরায় তার বক্তব্যে দেশের বিরজমান রাজনীতির ছোঁয়া কম বলে মনে করেন এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, তারেক রহমানের একটু সময় লাগবে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে। দীর্ঘদিন লন্ডনে থাকায় সেখানকার 'সফট' নেচার তার বক্তব্যে উঠে আসতেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে জামায়াত আমির বেশ জোরালো আওয়াজ তুলছেন।

দুই জোটের কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না বা আস্থার জায়গাটা দুর্বল বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, জামায়াতের নেতাকর্মীদের আত্মবিশ্বাস অনেকটা বেশি হলেও দুই জোটের বড় নেতাদের বক্তব্যে একটি বিষয় পরিস্কার, সেটি আস্থা ও বিশ্বাসের অভাব।