মামুনুলের শক্তি মোহাম্মদপুরের প্রভাব-প্রতিপত্তি, ববির আছে অক্সফোর্ডের উচ্চশিক্ষা-ধানের শীষ
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর এবং শেরেবাংলা নগর থানার আংশিক নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৩ আসন। আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই সন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও মাদক সমস্যায় জর্জরিত। প্রার্থীরাও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন এসব নাগরিক সমস্যা সমাধানের। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আলোচনায় আছে আসনটি। আসনটিতে আলোচিত প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক ও বিএনপির প্রার্থী ববি হাজ্জাজ। ভোটারদের মাঝেও আগ্রহ রয়েছে এই দুই প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি নিয়ে। ফলে আসনটিতে মূলত এই দুই প্রার্থীর মাঝেই মূল লড়াই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়াও আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, মোঃ মুরাদ হোসেন (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ); ফাতেমা আক্তার মুনিয়া (ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ); মোঃ শাহাবুদ্দিন (বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি - বিএমজেপি); সোহেল রানা (স্বতন্ত্র)।
মামুনুল হকের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
ফ্যসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের পরিচিত মুখ মাওলানা মামুনুল হক একাধারে দেওবন্দি ইসলামি পণ্ডিত, রাজনীতিবিদ, ইসলামি বক্তা, লেখক ও অধ্যাপক। তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম-মহাসচিব। ১৯৯৩ সালে জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া থেকে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের অধীনে কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় উচ্চ মাধ্যমিকে প্রথম স্থান, ১৯৯৫ সালে স্নাতকে তৃতীয় স্থান এবং ১৯৯৬ সালে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। পাশাপাশি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স সমাপ্ত করেন। তিনি পেশা জীবনে বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের খণ্ডকালীন অধ্যাপক ছিলেন। এছাড়াও তিনি বায়তুল মামুর জামে মসজিদের খতিব। তার সম্পাদিত ও প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ছিল মোট ১৭ টি। ২০০১ সাল থেকে তিনি মাসিক রাহমানী পয়গামের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে তিনি কয়েকদফায় কারাবরণ করেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা করা হয়। তার পিতা আজিজুল হক ছিলেন একজন বাংলাদেশি ইসলামি পণ্ডিত ও সহিহ বুখারীর প্রথম বাংলা অনুবাদক, যিনি ‘শায়খুল হাদিস’ নামে সমাধিক পরিচিত।
ববি হাজ্জাজের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
ববি হাজ্জাজ রাজনীতি ছাড়াও শিক্ষকতায় জড়িত। তিনি রাজনৈতিক দল জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম প্রতিষ্ঠাতা ও ববি হাজ্জাজ ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টের (এনডিএম) প্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমানে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তিনি আলোাচিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরের পুত্র। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করা ববি হাজ্জাজ শুরুতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের উপদেষ্টা হিসেবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। পরে তিনি নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে এনডিএম গঠন করেন। নব্বইয়ের দশকে অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতকোত্তর পড়ার সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পত্রিকার জন্য লিখেছিলেন, তিনি একাধিক রাজ্য সিনেট এবং গর্ভনারেটাল নির্বাচনী প্রচারণায়ও কাজ করেছিলেন। স্নাতক শেষে তিনি বাংলাদেশে ফেরার আগে এক বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আর্থিক শিল্পে কাজ করেছিলেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি প্রথমে এমবিএ করেন (২০০৬) এবং পরে কৌশল বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর গবেষণা চালিয়েছিলেন।২০০৯ সালের শেষের দিক থেকে, হাজ্জাজ বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। ফিরে আসার পরে তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসায়িক কৌশলতে প্রভাষক এবং গবেষক হিসাবে কাজ করেছেন। ২০১৫ সালে উত্তর ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী মেয়র পদে নির্বাচন করেছিলেন।
হাতপাখা সরে যাওয়ায় চাপমুক্ত মামুনুল
আসনটিতে জামায়াত ইসলাম নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট বা ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’ জোটের প্রার্থী মামুনুল হক। তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ছাড়াও হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব। জোট সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মাওলানা মামুনুল হক তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল মোহাম্মদপুর এলাকায় রাজনৈতিক ভিত্তি শক্ত হওয়ায় ঢাকা-১৩ আসনকেই চূড়ান্ত করেছেন। ইসলামী বক্তা হিসেবেও সুখ্যাতি আছে মামুনুল হকের। এছাড়া হেফাজত ইসলামের এই নেতা ভারতবিরোধী অবস্থানের কারণেও পরিচিতি লাভ করেছেন। এছাড়া মোহম্মদপুর এলাকায় কওমী ঘরানার সমর্থকদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। মোহাম্মদপুরের ঐতিহ্যবাহী জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসাটিও মামুনুল হক ওতার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে কয়েক যুগ ধরে। ফলে দীর্ঘসময় ধরেই এই এলাকায় তাদের পারিবারিক প্রভাব রয়েছে। সবমিলিয়ে এই আসনটিকে মামুনুল হকের জয়ের জন্য উপযুক্ত মনে করেছে তার দল ও জোট।
মামুনুল হকের জয়যাত্রায় সবচেয়ে বড় বাঁধা ছিলো জোটের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বিচ্ছেদ। শেষ মূহুর্তে জোট ছেড়ে একক নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে দলটি। যদিও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মামনুুল হকের সম্মানে আসনটি ছেড়ে দিয়েছে। আসনটিতে হাতপাখা মার্কার প্রার্থী ছিলেন মোঃ মুরাদ হোসেন। জানা গেছে, ইসলামী আন্দোলনের তৃণমূল থেকে উঠে এসেছেন তিনি, স্থানীয় পর্যায়েও পরিচিত মুখ। এছাড়াও ঢাকার মধ্যে মোহাম্মদপুরে ইসলামী আন্দোলন ও এর সহযোগী সংগঠন ইসলামী যুব আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন সুসংগঠিত। অনেকে মনে করছেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ উভয় দলই কওমী ঘরানার ও ইসলামী দল হওয়ায় কওমী সমর্থক ও ধর্মপ্রাণ ভোটারদের ভোট ভাগাভাগি হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। তবে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে আসনটি ছেড়ে দেওয়ায় মামনুল হকের জন্য পথ সহজ হয়েছে।
এছাড়াও ধর্মপ্রাণ মানুষের এলাকা হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় ঐক্যবদ্ধ বাংলোদেশ জোটে থাকা অন্য ইসলামী দলগুলোর অবস্থানও ভালো। বিশেষ করে আসনটিতে জামায়াত ইসলামের প্রার্থী হওয়ার কথা ছিলো দলটির কেন্দ্রীয় নেতা মোবারক হোসেনের। নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে মাঠ চষে বেড়িয়েছেন তিনিও। তিনি জোটের সিদ্ধান্তে মামুনুল হককে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সড়ে এসেছেন। সবমিলিয়ে মামুনুল হকের জয়ের বিষয়ে ব্যাপক আশাবাদী তার সমর্থকরা।
ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন ববি
আসনটিতে শক্ত অবস্থান রয়েছে বিএনপিরও। বিএনপি’র ববি হাজ্জাজ একজন পরিচিত মুখ। সুশিক্ষিত ববি হাজ্জাজ জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ছিলেন। নির্বাচনের আগে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনের জন্য তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। আসনটিতে জয়লাভের জন্য দিন-রাত এক করে দৌঁড়চ্ছেন তিনি। মতবিনিময় সভা করছেন, বাড়ি বাড়ি যেয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন তিনি। বিশেষ করে বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকায় ভোটারদের মাঝে আগ্রহ তৈরি হয়েছে তাকে নিয়ে। তার জয়ের বিষয়েও আশাবাদী তার সমর্থকরা।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ এবং ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে আসনটি গঠিত। ২০০৮ সালের সীমানা পরিবর্তনের আগে এই আসনটি ছিল ঢাকা-৯। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত আসনটি ছিল জাতীয় পার্টির দখলে। ১৯৯১ সালে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির হাতে ছিল আসনটি। ১৯৯৬ সালের জুনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মকবুল হোসেন এ আসনের সংসদ সদস্য হন। ২০০১ সালে আবার আসনটি চলে যায় বিএনপির দখলে। সংসদ সদস্য হন খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমাদ।