৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬:২০

আমরা আর কোনো ফ্যাসিবাদ দেখতে চাই না, দেশকে এগিয়ে নিতে চাই: জামায়াত আমির

চৌদ্দগ্রাম পাইলট হাইস্কুল মাঠে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জনসভায় বক্তব্য দিচ্ছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান  © সংগৃহীত

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ মানুষ একটি পরিবর্তন দেখতে চাচ্ছে। ১২ তারিখের পর ১৩ তারিখ থেকে যে পরিবর্তন আসবে, তা আসবে এ দেশের মানুষের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার ওপর ভর করে। আমরা আর কোনো আধিপত্যবাদকে মানব না, আমরা আর কোনো ফ্যাসিবাদ দেখতে চাই না। আমরা আর কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার দেখতে চাই না। আমরা একটি মানবিক বাংলাদেশ দেখতে চাই। আমাদের এই ১১ দল আপনাদের আকাঙ্ক্ষায় বাংলাদেশ পরিচালিত করবে ইনশাআল্লাহ।

আজ শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টায় চৌদ্দগ্রাম পাইলট হাইস্কুল মাঠে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

জামায়াত আমির বলেন, ‘চৌদ্দগ্রামের প্রতি ইঞ্চি মাটি আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে খুব ভালোভাবেই চিনে, তাই আপনাদের সামনে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া মানে মাসির সামনে মায়ের গল্প বলার মতো। সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহেরকে আপনারা যদি নির্বাচিত করেন, তাহলে মন্ত্রী পরিষদের একজন সিনিয়র সদস্য আপনারা কুমিল্লা থেকে পাবেন। এখন সেই সিদ্ধান্ত আপনাদের নিতে হবে। কুমিল্লাবাসী যেমন মজলুম ছিল, আমরাও মজলুম ছিলাম। তাই এখনে যারা মজলুম আছে, আমরা তাদের পক্ষে আছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাচ্ছি না, ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। চৌদ্দগ্রামে ১১ দলের প্রতীক দাঁড়িপাল্লা। এই প্রতীককে সামনে নিয়ে এগারো দলকে লড়ে যেতে হবে। যেখানে যে প্রতীক, আমরা সেই প্রতীকের সঙ্গী হয়ে যাব ইনশাআল্লাহ, এভাবে ১১ দলের বিজয় চূড়ান্ত করতে হবে।’

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘সত্যের বিজয় হবেই ইনশাআল্লাহ। ৫ আগস্টের পরে আপরারা দেখেছেন, কার কী চরিত্র। যারা আমাদের সম্পদে হাত দেয়, আমার জীবনে হাত দেয়, যারা নিজেদের জীবনকেই শেষ করে দেয় এবং যারা আমার মায়েদের ইজ্জতে হাত দেয়, মায়েদের পেটে লাথি মারে, মায়েদের কাপড় খুলে নেয়ার হুঙ্কার দেয়, তাদের হাতে কি বাংলাদেশের ৯ কোটি মা-বোন নিরাপদ? সাধারণ পোশাক পরা মহিলাও এখন জামায়াতকে ক্ষমতায় দেখতে চাচ্ছে। এটিই তাদের পেরেশান করে তুলেছে! ভাই, আপনাদেরওতো ঘরে মা আছেন, স্ত্রী আছেন, জায়া আছেন। অন্তত তাদের দিকে তাকিয়ে নারীদের সম্মান করতে শিখুন।’

তিনি বলেন, ‘অনেকে জুলাইকেও স্বীকার করেছেন বা করেনও না। এদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল করেছেন। জুলাইয়ের ছেলেরা এখনো ঘুমিয়ে পড়েনি। আল্লাহর ওয়াস্তে সেই পথ থেকে ফিরে আসুন। অন্যের মতের প্রতি সম্মান দেখান, নিজের চরিত্র নিয়ে মানুষের কাছে যান, আদর্শ নিযে যান। জনগণ বিচার-বিবেচনা করবে। আমাদের মায়েদের উপর হাত দেবেন আর আমরা বসে বসে দেখব, এটা হতে পারে না। তখন আমাদের জবার দেওয়া ওয়াজিব হয়ে যাবে। তাই সময় থাকতে ফিরে আসুন। মায়ের জাতিকে সম্মান করুন।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘আমাদের অঙ্গীকার তো স্পষ্ট; চাঁদাবাজিসহ যত দুর্নীতি আছে, আমরা এগুলোর জড় কেটে দিতে চাই। এতে কারও ভয় পাওয়ার তো কিছু নাই। জাতিকে আর কষ্ট দিয়েন না। একসময় আপনারাও তো মজলুম ছিলেন। আমার বুঝে আসে না, মজলুম কীভাবে জালিম হয়? আমরা আশা করি, সংশোধন হবেন।’

কওমি মাদ্রাসা প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এখানে আছেন আল্লামা মামুনুল হক। তিনি তার বংশীয় ধারাক্রমে কওমীর একজন প্রতিনিধিত্বকারী। তাকে সাথে নিয়ে কি আমরা কওমি মাদ্রাসা বন্ধ করব নাকি? এরকম আরও অনেকে আমাদের সাথে আছেন। কওমী বন্ধের গুজব মিথ্যা। তবে মানুষ পোড় খেতে খেতে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, মানুষ আর গুজব কানে তুলে না। আল্লাহ যদি আমাদের সরকার গঠনের সুযোগ দেন, তাহলে বেফাকের সাথে বসে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। এখানে আরও মাদ্রাসার প্রতিনিধি আছেন। দ্বীনি শিক্ষাটি ধরে রেখেছে কওমি মাদরাসা। আমরা দ্বীন চাই, কেন আমরা কওমি মাদরাসা বন্ধ করব?’

তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ে আবু সাঈদ জীবন দিয়েছিল ছাত্রদের অধিকার রক্ষার জন্য। সে নিজের বুকের ডানা মেলে বলেছিল, হয় আমার অধিকার দে, না হয় আমারে গুলি কর। আমরা তাদের গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি, বিগত ১৫ বছর যারা জুলুমের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের। এই জুলাইয়ের যুবক যুবতীরা বেকার ভাতা চায়না। তারা তো বলেন, আমাদের বেকার বাধা দেন। তাহলে কেন বেকার ভাতার প্রসঙ্গ আসলো? আমরা তাদের হাতকে শক্তিশালী করতে চাই। আমরা দেশটিকে যুবকদের হাতে তুলে দিতে চাই। আর বাস্তব প্রমাণ হলো যুবক তরুণদের দল আমাদের সাথে আছে। নির্বাচনে ক্যান্ডিডেট যাদের করেছি তাদের ৬২ ভাগ যুবক। এটা হবে তরুণ্যের বাংলাদেশ। এটা হবে যৌবনদীপ্ত বাংলাদেশ।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য এখন শুধু সম্মুখপানে যাওয়া। আমাদের লক্ষ্য জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে যাওয়া। তাই দলের ভিতরে দলকে হজম করার নীতিতে আমরা বিশ্বাস করি না। প্রত্যেকের সম্মানের জায়গা সমুন্নত রেখে নিজ নিজ পথিকের সব দল নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়েছে। আমরা ঘোষণা দিয়েছি, ১১ দলের যে প্রতীক যেখানে থাকবে, সেটাই হবে সবার প্রতীক। এভাবে আমরা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার একটি বার্তা দিয়েছি।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা কথা দিচ্ছি, ইনশাআল্লাহ আগামীতে ঐক্যের সরকার গঠিত হবে। আল্লাহ তায়ালা যদি আমাদের সরকার গঠনের সুযোগ দেন, তাহলে এখন যারা আমাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাদেরকেও বলবো; আসেন আমাদের সাথে, আপনারাও অবদান রাখেন। শর্ত মাত্র ৩ টি। ১। নিজেরা দুর্নীতি করবেন না, অন্যকেও করতে দিবেন না, ২। সকলের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শিশু থেকে বৃদ্ধ কারো প্রতি কোন বাছ বিচার করা হবে না। দেশের নাগরিক অথবা এ দেশে বসবাসকারী কিন্তু এ দেশের নাগরিক নয়, তারও ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। সেই ন্যায় বিচার আমরা নিশ্চিত করব। দেশের কোনো রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী এতে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। একজন সাধারণ নাগরিকের অপরাধের জন্য যে বিচার করা হবে, দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী সেই অপরাধ করে থাকলে তাকেও ছাড় দিয়ে কথা বলা হবে না। ৩। এই জুলাই সংস্কারের সব প্রস্তাব বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করতে হবে। এই তিন জিনিস যারা মানবে তাদের একসাথে বুকে জড়িয়ে আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এই জাতিকে আর বিভক্ত করতে চাইনা। ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, পরিবার কারো স্বার্থ দেখবো না। আমরা ১৮ কোটি মানুষের স্বার্থ দেখব। এই দেশে শুধু আমরা মুসলমানরা বসবাস কিনা; আরো তিনটি ধর্মের মানুষ বসবাস করে। আমরা তাদের কথা দিচ্ছি, আপনারা পূর্ণ স্ব ভোগ করবেন, কেউ বাধা দিবে না। কেউ আপনাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে কারো ধর্ম দেখা হবে না। দেখা হবে তিনি ওই দায়িত্ব পাঠানোর জন্য যোগ্য কিনা, আর তার মধ্যে দেশপ্রেম আছে কিনা। এই দুই শর্ত পূরণ হলে উপযুক্ত কাজটি যে কোন যোগ্য নাগরিকের হাতে চলে যাবে।’

শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে চাই। এই শিক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে কিছু হবে না। বেটার এডুকেশন, বেটার নেশন। এডুকেশন যদি ভালো না হয়, তাহলে একটা ভালো জাতি আমরা গড়ে তুলতে পারবো না। আমাদের এই এডুকেশন দিয়ে আমাদের দুনিয়া না আমাদের আখেরাত, কোনটাই কাভার করা যায় না।। এখানে বড় পরিবর্তন লাগবে আমাদের।’