ফ্যাক্ট বিএনপির চেয়ারম্যান, কম যান না ডা. খালিদুজ্জামানও
‘প্রদীপের নিচে অন্ধকার’, প্রবাদটির উদাহরণ হতে পারে ঢাকা-১৭ আসন। কারণ একদিকে যেমন অভিজাত সব সড়কের পাশে সুউচ্চ দৃষ্টিকারা ভবন অপরদিকে বস্তির বাসিন্দাদের জীবন যুদ্ধের চিত্র। গুলশান, বনানী আর কড়াইল নিয়ে গঠিত আসনটিতে প্রার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত উভয় ভোটারদের আস্থা অর্জন করা। এছাড়াও বিদেশি দূতাবাসগুলোর অবস্থানও এখানে, ফলে কূটনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে আসনটির। সবকিছুর ঊর্ধ্বে আসনটি সবার নজরে আসার কারণ বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আসনটিতে ধানের শীষের প্রার্থী। ফলে অনেকের ধারণা, আসনটিতে নিরঙ্কুশ বিজয় আসবে তার। তবে মাঠে সমানে ছুটে বেড়াচ্ছেন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী জামায়াত ইসলামের স ম খালিদুজ্জামান। দীর্ঘসময় ধরে আসনটিতে কাজ করছেন তিনিও। ফলে অনেকেরই প্রশ্ন তারেক রহমান কি ফাঁকা মাঠে গোল দিবেন না কি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হবে?
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ১৫, ১৮, ১৯ ও ২০ নম্বর ওয়ার্ড এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকা নিয়ে এই আসনটি সাজানো হয়েছে। এ আসনের আওতায় গুলশান, বনানী, নিকেতন, মহাখালী, বারিধারা, শাহজাদপুর , ঢাকা সেনানিবাসের একটি অংশ এবং কড়াইল বস্তি, সাততলা বস্তি ও ভাষানটেক বস্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৪০ হাজার ৪৮০। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৪২ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৬৫ হাজার ৩৬৮ জন।
আসনটিতে তারেক রহমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় সকল হিসাব নিকাশ বদলে গেছে বলে মনে করছেন ভোটারদের অনেকে। আসনটির একাধিক ভোটার জানান, নির্বাচনি ট্রেনের হুইসেল বাজার অনেক আগেই মাঠে নামেন জামায়াতের প্রার্থী খালিদুজ্জামান। আসনটিতে নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন তিনি। শুরুতে বিএনপি জোট থেকে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সভাপতি আন্দালিব রহমান পার্থর প্রার্থী হওয়ার কথা ছিলো। ফলে জয়ের বিষয়ে আশাবাদী ছিলেন খালিদুজ্জামানের সমর্থকরা। তবে তারেক রহমান আসনটিতে প্রার্থীতা করার ঘোষণা দেওয়ায় সমীকরণে বদল এসেছে।
জানা গেছে, সারাদেশে নির্বাচনি প্রচারণায় তারেক রহমান ব্যস্ত সময় পার করায় আসনটিতে প্রচারণার জন্য বিএনপি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি তারেক রহমানের নির্বাচনের সমস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তারেক রহমান প্রার্থী হওয়ায় আসনটিতে দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে কাজ করছেন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। ইতোমধ্যে কড়াইল ও ভাষানটেকে দুইটি সভা করেছেন তারেক রহমান; কথা বলেছেন, সেখানকার সাধারণ মানুষদের সাথে।
স্থানীয় বিএনপি সমর্থক রাশেদুল ইসলাম বলেন, আগামীর প্রধানমন্ত্রী এই আসন থেকে নির্বাচন করছে, এটা আমাদের জন্য অনেক বড় ব্যাপার। প্রধানমন্ত্রীর আসন হিসেবে আমরা আশাবাদী এলাকায় অনেক পরিবর্তন আসবে। আমরা ভোটারদের সঙ্গে কথা বলছি । তাদেরও একই অনুভূতি, তারেক রহমান এই আসনকে বেছে নেওয়া আমাদের জন্য আশীর্বাদ।
তবে আশা ছাড়ছেন না জামায়াত নেতাকর্মীরাও। প্রচার-প্রচারণাও ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। বাড়ি-বাড়ি যেয়ে ভোট চাচ্ছেন নারী-পুরুষ উভয়ের কাছে। তাদের ভাষ্যমতে, হেভিওয়েট প্রার্থীর থেকেও ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কারা অতীতে পাশে ছিলো তাদের। এছাড়া সারাদেশে জামায়াতের পক্ষে ভোটারদের ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে, যার প্রভাব ঢাকা ১৭ আসনেও দেখা যাবে।
মহাখালীর বাসিন্দা রতন আহম্মদ বলেন, এখানে মূল লড়াইটা হবে ধানের শীষ আর দাঁড়িপাল্লার। ভোটাররাও দুইভাগে ভাগ হয়ে আছে। তারেক রহমান এখানে শক্তিশালী প্রার্থী। তবে তিনি ১৭ বছর দেশের বাইরে ছিলেন। ভোটের কিছুদিন আগে এসেছেন। তারপরও বড় দলের প্রধান হিসেবে সবাই তাকে চেনে। আর জামায়াতের প্রার্থীর ভালো গ্রহণযোগ্যতা আছে ভোটারদের কাছে। অনেক আগে থেকে কাজ করছেন তিনি। মনে হচ্ছে ভোট একপাক্ষিক হবে না বরং প্রতীদ্বন্দ্বীতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কদর বেড়েছে বস্তিবাসীর
নির্বাচন ঘিরে কদর বেড়েছে করাইল, সাততলা ও ভাষানটেক বস্তির ভোটারদের। ভোটারদের একটি বড় অংশের আবাস এই বস্তিগুলোতে। এই তিন বস্তিতে প্রায় ১ লক্ষ ভোটারের বসবাস। এরমধ্যে করাইল বস্তির ভোটার সংখ্যায় ৪৫ হাজারের বেশি। ফলে বিএনপি-জামায়াত উভয় দলের প্রচারণায় গুরুত্ব পাচ্ছে এসব এলাকা। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে শুনছেন সমস্যা, চাচ্ছেন ভোট। ভোটারদের মধ্যেও বিরাজ করছে উৎসবের আবহ।
জানা গেছে, গত নভেম্বরে কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ আগুন লাগে। আগুনে বস্তির প্রায় ১০ হাজার ঘর পুড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হন লাখো নিম্ন আয়ের মানুষ। এমন অবস্থায় বস্তিবাসী খাবার সংকট, তীব্র শীতে গরম কাপড় সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যায় পড়েন। ওই সময় জামায়াতের সংসদ সদস্য প্রার্থী ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়িয়ে বেশ আলোচনায় আসেন। বস্তিবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয় তার। তবে সম্প্রতি কড়াইল বাসিন্দাদের সাথে সভায় অংশ নেন তারেক রহমান। তাদের সমস্যার কথা শোনেন কড়াইলবাসীকে পাকা দালান ও ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। আর ভাষানটেক বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনসহ কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি।
করাইল বস্তির বাসিন্দা সোহেল মন্ডল বলেন, করাইলে আগুন লাগার পর জামায়াতের খালিদুজ্জামান আমাদের জন্য কাজ করেছে। ভোটারদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। তবে তারেক রহমান প্রার্থী হওয়ায় অনেকেই মনে করছে তার হাত ধরে আমাদের জীবন মানের পরিবর্তন হবে। ফলে বস্তিতে ভোট ভাগ হয়ে রয়েছে। ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা দুইটায় ভোট পাবে।
ভাষানটেক বস্তির বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, ভোট আসার পর বস্তির অবস্থা বদলে গেছে। সারাদিন ভোট নিয়ে আলাপ সবার মুখে। কে কি দিবে , কি করবে এইগুলো নিয়ে কথা হচ্ছে।
তারেক রহমান, স ম খালিদুজ্জামান ছাড়াও আসনটিতে প্রার্থী হয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) কামরুল হাসান নাসিম (কাঁঠাল), ইনসানিয়াত বিপ্লবের মনজুর হুমায়ুন (আপেল), স্বতন্ত্র মোঃ আনিসুজ্জামান খোকন (ময়ূর), জাতীয় পার্টির (জেপি) তপু রায়হান (বাইসাইকেল), জাতীয় পার্টির (জাপা) আতিক আহমেদ (লাঙ্গল), স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী এনায়েত উল্লাহ (মোরগ), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ উল্যাহ (হাতপাখা), বাংলাদেশ কংগ্রেসের মোঃ শামীম আহমদ (ডাব), বাংলাদেশ লেবার পার্টির মুহাম্মদ রাশেদুল হক (আনারস), বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) এস, এম, আবুল কালাম আজাদ (টেলিভিশন)। প্রচার-প্রচারণায় তারা ব্যস্ত সময় পার করলেও ভোটারদের কাছে আলোচনায় আসতে পারেননি।