২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২০:৪৩

তাহাজ্জুদ কিংবা ফজরের পর ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার কথা আসছে কেন

সাম্প্রতিক মক ভোটের ছবি  © ফাইল ফটো

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে ভোট কেন্দ্রে যাবেন’ কিংবা ‘ফজরের নামাজ পড়েই ভোটের লাইনে দাঁড়াতে হবে’— নির্বাচনী সভা-সমাবেশে রাজনৈতিক নেতাদের এ ধরনের বক্তব্যগুলো নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে যে, মধ্যরাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে কিংবা ভোরে ফজরের নামাজের পরই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর জন্য কেন বিভিন্ন দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা তাদের সমর্থকদের আহবান জানাচ্ছেন।

আবার এ কথাও উঠছে যে, চাইলেই নির্বাচনের দিন ভোট আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই ভোটাররা ভোট দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়াতে পারেন কি-না। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশৃঙ্খলা না হলে ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে আইনগত কোনো সমস্যা নেই তবে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সময়সীমার আগে তারা ভোটদানের জন্য কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পাবেন না।

তাদের মতে, ভোটের সময়ে রাজনৈতিক নেতারা ‘রাজনৈতিক বক্তৃতা’ হিসেবেই কিংবা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নিজেদের কর্মী সমর্থকদের চাঙ্গা করতে তাদের নিজস্ব ‘আক্রমণাত্মক বক্তব্যের অংশ’ হিসেবে এসব বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারেন। তবে ‘তাহাজ্জুদ বা ফজরের’ পর লাইনে দাঁড়ানোর প্রসঙ্গটি এমন সময় এল যখন দেশের ভোটের আলোচনায় ২০১৮ সালের নির্বাচনটি ‘রাতের ভোটের’ নির্বাচন হিসেবে এখনো আলোচিত হচ্ছে। এর বাইরে বিভিন্ন সরকারের সময়ে দেশের অধিকাংশ নির্বাচনেই কম বেশি কেন্দ্র দখল ও কারচুপির মত অভিযোগ উঠেছিল।

প্রসঙ্গত, আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওইদিন একই সাথে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।

তাহাজ্জুদ ফজর প্রসঙ্গ এল কিভাবে
মঙ্গলবার ময়মনসিংহে একটি জনসভায় ভোটের দিন সকলকে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান বলেছেন, ভোটকেন্দ্র পাহারা দিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তার ভাষায়, ‘সকলকে সাথে নিয়ে ভোটকেন্দ্রের সামনে ফজরের নামাজ আদায় করবেন। আর ভোট দিয়ে সাথে সাথে চলে আসলে চলবে না, (ভোটকেন্দ্রে) থাকতে হবে, কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিয়ে আসতে হবে।’

তার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা তিনি নিজেই দেন। তার মতে, বহু বছর হয়ে গেছে মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। বলেন, ‘এর আগে বিভিন্ন জন আমাদের ভোট লুটপাট করে নিয়ে গেছ। তাই আমাদের সজাগ থাকতে হবে, যাতে কেউ আমাদের ভোট লুটপাট করে নিতে না পারে। পারবেন তো পাহারা দিয়ে সতর্ক থাকতে?’ তার এই প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ-সূচক ধ্বনি ভেসে আসে উপস্থিত জনতার দিক থেকে।

এর আগে সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে গত ২২শে জানুয়ারি ‘ভোটের দিন তাহাজ্জুদ পড়েই কেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিন : তারেক রহমান’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করে। হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা পরিষদ মাঠে নির্বাচনী সমাবেশে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশ করা বাসস-এর সংবাদটিতে তাকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়, ‘অনেকেই বলে, ফজরের নামাজ পড়ে ভোটের লাইনে দাঁড়াতে হবে। আমি বলব— এবার তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। ভোটকেন্দ্রের সামনে গিয়ে জামায়াতে ফজরের নামাজ পড়ে তারপর ৭টায় গিয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে হবে। মনে রাখতে হবে— এবারের ভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

কেন এমন সতর্ক থাকতে হবে বলে তিনি মনে করছেন তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন ওই বক্তৃতায় দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, ‘এরই ভেতরে কিন্তু ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। বর্তমান সরকার প্রবাসীদের ভোটের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল সবগুলো পোস্টাল ব্যালট দখলের চেষ্টা করছে। সজাগ থাকতে হবে। আগে যেভাবে ভোট ডাকাতি হয়েছে, এখন তারা ভোট দখলের চেষ্টা করছে, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেষ্টা করছে। শুধু সজাগ না, সতর্ক থাকতে হবে।’

পরে আরেক জনসভায় তিনি বলেন, ‘তাহাজ্জুদের সময় উঠতে হবে এইবার। তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে যার যার ভোটকেন্দ্রের সামনে গিয়ে ফজরের নামাজ পড়বেন। আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে একটি দলের। যারা নিরীহ মা-বোনদের বিভ্রান্ত করে এনআইডি নাম্বার নিচ্ছে, বিভিন্ন কথা বার্তা বলছে— তারা একাত্তরে যে আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে, সেসময় তাদের একটি ভূমিকা ছিল। লক্ষ লক্ষ মা বোনের সম্মানহানি হয়েছিল সেদিন। তারা কি জিনিস বাংলাদেশের মানুষ দেখে ফেলেছে। কাজেই এ ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে।

তারেক রহমানের এসব বক্তব্যের পর পাল্টা বক্তব্য এসেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন দশ দলীয় জোটের নেতাদের দিক থেকেও। মাগুরায় ২৬ জানুয়ারি এক পথসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আপনারা চারদিকে খেয়াল রাখবেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন কোনো চিল ছোঁ মেরে ভোট নিয়ে যাবে তা হবে না।’

ঝালকাঠিতেও এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে নতুন ইতিহাস রচিত হবে। বিগত দিনের মত যদি কেউ ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং বা কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করে, তবে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।’

একই প্রসঙ্গে পটুয়াখালীর বাউফলে এক সমাবেশে জামায়াত জোটে থাকা এনসিপির একজন নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ফজর নামাজ পড়বেন। ভোটের ফলাফল নিয়ে বাড়িতে আসবেন। কোনো চাঁদাবাজ টেন্ডারবাজের হাতে ভোটকেন্দ্রে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। আমরা মায়েদের নিয়ে ভোটকেন্দ্র পাহারা দিব।’

এরপর সোমবার (২৬ জানুয়ারি) লক্ষ্মীপুরে এক সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বিএনপির দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘বলা হচ্ছে তাহাজ্জুদ নামাজের পর ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে। তাহাজ্জুদের পরেই তারা সিল মারার পরিকল্পনা করছে। ভোটকেন্দ্র দখলের পাঁয়তারা করছে। ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের নেতা-কর্মীরা এসব ষড়যন্ত্র রুখে দেবেন।’

ভোটকেন্দ্র নীতিমালা ও আরপিও
নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলি বলছেন, ভোটকেন্দ্র, ভোটগ্রহণ ও ব্যালট বাক্স ব্যবস্থাপনাসহ সবকিছুই পরিচালিত হয় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও অনুযায়ী। এছাড়া ভোটকেন্দ্র নীতিমালাও রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘এবার ভোট শুরু হবে সকাল সাড়ে ৭টায়। ফলে কর্মকর্তা, পোলিং এজেন্টসহ সংশ্লিষ্টরা তার আগেই আসতে হবে সাড়ে ৭টার আগে ভোট গ্রহণের প্রাথমিক সব প্রস্তুতি শেষ করার জন্য। ফলে ভোটাররা ফজরের পর এসে লাইনে দাঁড়াতেই পারে। কিন্তু তারা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন কমিশন নির্ধারিত সময় থেকেই।’

এবারের নীতিমালা অনুযায়ী, গড়ে তিন হাজার ভোটারের জন্য একটি করে ভোটকেন্দ্র এবং গড়ে ৫০০ পুরুষ ভোটারের জন্য এবং ৪০০ জন মহিলা ভোটারের জন্য একটি করে কক্ষ নির্ধারণ করতে হবে। এবার প্রায় ৪৩ হাজার কেন্দ্রে প্রায় আড়াই লাখ ভোটকক্ষ থাকবে, আর ভোটার সংখ্যা পৌনে ১৩ কোটি।

প্রসঙ্গত, প্রতিটি ভোটকেন্দ্র ঘিরে কমিশন সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, বিজিবি ও আনসারসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের সমন্বয়ে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা আগেই জানিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি জানানো হয়েছে, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তত ১৫ জন সদস্য ছাড়াও সিসি ক্যামেরা ও পুলিশ সদস্যদের শরীরেও ক্যামেরা থাকবে। ভোট বাধাগ্রস্ত হলে কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা, পুনরায় ভোটের সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োজন হলে পুরো নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিত করার ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছে কমিশন।

সাধারণত এর আগে নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আটটা থেকে শুরু হলেও ভোটারদের আরও আগেই এসে লাইনে দাঁড়াতে দেখা যেত। মূলত ভোর ৬টার দিক থেকেই অনেক ভোটার কেন্দ্রের দিকে আসেন বা আসতে শুরু করেন। এবার নির্বাচনের ভোটগ্রহণের সময় সাড়ে সাতটায় নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন।

তাহাজ্জুদ বা ফজর আলোচনায় কেন
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগ আমলে গত তিনটি নির্বাচনই ছিল একতরফা, বিতর্কিত ও অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো অংশই নেয়নি। এরপরেও দুটি নির্বাচনেই ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠেছিল তখনকার সরকারি দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। আর ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো অংশ নিলেও ওই নির্বাচনে আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখার অভিযোগ ওঠে। ফলে এরপর থেকে বিরোধীরা এই নির্বাচনকে 'রাতের ভোট' হিসেবেই বর্ণনা করে আসছে।

এখন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সভা সমাবেশে তাহাজ্জুদ কিংবা ফজরের নামাজের পর কেন্দ্রে গিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর প্রসঙ্গ আসায় এটিও তাই অনেকের দৃষ্টিতে এসেছে। তাদের প্রশ্ন, রাতে কিংবা ভোরে কেন্দ্রে যাওয়া বা কেন্দ্র দখল করতে দেওয়া হবে না— এসব প্রসঙ্গ এখন আসছে কেন। যদিও নির্বাচনের সময় দল ও রাজনৈতিক নেতারা পরস্পরকে ঘায়েল করতে কিংবা কর্মী সমর্থকদের চাঙ্গা করতে নানা ধরনের বক্তব্য দিয়ে থাকেন বলে প্রচলিত আছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম বলছেন, এবারের নির্বাচনের সময় এগিয়ে এনে সাড়ে ৭টা করেছে কমিশন এবং এই সময়ের আগে লাইনে দাঁড়ালেও কেউ ভেতরে ঢুকতে পারবে না। তিনি বলেন, তাহাজ্জুদ বা ফজরের পরের কথা বলে নেতারা তাদের সমর্থকদের সকাল সকাল কেন্দ্রে আসতে হয়ত উদ্বুদ্ধ করতে চাইছেন।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের কথার ইতিবাচক দিক হল তাদের সমর্থকরা ভোরে কেন্দ্রে আসবেন ও ভোটের জন্য প্রস্তুত হবেন। আর ভিন্নভাবে দেখলে এটিকে পরস্পরকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করার চেষ্টা হতে পারে। তবে এদেশে সব দলই চায় সার্বিক পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণে থাকুক বা তেমন একটি পরিবেশ তৈরি হোক। সে চিন্তা থেকেও এমন মন্তব্য আসতে পারে।