২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:৩০

বিএনপির হাতে দুদিনে ১৪টি নারী হেনস্তার ঘটনা, অভিযোগ ঢাবি ছাত্রীসংস্থার

বক্তব্য রাখছেন ঢাবি ছাত্রীসংস্থার সভানেত্রী ও ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সাবিকুন্নাহার তামান্না  © সংগৃহীত

গত দুদিনে নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের হাতে মহিলা জামায়াত ও ছাত্রীসংস্থার নেতাকর্মীদের অন্তত ১৪টি হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ছাত্রীসংস্থার সভানেত্রী ও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য সাবিকুন্নাহার তামান্না। এসব ঘটনায় ‘চিহ্নিত’ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শাস্তির ঘোষণা দিতে বিএনপির প্রতি আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

আজ সোমবার (২৭ জানুয়ারি) বিকেলে ঢাবির মধুর ক্যান্টিনের সামনে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন তামান্না। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন শাখা ছাত্রীসংস্থার সেক্রেটারি ও ডাকসুর আরেক কার্যনির্বাহী সদস্য আফসানা আক্তার। এ সময় অন্যান্য নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

ডাকসু নেত্রী সাবিকুন্নাহার তামান্না বলেন, নির্বাচনী প্রচারণার দিন শুরু হওয়ার পর থেকে দেশে অব্যাহতভাবে নারীদের ওপর হামলা করা হচ্ছে, নারীদেরকে হেনস্তা করা হচ্ছে। যেসব নারী এ সমস্ত হামলার প্রতিবাদে অনলাইনে সরব হয়েছেন, ছাত্রদল-যুবদলের নেতাকর্মীরা তাদেরকে স্লাটশেমিং করছে, মেসেঞ্জারে তাদেরকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। অব্যাহতভাবে এই ঘটনাগুলো ঘটে যাচ্ছে।

বিগত দুই দিনে ছাত্রদল-যুবদল কর্তৃক নারী নির্যাতন ও হেনস্তার প্রায় ১৪টি ঘটনা ঘটেছে জানিয়ে এর বিবরণ দেন তিনি। বলেন, ২৫ জানুয়ারি দুপুরে যশোরের ঝিকরগাছা পৌরসভার পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের কীর্তিপুর এলাকায় যুবদলের সভাপতি আরাফাত রহমান কল্লোলের নেতৃত্বে ১৫-২০ জনের দল নারীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। একই দিন চুয়াডাঙ্গায় নারী কর্মীদেরকে হেনস্তা করা হয়। বিএনপির নারী ও পুরুষ কর্মীরা ২৫ জানুয়ারি কুমিল্লার জামায়াতের নারী কর্মীদেরকে হেনস্থা করে।

তিনি বলেন, ২৬ জানুয়ারি আমরা যেই ঘটনাটির সাক্ষী হয়েছি, টাঙ্গাইলে একজন মহিলাকে কিভাবে বর্বরোচিতভাবে হামলা করা হয়েছে। একজন মহিলার দুই পায়ের মাঝখানে কিভাবে আঘাত করা হয়েছে, সেই দৃশ্য আমাদের কাঁদতে বাধ্য করেছে, সে দৃশ্য দেখে আমরা অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি। একই দিনে লালমনিহাটে জামায়াতের নারী কর্মীদের হেনস্থা করেছে বিএনপির পুরুষ কর্মীরা।

এর আগে ১৯ জানুয়ারি ভোলার চরফ্যাশনে জামায়াতের একজন নারীকর্মীর কান ছিড়ে অলংকার নিয়ে যাওয়া হয় এবং তার মাথায় কাঠ দিয়ে আঘাত করা হয়। ২২ জানুয়ারি নাটোর জেলা সদরে ছাতনী সেন্টার মোড়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা জামায়াতের নারী কর্মীদেরকে চর-থাপ্পড় মারেন। ২৬ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের নারী কর্মীদেরকে হেনস্থা করেন স্থানীয় আলাউদ্দিন আলম নামের একজন বিএনপি কর্মী। তিনি অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ ও হেনস্তা করেন। ২৪ জানুয়ারি ঝিনাইদহ জেলার সদর উপজেলায় নারীদের উপর হামলা করা হয়। ১০ জানুয়ারি ভোলার লালমোহনে নারী কর্মীদের হেনস্থা করা হয়। ২৪ জানুয়ারি মেহেরপুর সদর উপজেলায় নারী কর্মীদের হেনস্থা করা হয়। ২৫ জানুয়ারি বিএনপি নেত্রী পাপিয়া তার বক্তব্যে বলেছেন, জামায়াত এবং ছাত্রী সংস্থার কেউ যদি নির্বাচনী প্রচারণায় যায় তাদেরকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। ২০ জানুয়ারি ঢাকা-১৫ আসনের মিরপুর এলাকায় আমরা দেখেছি কিভাবে নারী কর্মীদের উপর হামলা করা হয়েছে।

সাবিকুন্নাহার তামান্না বলেন, নির্বাচনী প্রচারণায় অব্যাহতভাবে নারীদেরকে এভাবে জুলুম-নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত আমরা বাংলাদেশের বর্তমানে সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির পক্ষ থেকে কোন ধরনের পদক্ষেপ দেখিনি। এতদিন হয়ে গেল, কেন তারা এখনো পর্যন্ত কোন ধরনের স্টেপ নিল না? আমরা জুলাই পরবর্তী সময়ে স্বপ্ন দেখেছিলাম একটি সুন্দর বাংলাদেশের, যে বাংলাদেশের নারীদের অধিকার নিশ্চিত হবে, যে বাংলাদেশের নারীরা একটি নিরাপদ পরিবেশ পাবে। একই সাথে যে নির্বাচন আসছে, তা নিয়েও আমরা অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম যে এটা আমাদের জীবনের প্রথম নির্বাচন, একটি সুষ্ঠ নির্বাচন হবে, আমরা একটি আনন্দঘন পরিবেশে আনন্দের সাথে ভোট দিতে যাব। অথচ আমাদের হৃদয় ভঙ্গ হয়েছে। আমরা দেখতে পেয়েছি ভোটের আগেই কিভাবে অপোজিশন পার্টির নারীদেরকে, যারা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছে তাদেরকে হেনস্তা করা হচ্ছে, তাদেরকে শারীরিকভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে, যে ঘটনা কোনভাবেই মেনে নেওয়ার মত নয়।

অব্যাহত নারী হেনস্তার পরও বিভিন্ন মহল ‘সিলেক্টিভ প্রতিবাদ’ করছে বলেও অভিযোগ করেন তামান্না। বলেন, আমরা ইন্টারেস্টিংলি লক্ষ্য করছি, কিভাবে এই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে সিলেক্টিভ প্রতিবাদ হচ্ছে। আমরা দেখতে পেয়েছি বিগত সময়ে জামায়াতের একজন নেতা নারীদেরকে নিয়ে যখন অসভ্য মন্তব্য করেছেন, তখন কুশপুত্তলিকা দাহন করা হয়েছে। কিন্তু ক্রমাগতভাবে বিএনপি কর্তৃক নারীদেরকে যে শারীরিক হামলা করা হচ্ছে, এর কোনো প্রতিবাদ আমরা কোনো মহল থেকে দেখতে পাইনি। এই ধরনের সিলেক্টিভ প্রতিবাদের আমরা বিরুদ্ধতা করছি এবং আমরা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী সংস্থা কখনোই এই সিলেক্টিভ প্রতিবাদকে সমর্থন করি না। আমরা দেশের সর্বমহলকে আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা এই সিলেক্টিভ প্রতিবাদ থেকে বের হয়ে আসেন। যতদিন আমরা এই সিলেক্টিভ প্রতিবাদ থেকে বের হতে পারব না, ততদিন আমরা সর্বমহলের নারীদের অধিকারকে নিশ্চিত করতে পারব না।

মিডিয়ার ‘নির্লিপ্ত’ আচরণ করছে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, যেখানে দেশের বড় গণমাধ্যমগুলো তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে পড়ে থাকে, প্রতিনিয়ত তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ইন্টারেস্টিং চোখ ধাঁধানো নিউজ করে যাচ্ছে, অথচ এতদিন ধরে যে নারী কর্মীদেরকে হেনস্থা করা হচ্ছে— আমরা মিডিয়াকে দেখছি তারা খুব কৌশলে চেষ্টা করছে এই বিষয়গুলো এড়ানোর জন্য। মিডিয়ার যে পা চাটা স্বভাব, সে পা চাটা স্বভাব এখনো গেল না। অথচ আমরা জুলাই পরবর্তী সময়ে আশা করেছিলাম এই আওয়ামী ফ্যাসিবাদ যাওয়ার সাথে সাথে হলুদ সাংবাদিকতাও দূর হয়ে যাবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে আমরা খেয়াল করছি, মিডিয়া তার আগের স্বভাব ধরে রেখেছে। মিডিয়াও প্রকৃত অপরাধীদের সামনে আনছে না, তারাও সিলেক্টিভ প্রতিবাদ করে যাচ্ছে। এই সামগ্রিক বিষয়গুলোর প্রতিবাদ আমরা জানাচ্ছি।

ডাকসু নেত্রী বলেন, যারা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করছে, তারা যদি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে তাহলে নির্বাচন কমিশনের সাথে কথা বলে কী ধরনের শাস্তি তাদের যোগ্য, সেই শাস্তি তাদেরকে দিতে হবে। কিন্তু আপনারা কোনোভাবেই কোনো নারীকে আইন নিজের হাতে নিয়ে শারীরিক আঘাত করতে পারেন না।

তিনি বলেন, গত কয়েকদিনে ১৪টিরও বেশি ঘটনা ঘটেছে যেগুলো শুধুমাত্র আমাদের চোখে পড়েছে। হয়ত এমন অনেক ঘটনা, যেগুলো মিডিয়াতে আসেনি সেগুলো আমরা সবাই জানি না। এভাবে ক্রমাগতভাবে নারীদেরকে যদি হেনস্থা করা হয়, তাদের শারীরিক আঘাত করা হয়, শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়, তাহলে আমরা আশঙ্কা করছি যে নারীরা নির্বাচনী কাজে অংশগ্রহণ করবে না। এমনকি তারা নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্রে যেতেও ভয় পাবে। এই ধরনের পরিবেশ যেন তৈরি না হয়। এই ধরনের আশঙ্কা যেন নারীদের মনে না হয়, সেজন্য আমি বিএনপিকে আহবান করব— আপনাদের যে নেতাকর্মীরা এই ধরনের কার্যক্রমের সাথে জড়িত, তারা তো চিহ্নিত; আপনারা তাদের বিচার করুন। জনসম্মুখে তাদের শাস্তি ঘোষণা করুন। তাহলে বাংলাদেশের নারী সমাজ একটি নিরাপদ পরিবেশে ভোট দেওয়ার জন্য আশ্বস্ত হতে পারবে।