মনোনীত প্রার্থীর বিরোধিতা করে টাঙ্গাইল-৮ আসনে বিএনপির গণপদত্যাগের ঘোষণা
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইল-৮ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আহমেদ আযম খানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার অভিযোগ এনে সখীপুর উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের গণপদত্যাগ শুরু করেছেন। মাত্র কয়েকদিন আগে তিনি জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক মন্ডলকে হুমকি ও ‘তুই-তুকারি’ করে প্রথম আলোচনা-সমালোচনায় আসেন। এরপর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধারা তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ-মানববন্ধন করে আসছেন। এরপর পতিত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন করার অভিযোগ তুলে নিজের নির্বাচনী আসনে দলীয় নেতাদের গণ পদত্যাগ তাকে প্রচণ্ড রকমের অসুবিধার সামনে ফেলে দিল।
এদিকে, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রাজ্জাক মন্ডলের বিতর্কের পর নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিয়ে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন আহমেদ আযম খান। গত ২৩ নভেম্বর রবিবার রাতে সখীপুর সরকারী কলেজ মোড়ের এক নির্বাচনী সভায় তিনি বলেন, আমি নিজেই যেহেতু মুক্তিযোদ্ধা। সারা জীবন মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান করে এসেছি এবং করে যাব। তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। কয়েকটি ফেসবুক আইডি থেকে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর আগে রাজ্জাক মন্ডলকে দেয়া হুমকিও ভাইরাল হয়েছিল।
আহমেদ আযম বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা, বর্তমানে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান। তিনি এর আগে বিগত ২০০১ ও ২০০৮ সালে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছিলেন। গেল ৩ অক্টোবর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রাথমিক মনোনীত ২৩৭ জন দলীয় প্রার্থীর নামের তালিকা ঘোষণা করেন। এরমধ্যে টাঙ্গাইল–৮ (সখীপুর–বাসাইল) আসনে মনোনয়ন পান তিনি।
নেতাকর্মীদের গণ পদত্যাগের বিষয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট ফরহাদ ইকবাল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, কিছু নেতা–কর্মী পদত্যাগ করেছেন, তবে আমরা এখনো অফিশিয়ালভাবে কোনো পদত্যাগপত্র হাতে পাইনি। যারা পদত্যাগ করেছেন, তাদের সঙ্গে কথা হচ্ছে। তাদের অনেকেই ভুল বুঝতে পেরেছেন। তারা হয়তো আবার দলে ফিরে আসবেন। অনেক দিন পর যখন এ আসনে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত হয়েছে, তখন একটি কুচক্রী মহল বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
এর আগের ১২ ঘণ্টায় এসব অভিযোগে উপজেলা বিএনপির সদ্য অব্যাহতি পাওয়া সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান সাজু ও সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল বাসেদসহ ১১ নেতা পদত্যাগ করার ঘোষণা করেন। ওইদিন পদত্যাগকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৩ জনে। এর মধ্যে ওলামা দলের ১৫ জন, বিএনপির চারজন, শ্রমিক দলের দুজন ও যুবদলের এক নেতা আছেন। মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে এ গণপদত্যাগ শুরু হয়। বুধবার দুপুরেও বিপুল (প্রায় শতাধিক) নেতা ফেসবুকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে, উপজেলা বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, পদত্যাগী নেতাদের সংখ্যা ইতিমধ্যে আড়াই শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে।
জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের উপজেলা কমিটির পদত্যাগী নেতারা হলেন দলের উপজেলা কমিটির সভাপতি মো. হাবিবুর রহমান, সহ-সভাপতি সাইফুল ইসলাম, আবদুল লতিফ মিয়া, সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, সহ-সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন, আবদুল হাই, সাংগঠনিক সম্পাদক খলিলুর রহমান, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্বাস আলী, দপ্তর সম্পাদক কায়ছারুল হক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক সুলতান মাহমুদ, সদস্যপদ থেকে ইসমাইল হোসেন, মির্জা আতোয়ার রহমান, হোসেন আলী, বছির উদ্দিন আহমেদ ও আনোয়ার হোসেন।
এ ছাড়া উপজেলা বিএনপির সদস্য মো. সজীব মিয়া, বজলুর রশিদ ওরফে খালেদ, আরিফুল ইসলাম ওরফে টিটু, দারিয়াপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল রানা, গজারিয়া ইউনিয়ন যুবদলের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি শাহাদাত হোসেন, দারিয়াপুর ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সদস্যসচিব শামীম শিকদার, শ্রমিক দলের দারিয়াপুর ইউনিয়ন শাখার আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মিয়া হোসেন তাদের পদত্যাগপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। প্রতিটি পদত্যাগপত্র জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি থেকে সদ্য অব্যাহতি পাওয়া ও পদত্যাগে নেতৃত্বদানকারী উপজেলা বিএনপির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান সাজু বলেন, পর্যায়ক্রমে আরও দুই শতাধিক পদধারী নেতা পদত্যাগ করবেন বলে আমার সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে।
টাঙ্গাইল–৮ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আহমেদ আযম খান বলেন, আমার বিরুদ্ধে, বিএনপির বিরুদ্ধে, ধানের শীষের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। জনগণ এবার ঐক্যবদ্ধ আছে, কোনো ষড়যন্ত্রই ধানের শীষের বিজয় ঠেকাতে পারবে না।
এদিকে, সখীপুর উপজেলা বিএনপি থেকে নেতাদের পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে। টাঙ্গাইল-৮ (সখীপুর-বাসাইল) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আহমেদ আযম খানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার অভিযোগ এনে বুধবার দুপুর পর্যন্ত দলের ১১ জন নেতা পদত্যাগ করেছেন। এছাড়া একই অভিযোগ এনে সখীপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের আরও দুই শতাধিক পদধারী নেতা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সম্প্রতি অব্যাহতি পাওয়া সখীপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান সাজু। তারা গত ২১ নভেম্বর থেকে ২৫ নভেম্বর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন সময় পদত্যাগ করেন। তাদের পদত্যাপত্রটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করলে নানা আলোচনা ও সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের এই পদত্যাগপত্রের অনুলিপি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ জেলা বিএনপির কাছে দেওয়া হয়েছে।
সখীপুর উপজেলার বেশ কয়েকজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আহমেদ আযম খান দীর্ঘদিন ধরেই সখীপুর-বাসাইলের রাজনীতিতে সক্রিয়। তবে তিনি মুক্তিযোদ্ধা, এ তথ্য আগে কখনো আমাদের জানা ছিল না। তারা বলেন, হয়তো তাদের তথ্য অসম্পূর্ণ থাকতে পারে, তবে আহমেদ আযম খান একজন মুক্তিযোদ্ধা, এমন দাবির কথা এর আগে শোনা যায়নি।
সখীপুর উপজেলার একটি অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমি সক্রিয় আঞ্চলিক (বাসাইল অঞ্চলের) সংগঠকদের মধ্যে একজন ছিলাম। আমি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হই তখনকার আমাদের যিনি ছাত্রনেতা ছিলেন, খন্দকার আব্দুল বাতেনের সঙ্গে। আমরা যারা খন্দকার আব্দুল বাতেনের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ত ছিলাম, তাদের কেউই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতাপ্রাপ্ত নই এবং তালিকাভুক্তও নই। কারণ উনি (আব্দুল বাতেন) কোনো স্বীকৃত সাবসেক্টর কমান্ডার ছিলেন না। আমরা তখন তুখোড় ছাত্র রাজনীতি করেছি। এই দেশ স্বাধীনের জন্য ভূমিকা পালন করেছি। কোনো ভাতার জন্য চিন্তা করে এসব করিনি।
আহমেদ আযম আরও বলেন, এর আগে আওয়ামী লীগের সময়েও আমি বিভিন্ন টক শোতে অনেকবার নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলাতে ডিজিএফআইয়ের কথা শুনেছি। তারা বাসাইল ও সখীপুরে তদন্ত করতে এসেছে যে, আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি কি-না। কিন্তু আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি এবং মুক্তিযুদ্ধের একজন আঞ্চলিক সংগঠকও ছিলাম।
পতিত আওয়ামীলীগ পুনর্বাসনে বিএনপির নেতাদের অভিযোগ, আহমেদ আযম খান নির্বাচনে ভোট টানতে উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কয়েক দফা গোপন বৈঠক করেছেন। দলীয় বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা, সভা-সমাবেশে তারা (আওয়ামী লীগ) সামনের সারিতে বসছেন। কেউ কেউ বক্তব্য দিচ্ছেন। তাদের অধিকাংশ নেতার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্রদের ওপর হামলার অভিযোগে মামলা আছে।
পদত্যাগ প্রসঙ্গে সখীপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুল বাসেদ বলেন, কিছুদিন ধরে লক্ষ করছি, আহমেদ আযম খান আমাদের দলীয় নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে ভোট পাওয়ার আশায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গুরুত্ব বেশি দিচ্ছেন। তাদের সামনের সারিতে চেয়ার দিচ্ছেন। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে নেতা আমাদের বহিষ্কারের হুমকি দিচ্ছেন।
সম্প্রতি দল থেকে অব্যাহতি পাওয়া সখীপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাজাহান সাজু বলেন, আহমেদ আযম খান অতি সম্প্রতি টাঙ্গাইল জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক খালেক মণ্ডলকে হুমকি ও গালাগাল করেছেন। আহমেদ আযম খান মুক্তিযুদ্ধের ৫৪ বছর পর হঠাৎ নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রচার করছেন। গত ১৭ বছর দলের জন্য জেল-জুলুম খেটেছি। আওয়ামী লীগের নির্যাতন সহ্য করেছি। তিনি সেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন করছেন। তাদের সামনের সারিতে স্থান দিচ্ছেন। নেতার এসব কর্মকাণ্ডে আমরা অপমানিত বোধ করছি। আমরা আহমেদ আযম খানের দলীয় মনোনয়ন বাতিল দাবি করছি। তা না হলে আজকালের মধ্যে বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের আরও দুই শতাধিক পদধারী নেতা সংবাদ সম্মেলন করে পদত্যাগ করবেন। ইতিমধ্যে তারা আমার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
এদিকে, পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগের পুনর্বাসনের অভিযোগ অস্বীকার করে আহমেদ আযম খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি অতীত ও বর্তমানে কোনো দিন আওয়ামী লীগকে কখনও পুনর্বাসন করিনি, ভবিষ্যতেও করব না। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একটি কুচক্রী মহল অনৈতিকভাবে দুই-একজন বহিষ্কৃত নেতাদের মাধ্যমে কিছু নেতাকর্মীকে অনুরোধ করে আবার কিছু নেতাকর্মীকে জোর করে স্বাক্ষর করিয়েছে বলে আমি শুনেছি।
সখীপুর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নাজিম উদ্দিন বলেন, দলকে বিতর্কিত করতে আমাদের দলের ভেতর একটি পক্ষ গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। আহমেদ আযম খানকে বিতর্কিত করার জন্য একজন শিল্পপতি ইতিমধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে দান-অনুদানের নামে টাকা ছড়াচ্ছেন। আর যারা পদত্যাগ করেছেন, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত ছিল। বিষয়টি টের পেয়ে তারা বহিষ্কৃত হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন।