বিসিএসের জন্য সুপর্ণার লড়াই

বিসিএস
ছেলে কোলে সুপর্ণা দে   © ছবি : সংগৃহীত

সবার জীবনেই স্বপ্নপূরণের পথে আসে নানা প্রতিবন্ধকতা। কেউ সেই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে নিজের কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে পারে কেউ পারে না। তবে বাধা যত বড়ই হোক সেটা যে মানুষের ইচ্ছাশক্তির কাছে তুচ্ছ তা প্রমাণ করেছিলেন সুপর্ণা দে। আজ থেকে ৫ বছর আগে সুপর্ণা তার ইচ্ছাশক্তির জোরে জয় করেছিলেন বিসিএস নামের স্বপ্ন।ভোর সাড়ে চারটায় এক শিশুর জন্ম দিয়ে সকাল ১০টায় বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়ে আজ তিনি একজন ক্যাডার।

খুব কঠিন ছিল সুপর্ণার স্বপ্নপূরণের পথ। নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তিনি ৩৫তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পরীক্ষার আগের দিন প্রসবব্যথা ওঠে। রাতে তাকে নেওয়া হয় হাসপাতালে। ভোর সাড়ে চারটায় তার কোলজুড়ে আসে ছেলে। কিন্তু সকাল ১০টায় তার ৩৫তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা। দশটায় তার পরীক্ষা। সকাল ৮টায় জ্ঞান ফিরলে তার প্রথম কথা ছিল 'আমি পরীক্ষা দিতে যাবো'। অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে পরীক্ষার হলে নেয়া হলো। হাতে স্যালাইন নিয়ে স্বামীর কোলে উঠে চারতলায় পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছান তিনি। তারপর তিন ঘণ্টার পরীক্ষা শেষে ক্লান্ত হয়ে ফেরেন নবজাতকের কাছে। 

যার ফলাফল এখন তিনি বিসিএস ক্যাডার। ৩৫তম বিসিএসে (প্রাণিসম্পদ) সম্মিলিত মেধা তালিকায় ১১তম হয়েছিলেন তিনি। সুপর্ণা দে বলেন, ‘আমার কাছে এখনো পুরো ঘটনা অলৌকিক মনে হয়। আমার প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি ছিল। শেষ পর্যন্ত পেরেছি।’

জানা যায়, তার বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালী। বাবা-মা দুজনেই স্কুলশিক্ষক। ২০০৩ সালে বাঁশখালী গার্লস স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ২০০৫ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিসম্পদ বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু দ্বিতীয় সেমিস্টারে থাকতেই পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। অবশ্য বিয়ের সময়েই পাত্রপক্ষের কাছ থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন তিনি।

২০১২ সালে পাস করেন সুপর্ণা। সে বছরের ডিসেম্বরে মেয়ের মা হন তিনি। ২০১৪ সালে ৩৫তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি দিলে আবেদন করেন। গত বছরের ৬ মার্চ যখন প্রিলিমিনারি পরীক্ষা হয়, তখন তিনি আবার অন্তঃসত্ত্বা। প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ হয়ে লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। চিকিৎসকেরা জানান, সন্তানের জন্ম হবে সেপ্টেম্বরের শেষে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ছিল লিখিত পরীক্ষা। ১ সেপ্টেম্বর ইংরেজি, পরদিন বাংলাদেশ বিষয়াবলি, ৩ সেপ্টেম্বর সকালে গণিত, বিকেলে আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির পরীক্ষা দেন। ৬ সেপ্টেম্বর ছিল সাধারণ ক্যাডারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পরীক্ষা। কিন্তু সেদিন সকালেই তীব্র ব্যথা শুরু হলে পরীক্ষাটি দেওয়া হয়নি। ফলে প্রশাসন, পুলিশের মতো সাধারণ ক্যাডারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে ছিটকে পড়েন। তবে সেই পরীক্ষা না দিলেও পেশাগত ক্যাডারের জন্য বাকি পরীক্ষাগুলো দেওয়া যায়। ৭ সেপ্টেম্বর ছিল বাংলা পরীক্ষা।

সুপর্ণার স্বামী ব্যবসায়ী টিটো শিকদার বলেন, ‘স্কুল থেকে ফিরে সংসার সামলানো, বিসিএসের প্রস্তুতি। পেটে আরেকটা বাচ্চা। কিন্তু ও সব জয় করেছে।

স্মৃতিচারণা করে সুপর্ণা বলেন, ‘৬ সেপ্টেম্বর রাতেই আমাকে চট্টগ্রাম নগরের আন্দরকিল্লার মা ও শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয়। ভোর সাড়ে চারটায় ছেলের জন্ম। ভাবলাম, যে করেই হোক পরীক্ষা দেব। অ্যাম্বুলেন্সে করে সকালে কেন্দ্রে গেলাম। সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত পরীক্ষা দিলাম। লিখিত পরীক্ষার ফল দিলে দেখি উত্তীর্ণ হয়েছি। ভীষণ ভালো লাগল। মনে হলো স্বপ্নের কাছাকাছি পৌঁছেছি। মৌখিকও ভালো হলো। বুধবার চূড়ান্ত ফল দেখে মনে হলো, পৃথিবী জয় করেছি।’


মন্তব্য

x