২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ২০:৩০

আজীবন মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন অধ্যাপক আতাউর রহমান বিশ্বাস

স্মরণসভা  © প্রতিনিধি

ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল)-এর আহ্বায়ক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সদ্য প্রয়াত চেয়ারম্যান মরহুম অধ্যাপক মো. আতাউর রহমান বিশ্বাসের স্মরণে এক আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। আজ সোমবার (২৬ জানুয়ারি) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর. সি. মজুমদার আর্টস বিল্ডিংয়ের অডিটরিয়ামে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় বক্তারা বলেন, তার অসংখ্য গুণের মধ্যে একটি ছিল- তিনি কোনো কিছু বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিলে তা করেই ছাড়তেন। এই দৃঢ়তা আমাদের সবসময় অনুপ্রাণিত করত। তিনি নিজের জন্য কখনো কিছু চাননি। আজীবন মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন।

অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, অধ্যাপক মো. আতাউর রহমান বিশ্বাস স্যার ছিলেন অত্যন্ত মার্জিত ও মৃদু হাসির ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন মানুষ। ডাকসু নির্বাচনে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমরা দেখেছি- এত শান্ত, স্বল্পভাষী একজন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কীভাবে দৃঢ়ভাবে সোচ্চার হতে পারেন। স্যার যদি আরও কিছুদিন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকতেন, তবে আমাদের স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয় বিনির্মাণে তিনি আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারতেন।

ইউটিএল-এর কোষাধ্যক্ষ ও ফিন্যান্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, সবসময় স্যার তার ট্যাক্স রিটার্ন ফাইল আমার কাছেই নিয়ে আসতেন এবং তা আমিই পূরণ করে দিতাম। সেখানে দেখেছি, তিনি আর্থিকভাবে কতটা সচ্ছল ছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের পরিচয়ে আমি লক্ষ্য করেছি, স্যার খুবই সাধারণ জীবনযাপন পছন্দ করতেন। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বিলাসবহুল জীবন বেছে না নিয়ে তিনি সহজ-সরল জীবনধারাই গ্রহণ করেছিলেন।

ইউটিএল-এর উপদেষ্টা ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মোজাম্মেল হক বলেন, আজ যার স্মরণে আমরা এখানে উপস্থিত হয়েছি, তিনি আমাদের দীর্ঘদিনের একজন সহকর্মী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের অগ্রযাত্রায় বিশ্বাস স্যারের ভূমিকা অপরিসীম। সময়ের দাবি অনুযায়ী ইউটিএল প্রতিষ্ঠা করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যে অবদান রেখে গেছেন, তার মাধ্যমেই তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। তিনি কম কথা বললেও যা বলতেন, সেটি প্রস্তাবনার মতোই আমাদের কাছে গুরুত্ব পেত।

এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম বলেন, একজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মাঝে যে সম্পর্ক থাকা উচিত, অধ্যাপক আতাউর রহমান বিশ্বাস স্যার সেটিই আজীবন বজায় রেখেছেন। ফ্যাসিবাদী আমলেও তিনি আমাদের জন্য সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন। আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাসে যে নতুন রাজনীতি বিনির্মাণের স্বপ্ন আমরা দেখেছি, স্যার সেটি বাস্তবে করে দেখিয়েছেন। সেই সময়েই তিনি ইউটিএল প্ল্যাটফর্মটি আমাদের সামনে নিয়ে আসেন। ইউটিএল শুধু একটি সংগঠন নয়, এটি আমাদের আবেগের জায়গা।

তিনি আরও বলেন, যখন শিক্ষক সংগঠনগুলো দলীয় পদলেহনে ব্যস্ত ছিল, তখন ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল) সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ডাকসু নির্বাচনে ইউটিএল কোনো দল বা গোষ্ঠীর পক্ষে নয়, বরং শিক্ষার্থীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় ইউটিএল সবসময় কাজ করেছে। নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা হলে বিশ্বাস স্যারের নেতৃত্বে ইউটিএল দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিল—এই নির্বাচন ছিল ফেয়ার। আমরা এমন শিক্ষকই চেয়েছি। আজ স্যার আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁকে নিয়ে আমরা স্মৃতিচারণ করছি-এটাই তো স্বাভাবিক। আমরা যেন তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ সম্মিলিতভাবে এগিয়ে নিতে পারি, আল্লাহর কাছে সেই তৌফিক কামনা করি।

ইউটিএল-এর সদস্যসচিব অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন বলেন, বিশ্বাস স্যারের সঙ্গে আমার পরিচয় ২০০২ সাল থেকে। তবে গত সাত মাসে তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। মানুষ যত কাছের হয়, সম্পর্ক অনেক সময় তিক্ত হয়-কিন্তু বিশ্বাস স্যারের ক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটেছে। যত কাছে গিয়েছি, তাঁর প্রতি ভালোবাসা তত বেড়েছে। বাসার বেডরুমে কিংবা বিভাগের চেয়ারম্যানের কক্ষে তিনি একই মানুষ ছিলেন। ভালো মানুষের সবচেয়ে বড় গুণ হলো- তাঁদের সামনে-পেছনে দুটি জগৎ থাকে না, একটিই জগৎ থাকে। বিশ্বাস স্যার ঠিক তেমনই ছিলেন। ইউটিএল প্রতিষ্ঠার সময় নির্ধারিত চারটি মূলনীতির লক্ষ্য বাস্তবায়নে স্যার বলেছিলেন ইউটিএলকে সব ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে দিতে হবে। আলহামদুলিল্লাহ, তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে অল্প সময়ের মধ্যেই ইউটিএল শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সবার কাছে একটি ন্যায়নিষ্ঠ সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্যারের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল দায়িত্ব নেওয়ার সাহস। আমরা যেন তাঁর এই চিন্তা সম্মিলিতভাবে এগিয়ে নিতে পারি, আল্লাহ আমাদের সে তৌফিক দান করুন।

এ সময় ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, আতাউর রহমান বিশ্বাস আজীবন মানুষের জন্য কাজ করেছেন। নিজের জন্য কখনো কিছু চাননি। পদ-পদবির কথা উঠলে তিনি বলতেন- আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবেই থাকতে চাই। 

সভাপতির বক্তব্যে ইউটিএল-এর আহ্বায়ক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. যুবাইর মোহাম্মদ এহসানুল হক বলেন, স্যারের অসংখ্য গুণের মধ্যে একটি ছিল- তিনি কোনো কিছু বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিলে তা করেই ছাড়তেন। এই দৃঢ়তা আমাদের সবসময় অনুপ্রাণিত করত। আর্থিক দিক থেকেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ—যা আমরা তার সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করে খুব কাছ থেকে দেখেছি।

ইউটিএল ঢাবি চ্যাপ্টারের যুগ্ম সদস্য সচিব ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কাজী ওমর ফারুক এর সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন, ইউটিএল এর যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসী বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরা আহসান, বিশ্ব ধর্মতত্ত্ব ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু সায়েম বলেন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ ও বিশিষ্ট আইনজীবী ও সমাজসেবক ড.মো. হেলাল উদ্দিন।  

এ সময় উপস্থিত ছিলেন ইউটিএল কেন্দ্রীয় সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নুরুল্লাহ্, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রুহুল আমীন, বিশ্ববিদ্যালয় ইউটিএল চ্যাপ্টারের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আবু লায়েক সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান সাদীসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।