প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবু ত্ব-হার ৫ প্রশ্নের বিষয়টি সঠিক নয়

ইউটিউব
ইউটিউবে আল মিনার ইসলামিক চ্যানেলের ভিডিওর থামনেইল  © ইউটিউব

সম্প্রতি নিখোঁজের পর তরুণ ইসলামী বক্তা আবু ত্ব-হা মুহাম্মাদ আদনান ফিরে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঁচটি প্রশ্নের জবাব চেয়েছেন। ভিডিও স্ট্রিমিং সাইট ইউটিউবে ‘আল মিনার ইসলামিক চ্যানেলে’ এমন দাবি করা হয়েছে। তবে কোথায় কখন আবু ত্ব-হা প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্নগুলো করেছেন সেই সূত্র ভিডিওটিতে উল্লেখ করা হয়নি। অনুসন্ধানে আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনানের প্রধানমন্ত্রীর নিকট পাঁচ প্রশ্নের জবাব চাওয়ার বিষয়টির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

গত রোববার (২০ জুন) পোস্ট করা ভিডিওটি ২৭ জুন নাগাদ সাত দিনে ১৩ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে। ভিডিওর শুরুর দিকে উপস্থাপক মুহাম্মদ জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘আবু ত্ব-হ্ মুহাম্মদ আদনান ভাই দীর্ঘদিন নিখোঁজ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি বা তাঁর পক্ষ থেকে একটি বিষয় ভাইরাল হয়ে গেছে, সেটি হলো তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঁচটি প্রশ্ন উপস্থাপন করেছেন এবং তার জবাব চেয়েছেন।’

৭ মিনিট ৮ সেকেন্ডের ভিডিওটির থামনেইল ছবিতে লেখা রয়েছে, ‘ফিরে আসার পর প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৫টি প্রশ্নের উত্তর চাইলেন আবু ত্বহা মুহাম্মদ আদনান, প্রশ্ন শুনলে আপনিও অবাক হবেন।’

ভিডিওটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে, ‘ফিরে এসে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৫ টি প্রশ্নের উত্তর চাইলেন আবু ত্বহা আদনান..? শুনলে আপনিও অবাক হবেন..!’ এ ছাড়া চ্যানেলটির ফিচার্ড হিসেবে রাখা ভিডিওটিতে তিনটি হ্যাশট্যাগের একটি এমন ‘#প্রধানমন্ত্রীর_কাছে_আবু_ত্বহা_আদনানের_৫টি_প্রশ্ন’।

পুরো ভিডিওতে উপস্থাপক এক থেকে পাঁচ নম্বর প্রশ্ন বলার আগে প্রতিবারসহ অন্তত সাতবার বলেছেন, ‘আবু ত্ব-হা মুহাম্মাদ আদনান ভাই যে প্রশ্নটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে করেছেন।’

ইউটিউবে আল মিনার ইসলামিক চ্যানেলের স্ক্রিনশট

অথচ ফেসবুক, ইউটিউব ও গুগলে বিভিন্ন কীওয়ার্ড দিয়ে খুজেঁ আবু ত্ব-হা প্রধানমন্ত্রীর নিকট প্রশ্নের জবাব চেয়েছেন কিংবা সুনির্দিষ্ট কারও মাধ্যমে এমন প্রশ্ন করেছেন তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে সার্চ করে ফেসবুকে অনেকেই আল মিনার ইসলামিক চ্যানেলের ভিডিওর লিঙ্ক শেয়ার করেছেন এবং হুবহু ভিডিওটি ইউটিউবে আপলোড দিয়েছেন। কেউ আবার আবু ত্ব-হার পুরনো ভিডিও আপলোড দিয়ে এই শিরোনামটি ব্যবহার করেছেন। দেখুন এখানেএখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে

তা ছাড়া আল মিনার ইসলামিক চ্যানেলটিতে গত বৃহস্পতিবার (২৪ জুন) ‘আবু ত্বহা আদনান ও ত্রিপুরা ওমর ফারুক নিয়ে,প্রধানমন্ত্রীকে কেমন ধোলাই দিলেন ভিপি নুর!দেখুন ভিডিওতে।।’ শিরোনামে ৪ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ভিডিওর ১ মিনিট ১২ সেকেন্ড থেকে ৩ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড পর্যন্ত নুরুল হক নুরের বক্তব্য রয়েছে। সেখানে একবারের জন্যও আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনানের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করেননি ভিপি নুর। ফলে ভিডিওটির সঙ্গে এর শিরোনাম সামঞ্জস্য পূর্ণ নয়।

ইউটিউবে আল মিনার ইসলামিক চ্যানেলের স্ক্রিনশট

অন্যদিকে ফেসবুকে ইংরেজিতে লেখা ‘আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনান’ নামক পেজে এবং ‘আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনান (অফিসিয়াল)’ নামক গ্রুপে আবু ত্ব-হার এমন কোনো বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই পেজ ও গ্রুপ আবু ত্ব-হা নিজে বা তাঁর নির্দেশনায় চলে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে এই দুটি অন্যতম জনপ্রিয় এবং নিখোঁজ হওয়ার আগে এখানে নিয়মিত তাঁর ভিডিও ও লেখা প্রকাশ করা হতো।

আবু ত্ব-হার স্ত্রী সাবিকুন নাহারের ভাই আবু হানিফ দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস ফ্যাক্টচেককে বলেন, ‘নিখোঁজ অবস্থা থেকে ফিরে আসার পর থেকে তো আদনান তো কিছুই বলেনি। বলার সুযোগ থাকলে তো বলবে। এমনকি পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথেও তেমন কোনো যোগাযোগ হচ্ছে না তাঁর। আপনি যেমন বললেন অনলাইনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্নের কথা এগুলা আসলে ফেক। তাঁর বিরুদ্ধে শত্রুতা থেকে কেউ কেউ করতেছে অথবা স্বার্থ হাসিলের জন্য করছে।’

রংপুরে কর্মরত এনটিভির সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট এ কে এম মইনুল হক দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস ফ্যাক্টচেককে বলেন, ‘১৮ জুন শুক্রবার রংপুরের কলেজ রোডে আবু ত্ব-হা মুহাম্মাদ আদনান তাঁর প্রথম স্ত্রীর বাবার বাড়িতে আসেন। এরপর তাঁকে কোতোয়ালি থানা এবং পরে রংপুর ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। এরপর রাতে তাঁকে আদালতে তোলা হয় এবং আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাতেই তাঁকে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত (২৬ জুন) আমার জানা মতে, আবু ত্ব-হা কোনো সংবাদ সম্মেলনে বা কোনো সাংবাদিককে বক্তব্য দেননি।’

এ ছাড়াও প্রথম আলোয় আবু ত্ব-হাদের সন্ধান পাওয়ার পরদিন শনিবার দুপুরে ‘ধর্মীয় বক্তা ত্ব-হাসহ কেউই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হচ্ছেন না’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

মূলধারার সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়, গত ১০ জুন বিকেল চারটার দিকে ভাড়া করা একটি গাড়িতে রংপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন তাঁর দুই সঙ্গী আবদুল মুহিত ও ফিরোজ আলম। গাড়িচালক হিসেবে ছিলেন আমিরউদ্দিন। রাত ২টা ৩৬ মিনিটে ত্ব-হাকে তাঁর স্ত্রী ফোন দেন। তখন বলেন, তিনি এখন ঢাকার গাবতলীতে আছেন। মুঠোফোনের চার্জ প্রায় শেষ। এরপর থেকে ত্ব-হাসহ চারজনের মুঠোফোন নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়। 

পরদিন তাঁর মা আজেদা বেগম রংপুর কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর ১৬ জুন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আবু ত্ব-হার সন্ধান চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী সাবিকুন নাহার। এর মধ্যে রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাঁর মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই তাঁর মুক্তি দাবি করেন। ঘটনার আট দিন পর ১৮ জুন শুক্রবার চারজনকেই পাওয়া যায়। 

রংপুর নগরীর সেন্ট্রাল রোডে আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনানের বাড়ি। অনলাইনে আরবি পড়ানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন মসজিদে জুমার খুতবা দিতেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক এবং ইউটিউবে বেশ জনপ্রিয় আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনান।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ

x