‘শিক্ষক’ মেরুদণ্ডহীন এক পেশার নাম

‘শিক্ষক’ মেরুদণ্ডহীন এক পেশার নাম
কাবিল সাদী   © টিডিসি ফটো

একটা সময় ছিল সবচেয়ে ভাল পেশা,পরিবার বা ভাল মানুষের সারিতে প্রথম যে নামটা উঠে আসতো তা ছিল যথাক্রমে শিক্ষক বা শিক্ষক পরিবার। কখনো কখনো ‘মাস্টার সাহেবের বাড়ি’ বা ‘মাস্টার পাড়া’ এলাকা বা গ্রাম মহল্লাকে আলাদা ইতিবাচক পরিচিতি দিয়েছে। 

বংশ মর্যাদা ও ভাল মানুষের মানদন্ডের বিচারে শিক্ষক শ্রেণি ছিল সর্বাগ্রে। এমন কি বিয়ের কনে বা বর পছন্দ তথা নতুন আত্মীয়  তৈরিতে প্রাধান্য দেয়া হতো শিক্ষক পরিবারকেই অথচ এখন শুনতে অবাক লাগেলেও এটাই প্রকৃত সত্য যে শিক্ষক পেশার পাত্রও এখন অবজ্ঞার শিকার।

জাতির মেরুদণ্ড দাড় করাবার দায়িত্বে যারা আছেন তারাই এখন মেরুদণ্ডহীন। অনেকেই পেশাটিকে তাচ্ছিল্য করে বলেন ‘মাস্টর’। একটা সময় শিক্ষক ছিল একজন ছাত্রের স্বপ্নচারী পেশা এবং গল্প, উপন্যাস বা বাস্তব  সমাজ জীবনে এক দাপুটে চরিত্র। ছাত্রদের যে ছোটখাটো আড্ডা হতো সেটারও অধিকাংশ সময় আলোচ্য বিষয় জুড়ে থাকতো কোন শিক্ষক কেমন ব্যক্তিত্বের এমন কি সেই ব্যক্তিত্ব ও সমাজের গ্রহনযোগ্যতায় ছাত্ররাও ভবিষ্যতে শিক্ষক হবেন বলে মনস্থির করতেন। অথচ জীবন বাস্তবতায় এসব চরিত্র এখন সভ্য ও শিল্পোন্নত  সমাজে প্রয়োজনহীন লণ্ঠনের মত মরীচা ধরা। 

এই সময়ে শিক্ষক পেশাকে তারাই বেছে নেন যাদের মূলত আর তেমন কোনো চাকুরী জুটেনি অগত্যা অনিচ্ছায় এই পেশায়। কী অদ্ভুত পরিবর্তন। এই প্রকৃতি শুধু প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকের ক্ষেত্রেই নয় বরং শিক্ষার্থীদের অন্যতম মূল আকর্ষণ বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারেও। এই পেশাতেও যারা চাকরি পান তাদের প্রায় বড় অংশই পরবর্তী বিসিএস দিয়ে এই চাকুরী পরিবর্তনের আপ্রাণ চেষ্টা করেন তার সুযোগ থাকা পর্যন্ত। তার মানে মোটা দাগে বলতে গেলে শিক্ষক পেশা নিয়ে হতাশার শেষ নেই।

আরও পড়ুন: পদ্মা সেতু: রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণে আওয়ামী লীগের মাইলফলক

এখন প্রশ্ন আসতেই পারে কী এমন ঘটনা ঘটলো যে, এই পেশায় মানুষের স্বস্তি বা শান্তি নেই।আগের তুলনায় বেড়েছে বেতন ও কিছু সুবিধাও অথচ তারপরও কেন এই চিত্র।

শ্রেণী সংগ্রামের যে ইতিহাস আমাদের শিক্ষকরা পড়ান মূলত সেই শ্রেণী দ্বারাই তারা শাসিত, শোষিত ও বঞ্চিত। আমলাতান্ত্রিক এক মেরুকরণ ক্ষমতায় উচ্চপদস্থ শিক্ষকদের ভবিষ্যতও নামেমাত্র সরকারি কর্মচারী অথচ তারই সমগ্রেডের ব্যাচমেট বন্ধুরা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের দায়িত্বে।একই ব্যাচের বিসিএস ক্যাডার হলেও অন্যান্য ক্যাডারদের তুলনায় সুযোগ সুবিধা ও ক্ষমতাতে তাদের গ্রহণযোগ্যতা সমাজ ও বাস্তব জীবনে রাজা-প্রজার তুল্য। অন্যদিকে যে মর্যাদা ও সম্মান তাদের সান্ত্বনা ও ভালবাসার জায়গা ছিল সেটিও এখন শূন্যের কোঠায়।আর যে মেধাবীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে শামসুজ্জোহা,জি সি দেব বা হুমায়ুন আজাদ হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তারাও শিক্ষকদের নীল-সাদা রাজনৈতিক দলাদলির মারপ্যাঁচ আর তৈল মর্দনের দক্ষতার অভাবে হোচট খেয়ে বিসিএস ক্যাডার বা ব্যাংকার হয়ে স্বপ্ন বিসর্জন দিচ্ছেন।

এই যে এক সামগ্রিক অবস্থা তার পরিণতিতে জাতির মেরুদণ্ড এখন ক্যালসিয়াম বিহীন সাধারণ হাড় মাত্র।ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যেতে পারে সামান্য ধাক্কায়।

গত কদিনেই দেখতে পেলাম নড়াইলে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরানো হয়েছে। ডেইলি স্টার নিউজ করেছে, রাজশাহীতে বাড়ি দখল হয়ে গেলেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক। যিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এবং পদার্থবিজ্ঞানে দেশের একমাত্র ইমেরিটাস অধ্যাপক।

ময়মনসিংহে শিক্ষকদের জিম্মি করেছে ক্ষমতাসীন নামধারী ছাত্র সংগঠন, যারা মূলত ভর্তি বাণিজ্য ও শিক্ষার্থীদের থেকে চাদা আদায় করতো। এদের কাছে প্রায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর শিক্ষকগন লিয়াজো করে চলেন তাদের অসহায় ব্যক্তিত্ব নিয়ে। অন্যদিকে প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নীতি নির্ধারনী দায়িত্বে থাকেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা এলাকার চটি নেতা যারা এই শিক্ষকদের থোড়াই কেয়ার করে চলেন ফলে হীনমন্যতায় ভোগেন স্কুলের প্রধান শিক্ষকও।এই বাস্তবতা কলেজ গুলিতেও। 

তবে এবারের বাস্তবতা আরও নির্মম। খবরে দেখলাম ঢাকার সাভারে উৎপল কুমার  নামের একজন শিক্ষককে ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে দিনের বেলায় প্রকাশ্যে পিটিয়ে আহত  করেছিল জিতু নামের তারই  এক বখাটে ছাত্র এবং শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে তিনি মারা যান। এই ছাত্রকেই তিনি ইভটিজিংয়ের কারণে শাসন করেছিলেন, একাধিকবার কাউন্সিলিংও করেছেন এবং ঐ শিক্ষক উক্ত প্রতিষ্ঠানের নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতিও ছিলেন।একজন শিক্ষক যদি নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা রক্ষার্থে ছাত্রদের শাসনই না করতে পারেন তাহলে আমাদের শিক্ষা পদ্ধতিই বা রাখার দরকার কী সেটা আমাদের বোধগম্য নয়।

সামাজিক নৈতিকতার জায়গা অনেক আগেই ভেঙ্গে পড়েছে আর পারিবারিক নৈতিকতার জায়গাও দিন দিন নাজুক বাকী ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখানেও আর কোনো শিক্ষক তার জীবনের ঝুকি নিয়ে নৈতিকতার আলো ছড়াবে না,কোনো উৎপল সরকার অসহায় ছাত্র-ছাত্রীদের অভিযোগ কানে তুলবে না ।কারণ তিনি উপলব্ধি করেন জাতি গঠনের দায়িত্ব তাকে দেয়া হলেও তার মেরুদণ্ড দাড় করিয়ে রাখার ক্ষমতা আমাদের রাষ্ট্র বা সরকার তাকে দেয়নি।

আরও পড়ুন: ‘বাবা বলেই তাকে নিয়ে গর্ব করবে-এমন সন্তানদের জন্যই এতো দুর্নীতিবাজ’

যে কেউ শিক্ষককে কানে ধরাতে পারে,জুতার মালা পরাতে পারে আবার এই শিক্ষকরাই যখন নাম মাত্র বেতন ভাতার জন্য প্রেস ক্লাবে দিনের পর দিন মানবেতর জীবন নিয়ে আন্দোলন করে পুলিশের লাঠিপেটা খেয়ে ব্যর্থ হন তখন সমাজ বা ছাত্রদের চোখে শিক্ষকরা হলেন দেশের অক্ষম নাগরিক, যাদের চাইলেই পেটানো যায় এমনকি পিটিয়ে মেরেও  ফেলাও যায় আর সেই শিক্ষাই জিতুর মত শিক্ষার্থীরা গ্রহণ করছে এবং উৎপল কুমাররা নৈতিকতা শেখানোর বদৌলতে জীবন দিয়ে তার ফল ভোগ করছে ।বর্তমান বাস্তবতায় ছাপোষা মেরুদণ্ডহীন জীবনই শিক্ষকের জন্য মানানসই।

তাদের একমাত্র ক্ষমতার সামান্য  হাতের বেত খানাও আমরা  কেড়ে নিয়েছি একদিন হয়তো তাদের গায়ের পোশাকও খুলে নিতে পারবো। এখন তাদের কেবলই দায়িত্ব শুধুই রোবটের মত পড়িয়ে যাওয়া আর যন্ত্রের মত পরীক্ষা নেয়া।আর হাস্যকর ও দুঃখজনক হলেও এই মেরুদন্ডহীন শিক্ষককেই দেয়া হবে শিক্ষা নামক জাতির মেরুদণ্ড গঠনের দায়িত্ব অথচ একটি জাতি গঠনের দায়িত্বে থাকা এই পেশাকে করা উচিৎ সবচেয়ে আকর্ষণীয়।শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনে জুডিশিয়ারির মত শিক্ষকদেরও আলাদা আকর্ষণীয় বেতন কাঠামোও করা যায় কি না তা সংশ্লিষ্টদের ভাবতে হবে  এবং একই সাথে কঠোর ভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে যেন,তারা ক্লাসের বাইরে কোনো প্রাইভেট সার্ভিস বা টিউশন/কোচিং-এ যুক্ত না হন।তবেই সমাজ তাদের সম্মানের চোখে দেখা শুরু করবে আর শিক্ষার্থীরাও তাদের অভিভাবকদের দেখে নিজেরাও সম্মান করা শুরু করবে,ছাত্ররা শিক্ষকের খুনি নয় বরং শিক্ষকের আদর্শ লালনকারী ভবিষ্যৎ শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন লালনকারী হয়ে বেড়ে উঠবে। সমাজের চোখ বদলালে এবং শিক্ষকের মর্যাদা ফিরে এলে সবচেয়ে যোগ্য, দক্ষ ও মেধাবীরা যোগ দিবেন জাতি গড়ার কারিগর শিক্ষক পেশায়।

লেখকঃ কলামিস্ট ও নাট্যকার ।


x