০২ মে ২০২২, ১৭:১৬

রাবির ইবলিশ চত্বরের গল্প!

সন্ধ্যায় যখন জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়েরা বসে তখন মনে হয় ইবলিশ চত্বর না  © টিডিসি ফটো

বেশ কয়েক বছর আগে ’রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার গল্প’ শিরোনামে আমার একটা লেখা প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম আলোতে। লেখাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বেশ সাড়া ফেলেছিল। একজন ছাত্র ধন্যবাদের পাশাপাশি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইবলিশ চত্বর নিয়ে কিছু লেখার জন্য ফোনে অনুরোধ করেছিল। ইবলিশ চত্বরে ইবলিশি কারবার চলে বলে ছাত্রটি আমাকে জানিয়েছিল। ইবলিশি কারবার বলতে সে কী বোঝাতে চেয়েছিল তা শোনা হয়নি তখন।

তারপর নানা ব্যস্ততায় ইবলিশ চত্বর নিয়ে লেখা হয়নি। কিন্তু মাথায় বিষয়টি ঘুরপাক খেয়েছে। সেই সময় ইবলিশ চত্বরে আমি নিজেই কয়েকবার ঘুরপাক খেয়েছি, কিন্তু ইবলিশি কিছু চোখে পড়েনি। 

অবশ্য আমার ঘোরাঘুরিটা ছিল দিনের আলোতে, ইবলিশি কারবার নাকি হয় রাতের আঁধারে। করোনা পরবর্তীতে এ ধারণা আমূল পরিবর্তন হয়েছে। এখন রাত-দিন সমান হয়ে গেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্টরের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রতিনিয়ত ইবলিশি কারবারের নানান অভিযোগ আসছে এবং সহকারী প্রক্টরেরা অভিযুক্তদের ধরে নিয়ে সালিশ বসাছেন। কিন্তু ইবলিশি কারবারের কোনো উত্তরায়ণ ঘটছে না; বরং আরো বেড়ে চলেছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী ভবনের উত্তর দিক, মমতাজ উদ্দিন কলা ভবনের পশ্চিম দিক এবং পুরাতন নার্সারি স্কুলের দক্ষিণ দিকের খোলা মাঠটিকে ইবলিশ চত্বর বলা হয়। মাঠটির নামকরণ কেন ইবলিশ চত্বর বলা হলো তার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে চমকপ্রদ সব তথ্য পাওয়া যায়। জানিনা সে সব তথ্যের সত্যতা কতটুকু। কথিত আছে, এক ঝাঁক তরুণ ছাত্র সমাজের বিভিন্ন নিয়ম-অনিয়মের আলোচন-সমালোচনা থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখতে গানের আসর বসাত এ মাঠে। পরবর্তীতে গানের আসর হয়ে ওঠে গাঁজার আসর, ফেনসিডেলের আসর। ঝাঁকের সদস্যরা নিজেদেরকে ইবলিশের বংশধর ভেবে গর্ববোধ করত। 

কারণ ইবলিশ যেমন সৃষ্টিকর্তার হুকুমের বিরোধিতা করে ইবলিশি উপাধি পেয়েছিল, তেমনি ঝাঁকের সদস্যরা সমাজের বা তাদের পিতামাতার অবাধ্য হয়ে ইবলিশি কারবারে আনন্দ পেত। ঝাঁকের কার্যকলাপে মাঠটির নামকরণ হয়ে ওঠে ইবলিশ চত্বর। মতান্তরে, এক বয়স্ক ব্যক্তি একদিন উক্ত মাঠের মাঝ দিয়ে যাচ্ছিলেন। মাঠের পুকুর পাড়ে কয়েকজন ছাত্রী বসে গল্প করছিল। বয়স্ক ব্যক্তিকে আসতে দেখে এক ছাত্রী বলে বসে, এ দাদু আসছে আস্তে বল। অপর এক ছাত্রী দাদুকে শুনিয়ে বলে, আরে দাদুর কী আর বয়স আছে? দাদুও কম যাননি। দাদু ছাত্রীদের কাছে গিয়ে বলেছিলেন, শোন ইবলিশের দল, দাদুরও একসময় তোমাদের মতো বয়স ছিল। সেই থেকে নাকি জায়গাটির নাম হয়েছে ইবলিশ চত্বর।

পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নার্সারি স্কুলে ফোকলোর বিভাগ চালু হওয়ার পর থেকে ইবলিশ চত্বরের নাম হয়ে ওঠে ফোকলোর চত্বর। ফোকলোর বিভাগকে নির্ধারিত জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হলে মাঠটি আবারো ইবলিশ চত্বর হয়ে ওঠে। ফোকলোর বিভাগের একজন শিক্ষকের মাধ্যমে জানা যায়, ফোকলোর চত্বরে ’ইবলিশ’ নামে একটি নাটক মন্থস্ত হওয়ার পর থেকে উক্ত মাঠটি ইবলিশ চত্বর নামে পরিচিতি পায়।

ইবলিশ চত্বরের ইতিহাস আরো জঘন্য হয়ে ওঠে যখন পত্রিকায় দেখা যায় গাঁজা-ফেনসিডিলের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক খুন করার পরিকল্পনাও করা হয় ইবলিশ চত্বরে বসে। যে জায়গা নিয়ে এত ভীতিকর অবস্থা সেই ইবলিশ চত্বরকেই ছাত্রছাত্রীরা বেছে নিয়েছে প্রেম নিবেদন বা প্রেমালাপের নিরাপদ জায়গা হিসেবে। এখানে সন্ধ্যায় যখন জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়েরা বসে তখন মনে হয় ইবলিশ চত্বর না- এটা প্রেমের হাট-বাজার। মাঝে মধ্যে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও স্কুল ফাঁকি দিয়ে ইবলিশ চত্বরে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিতে আসে। করোনা পরবর্তীতে অথ্যার্ৎ গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে পিকনিক, নবীন বরণ, বিদায় অনুষ্ঠান, ইফতারপার্টিসহ নানা ধরণের প্রোগ্রামের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে দলবেধে ছাত্রছাত্রী এবং বহিরাগতদের আনাগোনা। প্লাস্টিক, ওয়ান টাইম থালা-গেলাসসহ ময়লা-আবর্জনায় পরিবেশ যেমন দূষণ হচ্ছে, তেমনি উচ্চ স্বরে মাইকের শব্দে আবাসিক এলাকাগুলোতে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার বিঘ্ন ঘটছে। 

তবে আনন্দের খবর হলো বাংলা নববর্ষ এলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কয়টি জায়গা ছাত্রছাত্রী বা আমাদেরকে কাছে টানে তার মধ্যে অন্যতম হলো ইবলিশ চত্বর। মাঠের এক পাশে বিরাট স্টেজে চলে কবিতা আবৃতি, বইমেলা এবং ব্যান্ড সংগীতের তালে তালে দেশীয় লোকজ সংগীত। আবার বিভিন্ন বিভাগের উদ্যোগে উক্ত চত্বরে নাটক এবং যাত্রপালাও হতে দেখা যায়। 

ছাত্রছাত্রীরা নববর্ষে বাংলার মেলাকে প্রাণের মেলা, গানের মেলা এবং ঐতিহ্যের মেলা হিসেবে তুলে ধরে। বাংলার মানুষ যে তাদের হাজার বছরের লালিত লোকজ সংস্কৃতিকে কতটা ভালবাসে তার প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলা নববর্ষে। বাংলার আবহমানকালের ঐতিহ্যকে স্মরণ এবং উদযাপন করতে ঘর থেকে বের হয় সকল ধর্মের সকল পেশার মানুষ। আর এসব মানুষের পদচারণায় একদিনের জন্য হলেও মুছে যায় ইবলিশ চত্বরের যাবতীয় কালিমা। 

ইবলিশ চত্বরের পাশাপাশি এবারে পিকনিক, নবীন বরণ, বিদায় অনুষ্ঠান, ইফতার পার্টিসহ নানা প্রোগ্রামের ঢল নেমেছে বধ্যভূমি, জুবেরীর মাঠ, চারুকলা এবং স্টেডিয়ামের সামনে ঝাউ বাগানে। একই জায়গায় দিনে পাঁচ-ছয়টি পার্টি হওয়াতে গন্ডোগোলের উপক্রমও হয়েছে। সমাধানে প্রক্টোরিয়াল বডির সদস্যদের যেয়ে হস্তক্ষেপও করতে হয়েছে। ছেলেমেয়েদের চলাফেরা এবং উঠাবসাতেই এসেছে আমূল পরিবর্তন। ইফতারের প্রস্তুতি হিসেবে একটা বেডসিট বিছিয়ে কিছু ইফতারি আইটেম নিয়ে এবং একটি কয়েল ধরিয়ে বসে যায় তারা। মাগরিবের সময় হয়, এশার সময় শেষ হয় কিন্তু ইফতারি আর শেষ হয় না। আমরা তাদের উঠে যেতে বললে বিরক্তি প্রকাশ করে। দিনে মাঠগুলোর দিকে তাকালে মনে হয় শুধু সাদা ময়লা-আবর্জনার স্তুপ। পরিষ্কার-পরিছন্নতা কর্মীরা মাঠগুলো পরিস্কার করলে পরের দিন আবার একই চিত্র দেখা যায়। পরিশেষে সবার কাছে আহবান, আসুন সবাই মিলে আমরা আমাদের প্রাণের ক্যাম্পাস সুন্দর রাখি, পরিষ্কার রাখি। সকল অপকর্ম থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখি। ভালো কাজের সাথে থাকি।

লেখক: প্রক্টর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়