যারা অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপর হামলা করে তারাই ইসলাম ও রাষ্ট্রের শত্রু

করোনা
রাহিম সরকার (সদ্য সাবেক জিএস) স্যার এ এফ রহমান হল ছাত্র সংসদ  © টিডিসি ছবি

ইহুদীদের দেওয়া কষ্টে যখন প্রিয় নবীর পবিত্র শরীর থেকে রক্ত ঝরলো, হযরত জিব্রাঈল (আঃ) কে এই মর্মে আসমান হতে পাঠানো হলো যে, তুমি যাও যদি আমার মুহাম্মদ তোমাকে আদেশ করে তাহলে তাদেরকে (ইহুদীদের) দুই পাহারের মাঝে চাপা দিয়ে পিষ্ট করে দিও। হযরত জিব্রাঈল (আঃ) নবীজির কাছে আদেশ চাইলে তিনি না করে দিলেন। উত্তরে বললেন, তাদের কে যদি আপনি ধ্বংস করে দেন তাহলে আমি দ্বীন প্রচার করবো কার কাছে। তারাও তো আমার উম্মত। তারা আজ অবুঝ হয়ে এমন কাজ করেছে, পরে তারাই আমাকে আপন করে নিবে।

আমাদের প্রিয় নবী (সঃ) ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে স্পষ্ট মানা করেছেন। পবিত্র কুরআনেও একই কথা বলা হয়েছে। তাহলে কিসের ভিত্তিতে ভিন্ন ধর্মী মানুষদের উপর এই হামলা, তাদের উপাসনালয় ভাঙচুর করা??

কুমিল্লার নানুয়ার দিঘিরপাড়ে শারদীয় দুর্গাপূজার মণ্ডপে মূর্তির কোলে আল কোরআন রেখে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের অবমাননার মাধ্যমে মুসলমানের ধর্মীয় চেতনায় আঘাত করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে কোনো কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। কোনো নিষ্ঠাবান সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু বা মুসলমানের পক্ষে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআন নিয়ে এমন অবমাননাকর কাজ করা অসম্ভব। এমন সময় এ ঘটনা ঘটানো হলো, যখন দেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা উৎসবের আমেজে মহাসমারোহে দুর্গাপূজা পালন করছে।

আমি একজন মুসলিম পরিবারের সন্তান হয়ে গ্যারান্টি নিয়ে বলতে পারি, যারা ইসলাম ধর্মের বরাত দিয়ে এই ঘৃণ্য গর্হিত কর্ম ঘটিয়েছে বা ঘটিয়ে যাচ্ছে তারা আর যাই হোক ইসলাম ধর্মের অনুসারী হতে পারে না, পারে না। ইসলাম আমাদের সাম্যের কথা শেখায়, ইসলাম আমাদের ঐক্যের কথা শেখায়।মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি, অন্য ধর্মের প্রতি বিমাতাসূলভ আচরণ কখনো ইসলামের শিক্ষা হতে পারে না। অন্য ধর্মের অনুসারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তাদের উপাসনালয়, তাদের জানমালের হেফাজত করা ইসলামের মহান শিক্ষাগুলোর মধ্যে অন্যতম।

আমি মনে করি,ধর্মের অপব্যাখ্যা বা নিজেদের মন মতো ফতুয়া দিয়ে কিংবা রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার স্বার্থে যারা সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে অন্য ধর্মের অনুসারীদের উপর হামলা করে তারাই মূলত ইসলামের শত্রু, তারা রাষ্ট্রের শত্রু। তাদেরকে প্রতিহত করতে হবে। তা না হলে সম্প্রীতির এই বাংলা একদিন আফগান রাষ্ট্রে পরিণত হবে। অন্য ধর্মের ভাই-বোনদের জান-মালের হেফাজত করা তাই আমাদের সকলের দায়িত্ব। প্রথমে নিজ ধর্ম কে ভালোকরে জানতে হবে,তারপর পালন করতে হবে।ইসলাম ধর্ম যেখানে অন্য ধর্মাবলম্বীদের কে সম্মান দিচ্ছে সেখানে আমি আর আপনি কে??

যারা আজ ইসলাম ধর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করার নোংরা খেলায় নেমেছে তাদের কে প্রতিহত করাই আমাদের প্রধান কাজ।তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সামাজিকভাবে তাদেরকে বয়কট করতে হবে।

এ দেশে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, বাঙালি, মগ, চাকমা –সব ধর্মের, সব জাতির মানুষের যে সহাবস্থান এবং সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক, তা পৃথিবীতে বিরল। প্রকৃতপক্ষে সব ধর্মের মর্মবাণী হচ্ছে মানবসেবার মাধ্যমে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি স্থাপন করা, মানুষের মঙ্গল করা। ধর্মের এই মর্মবাণী সবাই ধারণ করতে পারলেই পৃথিবীতে কোনো হানাহানি, মারামারি ও অশান্তি আর থাকবে না।

বাংলাদেশে সাংবিধানিকভাবে বিভিন্ন ধর্মের লোকদের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধান সবাইকে যে কোনো ধর্ম গ্রহণ, চর্চা ও পালন করার অধিকার দিয়েছে। প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনা করার অধিকার রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের এক অনুচ্ছেদে বলা আছে, রাষ্ট্র কখনোই তার নাগরিকদের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ ও জন্মস্থান ভেদে কোনো প্রকার বৈষম্য করবে না। তাই সম্প্রীতি আর আন্তরিকতা নিয়ে আমাদের এগোতে হবে সামনে। কোনো দ্বন্দ্ব বা হিংসা-বিদ্বেষ যেন না থাকে, তার প্রয়াস চালাতে হবে। পৃথিবীর সব দেশের কাছে আমরা সম্প্রীতির মডেল হতে চাই। অসাম্প্রদায়িক এই উজ্জ্বল আদর্শকে রক্ষা করে চলতে হবে আমাদের। বজায় রাখতে হবে সম্প্রীতির সহাবস্থান।

আমার স্পষ্ট অবস্থান সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকারের পক্ষে। আমি মুসলমান হিসেবে মসজিদকে যেমন পবিত্র জ্ঞান মনে করি, তেমনি হিন্দুদের উপাসনালয়, খ্রিষ্টানদের গীর্জা,বৌদ্ধদের প্যাগোডাকেও পবিত্র জ্ঞান মনে করি। সকল ধর্মের সকল মানুষের জন্য একটি মানবিক বিশ্ব নির্মাণে আমি বদ্ধ পরিকর। যেখানে আমাদের পরিচয় হবে একটাই আমরা সবাই ভাই ভাই। মানবতা হবে আমাদের আসল ধর্ম। ভালো থাকুক বাংলার হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান।

লেখক: সদ্য সাবেক জিএস, স্যার এ এফ রহমান হল ছাত্র সংসদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ

x