মানুষের একজন হলেও বন্ধু থাকা প্রয়োজন

বন্ধু দিবস
মানুষের একজন হলেও বন্ধু থাকা প্রয়োজন  © সংগৃহীত

“দুর্ভাগ্যবান তারাই, যাদের প্রকৃত বন্ধু নেই’’। জগৎখ্যাত মনীষী এরিস্টটলের অমর এই বাণীটুকু চলার পথে সর্বদা আমাদের বন্ধুত্বের গুরুত্বের কথা স্বরণ করে দেয়। সেজন্য জীবনে চলার পথে সকলের একজন হলেও বন্ধু প্রয়োজন। কেননা, বন্ধুহীন মানুষ চার্জ ছাড়া মোবাইলের মতো।

তাইতো বিখ্যাত মনীষী নিৎসে বলেছেন, ‘‘একজন বিশ্বস্ত বন্ধুত্ব হচ্ছে প্রাণরক্ষাকারী ছায়ার মতো। যে তা খুঁজে পেলো, সে যেন একটি গুপ্তধন পেলো।”

হাসি-তামাশা, হট্টগোল, খুনসুটি, মান-অভিমান, বিরক্তি, হিংসা ও ভালোবাসা এসব মিলেই তৈরী হয় একটি বন্ধুত্বের সম্পর্ক। ঠিক তেমনি দিন শেষে সব ভুলে প্রকৃত বন্ধুত্বের বন্ধনটা ঠিকই টিকে থাকে এবং নতুন সকালে ফের শুরু হয় বন্ধুত্বের সেই খুনসুটি।

বন্ধুত্ব এমন একটা সম্পর্ক যা হৃদয়ের গভীরে নিমেষেই দাগ কেটে যায়। সুতরাং প্রত্যেকের জীবনে অন্তত একজন বন্ধু থাকা প্রয়োজন, যে তার আবেগ-অনুভূতির মূল্যায়ন করবে।

কেনান, জীবন হলো একটা রেল স্টেশনের মতো, যেখানে ভালোবাসা হলো ট্রেন। যা আসে আবার চলেও যায়। কিন্তু বন্ধুত্বটা হলো রেল লাইনের মতো যা চিরকাল থেকে যায়।

হেলেন কেলারের ভাষায়, ‘‘অন্ধকারে একজন বন্ধুর সঙ্গে হাঁটা, আলোতে একা হাঁটার চেয়ে উত্তম।”

তাই এমন একজন বন্ধু দরকার, যে সবসময় ভালো পথ দেখাতে না পারলেও, প্রয়োজনে ঠিকই ঘাড় ধরে খারাপ পথ থেকে ফেরাবে। সুতরাং, ছলনাময় এই পৃথিবীতে একজন প্রকৃত বন্ধু থাক খুবই প্রয়োজন। আর জীবনে একজন সৎ বন্ধু পাওয়ার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো, নিজেকে একজন সৎ বন্ধু হিসেবে গড়ে তোলা।

জৈনক এক মনীষীর ভাষায়, তুমি যত বড় হবে, ততো বুঝতে পারবে বন্ধুত্ব একটি আলাদা সম্পর্কের নাম।

বন্ধুত্বের উপমা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, গোলাপ যেমন একটি বিশেষ জাতের ফুল, বন্ধু তেমনি একটি বিশেষ জাতের মানুষ।

সুতরাং প্রকৃত বন্ধুত্ব কোনভাবেই নষ্ট করা উচিৎ না। কেননা, বন্ধু হারানো সত্যিই খুব কষ্টের। কারণ প্রেমিক-প্রেমিকা হারালে তার দুঃখ কাটিয়ে ওঠা যায়, কিন্তু প্রকৃত বন্ধু হারালে তার দুঃখ কাটিয়ে উঠতে সারাজীবন লেগে যায়।

তাইতো সিসরো বলেছেন, ‘‘কখনো কোনো বন্ধুকে আঘাত করো না, এমনকি ঠাট্টা করেও না।” এ বিষয়ে থমাস কার্লাইস বলেছেন, ‘‘বন্ধুত্ব একবার ছিঁড়ে গেলে পৃথিবীর সমস্ত সুতো দিয়েও রিপু করা যায় না।’’

কেননা, প্রেমের মানে যেখানে, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না! বন্ধুত্বের মানে সেখানে, আমি থাকতে তোর কিছু হতে দেবো না!

যে বন্ধু, “কিছু হয়নি” শোনার পরেও, “আরে বল না কি হয়েছে” জানতে চায়, অন্তত এমন একজন বন্ধু কখন হারানো উচিৎ নয়। কেননা, তারা বন্ধুত্বের মূল্যালয় করতে জানে।

সেই প্রকৃত বন্ধু, যে বন্ধুর চোখের প্রথম ফোঁটা জল দেখে দ্বিতীয় ফোঁটা পড়ার আগে ধরে ফেলে এবং তৃতীয় ফোঁটা পরার আগে তা হাসিতে পরিণত করতে উঠে পড়ে লাগে এবং তার আবেগ, বিরক্ত ও ভালোবাসা দিয়ে দুঃখ ভুলাতে চায়। পকেট ফাঁকা জেনেও বন্ধুর মন ভালো করতে ট্রিট দেয়ার জন্য হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়। নিজের ক্লান্তি, বিরক্ত ভুলে ঘন্টার পর ঘন্টা বন্ধুকে সঙ্গ দিয়ে যায়, এদের কখনো হারানো উচিৎ না।

বন্ধুত্ব সহজে হয়না ঠিকই, তবে একবার হয়ে গেলে তা সহজে নষ্টও হয় না। কেননা, বন্ধুত্ব গিটারের তারের মতো, একবার টিউনিং ঠিকঠাক হয়ে গেলে প্রতিটি তার-ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রকৃত বন্ধুত্বে সৎ থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সততাই প্রকৃত বন্ধুর পরিচয় বহন করে। কেননা, যে সম্পর্কে বিশ্বস্ততা নেই, তা কোন সম্পর্ক হতে পারে না। সৎ হলে হয়তো অনেক বন্ধু পাওয়া যাবে না, কিন্তু সহজে প্রকৃত বন্ধুদেরকে চিনে নেয়া যাবে। অনুরূপভাবে, সাফল্য যেমন নতুন বন্ধু দেয়, তেমনি ব্যর্থতা দেখিয়ে দেয় প্রকৃত বন্ধুর রূপ।

তাইতো প্রকৃত বন্ধু নির্বাচনে যত্নবান হওয়া দরকার। বিখ্যাত ব্যাক্তিত্ব অস্কার ওয়াইল্ড বলেছেন, ‘‘একজন সত্যিকারের বন্ধু তোমাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।” এরিস্টটল বলেছেন, ‘‘প্রকৃত বন্ধুত্ব দুই দেহে এক আত্মা।’’
 
মানুষকে কাছে পাওয়ার একমাত্র পন্থা হচ্ছে বন্ধুত্ব। যে সম্পর্কের হাত বাড়ালে পরম শত্রু মিত্র হয়ে যায়। উইড্রো উইলসন বলেছেন, ‘‘বন্ধুত্ব একমাত্র সিমেন্ট যা সবসময় পৃথিবীকে কত্র রাখতে পারবে।”

বন্ধুত্ব নিয়ে উইলিয়াম শেক্সপিয়র বলেছেন, কাউকে সারা জীবন কাছে পেতে চাও? তাহলে প্রেম দিয়ে নয় বন্ধুত্ব দিয়ে আগলে রাখো। কারণ প্রেম একদিন হারিয়ে যাবে কিন্তু বন্ধুত্ব কোনোদিন হারায় না।’’

বিখ্যাত এমারসন বলেছেন, ‘‘প্রকৃতির সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির নাম বন্ধুত্ব।” সেজন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, আমরা বন্ধুর কাছ থেকে মমতা চাই, সমবেদনা চাই, সাহায্য চাই। আর সেজন্যই আমরা বন্ধুকে চাই।”

সুতরাং জীবনে চলার পথে একজন হলেও প্রকৃত বন্ধু গড়ে তোলা দরকার। যদি খুঁজে না পাও, তবে নিজে হয়ে যাও।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ