মানুষ আত্মহত্যা কেন করে?

মানুষ আত্মহত্যা কেন করে?
প্রতীকী  © সংগৃহীত

আত্মহত্যার কারণ নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে। আশির দশক পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মনে করতেন, গভীর বিষণ্ণতা এবং অন্যান্য মানসিক রোগ যেমন সিজোফ্রেনিয়া, বাই-পোলার, মুড ডিসঅর্ডার ইত্যাদির সঙ্গেই শুধু আত্মহত্যা জড়িত।

তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, প্রায় ১০ শতাংশ আত্মহত্যার ক্ষেত্রে কোনো রকমের মানসিক রোগ জড়িত ছিল না। শুধু তা-ই নয়, আত্মহত্যার রোগীদের মস্তিষ্কের গঠন এবং স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত রাসায়নিক পদার্থগুলোর মধ্যেও একজন সাধারণ সুস্থ মানুষের তুলনায় পার্থক্য পাওয়া যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা আরও খুঁজে পেয়েছেন বংশগতির সূত্র। প্রায় ১৫-১৬ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে এই বংশগতির যোগসূত্র একেবারে প্রমাণিত। সেই সঙ্গে সামাজিক, পরিবেশগত কারণ এবং অন্যান্য ঝুঁকি মিলিয়ে একজন মানুষ আত্মহত্যা করে।

আত্মহত‌্যার প্রবণতা কি রোগ?

মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, বাংলাদেশে গড়ে প্রতিবছর ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। এতদিন বলা হত, আত্মহত‌্যা একটা লক্ষণ। কখনো কোনো ধরনের কোনও অসুখ নয়। কিন্তু এখন এই ধারনায় বদল এসেছে।

আমেরিকার বিখ্যাত কিছু সাইকিয়াট্রিস্ট দীর্ঘদিন গবেষণার পর বেশ কিছু ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরে আত্মহত‌্যাকে সরাসরি একটি রোগ বলেই দাবি করেছেন। তাঁদের মতে, আত্মহত‌্যা বা তার চেষ্টা বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, একে শুধু ডিপ্রেশনের একটি লক্ষণ বলা ভুল।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, আত্মহত্যা দু’ধরনের হয়, পরিকল্পিত এবং আবেগতাড়িত হয়ে বা কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে।

তাঁদের গবেষণা মতে, আত্মহত‌্যার ইচ্ছার কিছু রকম এবং কিছু ধাপ আছে৷ প্রথম ধাপের লক্ষণ হল, রোগী নিজেকে পৃথিবীতে আর দেখতে চান না এবং ভাবতে থাকেন- আমি নিজে সক্রিয় হয়ে কিছু করব না, তবে মৃত্যু চলে এলে ভাল হয়। দ্বিতীয় ধাপে রোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন তিনি কীভাবে মরতে চান এবং সেটা নিয়ে পরিকল্পনা করা শুরু করেন এবং খুব আগ্রহ নিয়েই কাজটি করতে থাকেন। তারপর চরম পরিণতির দিকে এগিয়ে যাওয়া।

এই ধরনের আত্মহত‌্যায় রোগী বেশ কিছুদিন আগে থেকেই সব পরিকল্পনা করে রাখেন। কোন জায়গায় কখন কাজটি করবেন, সব ঠিক করা থাকে। এমনকী রোগী এসব করাকালীন চরম উত্তেজনা অনুভব করতে থাকেন।

আত্নহত্যা আরো এক ধরনের হয়, যেখানে রোগী হঠাৎ কোনও আবেগ থেকে আচমকা আত্মহ‌ত‌্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। অনেক সময় শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনও করে ফেলেন তবে তা খুবই বিরল। এই সব ধরনের লক্ষণগুলিকে এখন ডিসঅর্ডার বলে ধরা হয়। সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে চরম বিষণ্ণতা বা ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন থেকে। অধিকাংশ মানুষ খুব একটা পরিকল্পনা করে আত্মহত্যা করে না।

আত্মহত্যার প্রধান কারণ মানসিক চাপ

একজন মানুষ হিসেবে আমাদের পক্ষে খুব কঠিন ভিন্ন আরেকজনের মানসিক কষ্ট বুঝে, সত্যিকার অর্থে তা অনুভব করা। অধিকাংশ মানুষ এটি বুঝেই না যে বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে কেন লোকে বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। অনেক রোগী ডাক্তারদেরকে বলেছেন যে, তারা যখন আত্মহত্যা করবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তাদের নিজেদের ব্যথাটাই এত বেশি ছিল যে তখন তারা তাদের প্রিয়জনদের কথা ভাবেনি। মনে হতেই পারে এটা খুব স্বার্থপরের মতো আচরণ। কিন্ত আসলে তা নয়। মানুষ আত্মহত্যা করে শুধু নিজে পালিয়ে বাঁচার জন্য। সে আসলে নিজে বাঁচার উপায় হিসেবেই মৃত্যুকে বেঁচে নেয়।

এদের চলে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকলেও, মূল কারণ কিন্তু একটাই, আর সেটা হচ্ছে মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা এবং হতাশা। যা তারা বহন করতে পারেনি। আমরা সবাই এখন এক অর্থহীন দৌড় প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি যেখানে জীবন মানেই অর্থহীন লোক দেখানো ছুটে চলা। এই অস্বাভাবিক ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমাদের হতাশা ও বিষণ্ণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। হতাশা মানুষের সৃজনশীলতা, বিবেকবোধ ও বুদ্ধিমত্তা নষ্ট করে দিচ্ছে। পরিবারের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত মানুষকে আরও চাপের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

মানসিক চাপকে আমরা খুব ভারী বা মোটামুটি ভারী কোনো জিনিসের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। মোটামুটি ভারী কোনো জিনিস আমরা নির্দিষ্ট একটা সময় পর্যন্ত হাতে ধরে রাখতে পারব। এখানে জিনিসটির ওজন কোনো ব্যাপার নয়। ব্যাপার হচ্ছে আমরা কতক্ষণ এটি ধরে আছি।

যত বেশি সময় ধরে থাকব, তত বেশি হাতটা অবশ হতে থাকবে। এই ভারী জিনিসটির মতোই হচ্ছে মানসিক চাপ। প্রচন্ড কোনো মানসিক চাপ একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমরা সহ্য করে নিলেও নিতে পারি, কিন্তু সেই চাপের সময়সীমা দীর্ঘস্থায়ী হলেই বাঁধে বিপত্তি। মানুষ তখন সেই চাপ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে। এরকম কোনো এক পর্যায়েই মানুষ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

আত্মহত্যা নিয়ে কুসংস্কার

আমরা আত্মহত্যার কারণগুলোকে আমলে নেই না বা গুরুত্ব দেই না। এটা যে সাধারণত মানসিক অসুস্থতা বা চাপ থেকে হয়, সেটাও অধিকাংশ পরিবার জানে না। আর জানলেও এটা জানে না যে, এই মানসিক রোগীকে নিয়ে কী করতে হবে। কীভাবে তার পাশে দাঁড়াতে হবে। আমাদের কাছে মানসিক সমস্যা বা চাপ মানে পাগল হয়ে যাওয়া। এর জন্য চিকিৎসকের কাছে যাওয়া মানে পাগলের ডাক্তারের কাছে যাওয়া যা অনেকের কাছেই এখনো অসম্মানের! অথচ প্রায় ২৭ ভাগ থেকে ৯০ ভাগেরও বেশি ক্ষেত্রে আত্মহত্যার সঙ্গে মানসিক অসুস্থতার সম্পর্ক রয়েছে!

আত্মহত্যা নিয়ে মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন, অনেক ভুল ব্যাখ্যা, ভয় এবং কুসংস্কার কাজ করে। প্রতিটি আত্মহত্যার পেছনে যিনি আত্মহত্যা করেন, তার নিজস্ব কিছু কারণ থাকে। প্রতিটি মানুষ আলাদা, আবেগ-অনুভূতিও আলাদা। তাই কেউ কেন সুইসাইড করল, এটা চট করে বলা খুব কঠিন। ডাক্তাররা কারণ বের করার চেষ্টা করেন, কিন্তু একজন মানুষের মনের মধ্যে ঠিক কী ঘুরছে এটা বোঝা কঠিন।

কেন সে এই সময়ে আত্মহত্যা করলো এটা জানাও প্রায় অসম্ভব। আত্মহত্যা নিয়ে আলোচনা মানে এই নয় যে অন্যকে আত্মহত্যায় উৎসাহিত করা। বরং এই সম্পর্কিত সচেতনতামূলক আলোচনার মাধ্যমেই কঠিন পরিস্থিতিতে মনোবল ধরে রাখার উপায় সম্পর্কে মানুষ জানতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, আত্মহত্যা সম্পর্কে সচেতনতামূলক আলোচনা যত বাড়ে মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ততটাই কমে যায়।

আত্মহত্যার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা

যখনই কারো মাথায় আত্মহত্যার চিন্তা আসে তখনই সেই মানুষ একটা ঘোরের মধ্যে চলে যায়। আশেপাশের সবকিছুই নেতিবাচক মনে হতে থাকে সবকিছুর জন্য নিজেকে দোষারোপ করা শুরু করে। এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার। অপরাধবোধ থেকে আত্মহত্যার সংখ্যা অনেক বেশি। তাই যেটা আপনি করেননি বা আপনার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ নেই সেটার জন্য নিজেকে দোষারোপ করা বন্ধ করুন। সবকিছু সবসময় ঠিকভাবে হবে না এটাই প্রকৃতির নিয়ম এবং এটা আগে থেকেই মস্তিষ্কে স্থির করা উচিত।

অনেকসময় অন্যের মন খারাপকে আমরা পাত্তা দেই না। ভাবি হয়ত এটি সামান্য ব্যাপার, সাধারণ মন খারাপ। কিন্তু এভাবে চিন্তা করা মোটেও ঠিক নয়। চরম হতাশায় থাকা ব্যক্তির প্রতি আমাদের দায়িত্ব আছে। অস্বাভাবিক চাপের মুখোমুখি হয়ে অনেকেই আত্মহত্যার কথা ভাবে কিন্তু সেই ভাবনাটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাময়িক ভাবনা। তবে এই ভাবনাটাই যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তখুনি রোগী তা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যায়।

অনেকসময় আমাদের একটু প্রচেষ্টাই একটি প্রাণকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে নতুন জীবন উপহার দিতে পারে। আমাদের উচিত কাছের মানুষদের খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করা, তাদের নেতিবাচক ভাবনাগুলো কতদূর বিস্তৃত তা বুঝার বা জানার চেষ্টা করা। আত্মহত্যাকারীরা যখন নতুন জীবনে ফিরে আসেন তখন তারা বুঝতে পারেন জীবন আসলেই কতটা সুন্দর।

সাধারণত অল্প বয়সীরাই আত্মহত্যা প্রবণতায় বেশি ভোগে। সুতরাং ভাবুন ভবিষ্যতে কী কী করা বাকি আছে আপনার, কী কী আপনি করতে চেয়েছিলেন এখনো করতে পারেননি। আত্মহত্যা করলে কখনোই আর সেগুলো করার সুযোগ পাবেন না। সুতরাং সেইদিকে মনোযোগ দিন। আজকাল আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক বেশিই বেড়ে গিয়েছে।

জীবনকে উপভোগের জন্য খ্যাতি-বিত্ত নয়, সস্তা বিনোদন কিংবা একঘেয়েমি জীবন নয়, বরং আনন্দের যে পথটা সেটা জানা দরকার, বুঝা দরকার। সেই পথ জানা থাকলে আপনাকে আর আত্মহত্যা করতে হবে না। জীবনে চলার পথে আত্মবিশ্বাস খুবই দরকার। আপনি চলে গেলে মানুষ ভুলে যাবে, পরিবারে শূন্যতা সৃষ্টি হবে। অথচ আপনি যদি সমাজের বাধা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন, নিজের মতো বাঁচতে পারেন তবে এই সমাজ, এই মানুষগুলোই মনে রাখবে আপনাকে।

লেখক: শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য

এ বিভাগের আরো সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ