করোনাভাইরাস থেকে পরিত্রাণ: অব্যবস্থাপনা-ব্যবস্থাপনা

করোনা ভাইরাস
মো. শফিকুর রহমান  © টিডিসি ফটো

আমি কোন বুদ্ধিজীবী কিংবা করোনাভাইরাস বিশেষজ্ঞ না। সরকারি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি। অতি সাধারণ একজন মানুষ। জুলাই মাসের শুরুর দিকে আমার পরিবারের চারজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কথা বলব। মূলত চিকিৎসা করাতে গিয়ে কোন কোন সমস্যায় পড়েছি এবং সে গুলোকে কিভাবে সমাধান করা যায় সে বিষয়ে কিছু কথা তুলে ধরব। 

আমরা প্রতিদিন পত্রিকার পাতা উল্টালেই কিংবা টেলিভিশন চালু করলেই করোনাভাইরাস নিয়ে এত আলোচনা শুনি কিন্তু দিন শেষে মনে হয় যেই লাউ সেই কদু। করোনাভাইরাস কি, এটা কি ক্ষতি করে সেটা আমাদের সবার জানা। কিংবা লকডাউন কি? এটা কিভাবে পালন করতে হবে একেক জনের একেক মত। আমার মনে হয় এত আলোচনা কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত কমিটি গঠন করার দরকার নেই।

মোটা দাগে কয়েকটি কথা—

প্রথমত: আক্রান্তের হার কোনভাবেই যেন না বাড়ে সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ আমাদের চিকিৎসা প্রদানের সক্ষমতা কম। আমাদের সদর হাসপাতালগুলোর কি অবস্থা সেটা সকলেরই জানা। সরকার এজন্য লকডাউনের ঘোষণা করতে পারে কিন্তু সেটা করতে হবে আক্রান্তের হারের ভিত্তিতে। অন্য দিকে লকডাউনে নিম্ন আয়ের মানুষের খুব কষ্ট হচ্ছে একবেলা খাবার যোগাতে। এছাড়া ১৭ কোটি মানুষ কে লকডাউনকালীন ভাতা প্রদান করা সরকারের সক্ষমতা আছে বলে মনে করি না। এজন্য আমাদের সকলের যার যার জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে।

দ্বিতীয়ত: সরকারকে কোভিড টেস্টের সক্ষমতা  বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য প্রত্যেকটি উপজেলায় কমপক্ষে পাঁচটি কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। দেশে করোনার প্রকোপ প্রায় দুই বছর হতে চলল । এটি আরও কত বছর সেটা সবারই অজানা। টেস্টিং কিট স্বল্পতার জন্য আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় কোম্পানি গুলোকে উৎসাহ প্রদানসহ প্রয়োজনীয় বরাদ্দ প্রাদন করতে হবে এ ক্ষেত্রে কোন ধরণের প্রশানিক জটিলতা রাখা যাবে না। প্রয়োজনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে অতি দ্রুত কাজ শুরু করতে হবে।     

কোভিড টেস্টের জন্য স্যাম্পল সংগ্রহ এবং রিপোর্ট গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। প্রত্যেক জেলায় কভিড টেস্টের জন্য ল্যাব গড়ে তুলতে হবে। যে জেলা গুলোতে কভিড টেস্টের জন্য ল্যাব সুবিধা নেই তার জন্য ল্যাব সুবিধা আছে এমন পার্শ্ববর্তী জেলার উপর নির্ভরশীল হতে হয় । এতে অনেক সময় রিপোর্ট আসতে   অনেক দেরি হয়। অনেক সময় প্রায় ১০ দিন লেগে যায়। যেমন আমার আব্বা-আম্মার স্যাম্পল দেওয়া হয়েছে ১৩ জুলাই শুধু আম্মার রিপোর্ট এসেছে ২৪ জুলাই। আম্মা ইন্তেকাল করেছেন ২৬ জুলাই। অর্থাৎ, ইন্তকালের একদিন আগে জানা যায় তিনি কোভিড পজেটিভ ছিলেন। স্যাম্পল সংগ্রহের দুই সপ্তাহ পার হলেও আব্বার রিপোর্ট আসেনি। রিপোর্ট আসতে যদি এত দেরি হয় তাহলে এই সময়কালে কিসের ভিত্তিতে রোগীর চিকিৎসা চলবে? এজন্য মহামারী চলাকালীন অন্য খাতের খরচ কমিয়ে হলেও প্রত্যেক জেলায় কোভিড টেস্টের জন্য ল্যাব গড়ে তুলতে হবে।  

তৃতীয়ত: কোভিড টেস্টের উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। টেস্ট যদি দেরিতে করানো হয় ততদিনে রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায় এবং অক্সিজেন লেভেল ৯০ এর নিচে নেমে যায় । তখন তাকে দ্রুত অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়। এই পর্যায়টা খুব কঠিন একটা সময় একজন রোগীর জন্য। জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে সকল রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব না আর আমাদের দেশে এলিট ক্লাসের লোকেরা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয় না এজন্য এগুলোর উন্নতি ও সাধন হয় না।

আমার জানা মতে যাদের মোটামুটি সক্ষমতা আছে তারা আক্রান্ত রোগীকে বাসায় চিকিৎসাদানের ব্যবস্থা করছে। যে সমস্ত রোগী ২৪ ঘণ্টা অক্সিজেন সাপোর্টে থাকে তাদের ৫ মিনিটের জন্য অক্সিজেন ছাড়া রাখা যায় না। দেশে অক্সিজেন এর ঘাটতি আছে এটা আমাদের সকলেরই জানা। আবার এক সিলিন্ডার অক্সিজেন এর দাম ১৩০০০-২০০০০ টাকা যা সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষ্মতার বাইরে। রিফিল খরচ প্রায় ৩০০ টাকা। এই অবস্থায় সরকার জরুরি ভিত্তিতে অক্সিজেন আমদানি করবে এবং অক্সিজেন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে বাধ্য করতে হবে।

কারণ মানুষের জীবন আগে। দেশের সব জেলায় অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিলের ব্যবস্থা নেই। যে সমস্ত জেলায় অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিলের ব্যবস্থা নেই সে সব জেলা গুলোকে পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহের উপর নির্ভর করতে হয়। অর্থাৎ একদিন যদি অক্সিজেন সিলিন্ডার বহনকারী গাড়ি না আসে ঐদিন আর ঐ জেলায় অক্সিজেন পাওয়া যায় না পরের দিন আসে। কিন্তু রোগীকে ১ মিনিটের জন্যও অক্সিজেন ছাড়া রাখা যাবে না। এজন্য মহামারী চলাকালীন প্রত্যেক জেলায় অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিলের ব্যবস্থা করতে হবে। দরকার হলে অন্য খাতের খরচ কমাতে হবে।

চতুর্থত: টিকা প্রদান। টিকা নিয়ে গোটা দুনিয়ায় রাজনীতি চলছে। এটাকে নামকরণ করা হয়েছে “ভ্যাকসিন ন্যাশনালিজম” বা ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ। এই রাজনীতি বেশ কয়েক বছর চলবে। এজন্য দেশীয় কোম্পানিকে টিকা উৎপাদনে উৎসাহ প্রদান করতে হবে। টিকা আমদানিতে প্রয়োজন হলে সরকারের নীতিতে পরিবর্তন করতে হবে। উদ্দেশ্য একটাই শতভাগ নাগরিককে টিকা প্রদান করতে হবে। টিকা গ্রহণ করতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল দীর্ঘ লাইন । প্রত্যেক উপজেলায় কমপক্ষে ৫টি  টিকার গ্রহণ কেন্দ্র চালু করতে হবে। এতে যারা অসুস্থ কিংবা বয়স্ক নাগরিক তাদের প্রচণ্ড রোদের মাঝে দাঁড়িয়ে থেকে টিকা গ্রহণ করতে হবে না।

পঞ্চমত: বিভাগীয়  শহর থেকে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত অক্সিজেন সিলিন্ডার, মাস্ক, স্যানিটাইজার ও কোভিড প্রতিরোধী প্রাথমিক ঔষধসমূহ বিনামূল্যে বিতরণের জন্য প্রয়োজনীয় কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।  প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ কে এটা বুঝাতে হবে যে মাস্ক ছাড়া কোনভাবেই বাহিরে যাওয়া যাবে না। নতুবা বড় ধরণের বিপদ আসতে পারে যা সামাল দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

ষষ্ঠত: অক্সিজেন সিলিন্ডার, মাস্ক, স্যানিটাইজার ও কোভিড প্রতিরোধী প্রাথমিক ঔষধসমূহ বিনামূল্যে বিতরণের জন্য প্রচুর টাকার এবং লোকবল দরকার। এটা সরকার একা করতে পারবে না। দেশ আমাদের তাই আমাদের কেই এগিয়ে আসতে হবে। তবে সংগঠিত করার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে দলাদলি করা যাবে না। সবাইকে নিয়ে কাজ করতে হবে। জনগণকে এটা বুঝাতে হবে যে প্রত্যেকটি নাগরিককে এই মহামারী থেকে পরিত্রাণের জন্য অবদান রাখতে হবে। আমার বিশ্বাস যে যার সাধ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসবে।

এজন্য একটা সফটওয়্যার তৈরি করতে হবে যেখানে নগদ এবং বিকাশ একাউন্টে প্রাপ্ত অর্থের নিয়মিত আপডেট থাকবে যে দৈনিক কতটাকা জমা হচ্ছে এবং খরচ হচ্ছে। এক কথায় স্বচ্ছতা থাকতে হবে । পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবী কর্মী তৈরি করতে হবে। সফটওয়্যার এ প্রত্যেক নাগরিক জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নিবন্ধন করবে কে কোন সেক্টরে কাজ করতে চায় এবং কোন কেন্দ্রে। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি শুধু দুই বেলা খাবার দিলে লাখ লাখ তরুণ দেশের বিপদের সময় এগিয়ে আসবে। আমার জানা মতে বর্তমানে জেলাগুলোতে দুই একটি রাজনৈতিক সংগঠনসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিনামূেল্য অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করছে। কিন্তু আক্রান্ত রোগীর তুলনায় তাদের সিলিন্ডারের সংখ্যা কম। এই সংগঠনগুলোর সিলিন্ডার বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সপ্তম: কোনভাবেই মাস্ক ছাড়া ঘরের বাইরে যাওয়া যাবে না। দেশের স্বল্প সংখ্যক আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে এদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। বিশেষ করে উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে এটা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয় না। এজন্য সেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর হাতে এই দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।

অষ্টম: জেলা পর্যায়ে করোনা প্রতিরোধে যে সকল কমিটি গঠন করা হয়েছে তাদেরকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে  টিকা কেন্দ্র, হাসপাতাল, অক্সিজেন সিলিন্ডারের দোকানসহ ঔষধদের দোকানসমূহে সশরীরে পরিদর্শন করতে হবে। কোন অব্যবস্থাপনা দেখা দিলে সাথে সাথে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বাঙ্গালীর অতীত ইতিহাস গৌরবের। গবেষণায় দেখা যায় দেশের সংকটকালে গোটা জাতি এক হয়ে যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধ তারই প্রমাণ। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছিলেন কারণ তিনি গোটা জাতিকে বোঝাতে পেরেছিলেন আমাদের ইতিহাস নির্যাতনের ইতিহাস। এই নির্যাতন থেকে বাঙ্গালী মুক্তি চায়। আশা করি, বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমগ্র জাতিকে এক কাতারে নিয়ে আসবেন এবং এটা বোঝাতে সক্ষম হবেন দেশ আপনাদের দায়িত্বও আপনাদের। সরকার একা করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করতে পারবে না।

সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এবং প্রত্যেক নাগরিককে তার জায়গা থেকে অবদান রাখতে হবে। আমরা পশ্চিম দুনিয়ার মত উন্নত কোন দেশ নয় আর সে সমস্ত দেশের সাথে আমাদের তুলনা করা বাতুলতা ছাড়া আর কিছুই না। আমাদের আর্থ-সামজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা বিবেচনা করে আমাদেরকে আমাদের মত করে সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, হায়াত-মউতের মালিক আল্লাহ তায়ালা। মানুষ শুধুই চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু চেষ্টায় কোন ত্রুটি রাখা যাবে না। সর্বোচ্চ চেষ্টার পর একজন রোগী মারা গেলেও মনকে সান্ত্বনা দেওয়া যায় যে, আমি আমার জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। প্রিয় মাতৃভূমি করোনা মুক্ত হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক। মহান আল্লাহর কাছে সকলের সকলের সুস্থতা ও সুখী জীবন কামনা করছি।   

লেখক: শিক্ষক, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়    
[email protected]


মন্তব্য

এ বিভাগের আরো সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ