গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক মেরেছে ঢাবি!

সজীব ওয়াফি
সজীব ওয়াফি  © ফাইল ছবি

একটি রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের আতুড়ঘর তার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। দেশে গণতন্ত্র আছে নাকি নেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চেহারার দিকে তাকালেই বলে দেয়া যায়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা শোচনীয়। এখানে না আছে শিক্ষা-গবেষণা, না আছে গণতন্ত্র!

এরকম অবস্থায়ও এলোমেলোভাবে শিক্ষার্থীরা নানান বিষয়ে অধিকার-দাবি দাওয়া নিয়ে কিছুটা আলোচনা-সমালোচনা করতে পেরেছে। সাম্প্রতিক সময়ে উপাচার্যের এক বক্তব্য কেন্দ্রীক মর্যাদা ক্ষুন্নের কারণ দেখিয়ে সমালোচনার সেই অধিকারটুকুও হরণ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃৃৃপক্ষ।

রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতন্ত্র চর্চার মূল কেন্দ্র হল ছাত্র সংসদ। ছাত্র সংসদে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্ররাই পরবর্তীতে দেশের নেতৃত্বে অংশ নিয়েছে। অথচ দীর্ঘবছর থেকে ছাত্র সংসদগুলো অকার্যকর। ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চর্চার পথ রুদ্ধ হয়েছে সেই নব্বইয়ের দশক থেকেই। সময়ের পরিক্রমায় সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরাও প্রতিবাদ করতে সামাজিক মাধ্যমে বেছে নিয়েছে।

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হচ্ছে আলোচনা-সমালোচনার দরজা চব্বিশঘণ্টা খোলা রাখা, গণমাধ্যমগুলোকে সংবাদ প্রকাশে হস্তক্ষেপ না করা। গণমাধ্যমগুলো পক্ষপাতহীন বাস্তনিষ্ঠ সংবাদ প্রচার করবে। প্রয়োজনে সংবাদ সম্পর্কিত কার্টুন আঁকবে। জায়গা থাকবে মত প্রকাশ করারও। সরকারপক্ষ সেই মতামত বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছবে। বুদ্ধিবৃত্তিক সেই জায়গাটা তৈরি করে দেয়া ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার প্রথম বিদ্যাপীঠ ধরা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ঐতিহ্যও দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় অনেক। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান র্যাংকিং-এ পিছিয়ে থাকলেও মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন অধিকার আদায়ের মিছিলে এক সময়ে প্রবল ভূমিকা ছিল। সমালোচনা করলে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ই ছাত্রদের, এমনকি সাধারণ নাগরিকদের আইনের ভয় দেখায়!

পড়ুন: স্বল্পমূল্যে ডাকসুর খাবার নিয়ে ভিসির বক্তব্যের ব্যাখা দিল প্রশাসন

উপাচার্য মহোদয় তার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যান্টিনে দশ টাকায়, অর্থাৎ সস্তায় চা চপ সমুচা পাওয়া নিয়ে গর্ব করেছেন। গিনেস বুকে রেকর্ড হওয়ার মত এমনটাও দাবি করেছেন হাস্যরস করতে গিয়ে। একজন উপাচার্যের মুখে এরকম অহেতুক গর্বের বিষয়ে হাস্যরস পদ্ধতিতেই প্রতিবাদ জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা। তারা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানের শিক্ষার রুচি এবং মননের।

শিক্ষা নিয়ে নূন্যতম চিন্তা নেই, বরং উপাচার্যের পরামর্শের রুচি গিয়ে ঠেকেছে খাই খাই পার্টিতে এটাও প্রকাশ করতে চেয়েছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকদের থেকে এরকম অহেতুক শিক্ষা থেকেই একসময়ে ছাত্ররাও প্রতিযোগিতায় নামে কার বিশ্ববিদ্যালয় কতবড়! জমি দিয়ে পরিমাপের বদলে যেখানে তাদের পরিমাপের মানদণ্ড হওয়ার কথা ছিল শিক্ষার গুনগত মান এবং গবেষণাপত্রে।

করোনা মহামারীকালীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর থাকে গুরু দায়িত্ব। অক্সফোর্ড যেটা সচারাচর করে থাকে। মৌখিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে যেহেতু প্রাশ্চ্যের অক্সফোর্ড দাবি করা হয় সেদিক থেকেই ইংরেজি একটি দৈনিকে কার্টুনসহ তুলনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। দেখাতে চেষ্টা করা হয়েছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা কতটুকু এবং কতটা দায়িত্বশীল।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য তাতে নাখোশ হয়েছেন। ফলাফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দিয়ে আইনের মারপ্যাঁচ শেখাচ্ছেন। এটা হয়তো আগামীতে মানহানি অথবা ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের পথে হাটার ইঙ্গিত। নামে বেনামে দেদারসে ব্যবহার হতে পারে আন্দোলন কর্মীদের উপর।

প্রত্যাশা বেশি বলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এবং নাগরিকেরা ব্যাঙ্গাত্মক প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপাচার্যের থেকে নাগরিকেরা অযাচিত কথাবার্তা অপ্রত্যাশিত মনে করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটা গর্বের।

উপাচার্যের যদি মান খোয়ায়, তবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হওয়ার পরবর্তী বর্তমান উপাচার্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কি এমন সম্মান কুড়িয়েছেন যে তার সম্মান যায়? বরং ‘চা চপ সমুচা’র এই সমালোচনা দ্বিতীয়বার সামনে তুলে এনে নিজেদের হীনতার পরিচয় দিচ্ছেন। গলাটিপে ধরছেন আমাদের সমস্ত গর্বের জায়গাটুকুর। কথাবার্তায় সংশোধন না হয়ে গণমাধ্যম গুলোকে দেখাচ্ছেন বৃদ্ধাঙ্গুলি। পুরো জাতির সামনে ভাসিয়ে তুলেছেন গণতান্ত্রিক বিকলাঙ্গ মূর্তি।

রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটানোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে জরুরিভাবে পরিহার করতে হবে ব্যক্তি কর্তাদের স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত। নতুবা একেই পথে হাটতে শুরু করবে অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও। চোরাগলিতে একবার প্রবেশ করলে বের হওয়ার রাস্তা হারিয়ে যাবে। মলিন হয়ে যাবে সমস্ত ঐতিহাসিকতা। গণতন্ত্রের কফিন শেষ পেরেক ঠুকে দেয়ার আগে যেন দ্বিতীয়বার ভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখক: রাজনৈতিক কর্মী ও বিশ্লেষক


মন্তব্য