দয়া করে অটো পাস দিবেন না

দয়া করে অটো পাস দিবেন না
অটো পাস নয়  © সংগৃহীত

১৫ মাস পার হয়ে গেছে। করোনার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে আছে। অনেক ছাত্র ঝরে গেছে অনেকে ঝরার পথে। আর কিছুদিন বন্ধ থাকলে সবাই ঝড়ে পরবে। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কবে খুলবেন কিংবা পরীক্ষাগুলো কিভাবে আয়োজন করবেন। ইংরেজিতে কথা আছে , the patient had died before doctor came. রোগী মারা যাবার পর ডাক্তার আসলে যেমন কোনো লাভ নেই তেমনি ছাত্র ঝরে যাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিলে কোন লাভ নেই।

এক ভদ্রলোক বৈশাখ মাসের এক বিকেলে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় কেনাকাটার জন্য বের হয়েছেন। হঠাৎ কালবৈশাখীর ঝড়ে রাস্তার একটি বৈদ্যুতিক পিলার একটি গাছের উপরে পড়ে। গাছটি লোকটির বুকের উপরে পড়ে। গাছের নিচে চাপা পড়ে লোকটি বের হতে পারছেনা। লোকটা চিৎকার করে বলছে, "আমাকে বাঁচান, বাঁচান।" পথচারীরা ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করছে। কিছুক্ষণ পর ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এসেছে। লোকটা চিৎকার করে বলেছে " আমাকে বাঁচান"। উদ্ধারকারী দল বলছে , " আপনি অপেক্ষা করুন। আমরা প্রটোকল মেইনটেইন করা ছাড়া কাজ করতে পারব না।" গাছটা বনবিভাগের , বৈদ্যুতিক পুল রাজউকের, রাস্তা টি সড়ক ও জনপথ বিভাগের। খবর পেয়ে বনবিভাগের উদ্ধারকারী দল এসেছে। লোকটি বলেছেন ,"আমাকে বাঁচান। " উদ্ধারকারী দল বলছে "আপনি ধৈর্য ধরুন। বৈদ্যুতিক পুলটি যেহেতু রাজউকের সুতরাং তাদের ছাড়া কাজ করা যাবেনা।"

রাজউক কে খবর দেওয়া হল। রাজউকের উদ্ধারকারী দল এসে বলছে, "রাস্তাটি সড়ক ও জনপথের। সুতরাং তাদের প্রয়োজন আছে।"

এদিকে সকল টিভি চ্যানেল লাইভ প্রচার করছে। স্বজনেরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় চিৎকার করছে। সোশ্যাল মিডিয়া উদ্ধারের জন্য ঝড় তুলছে। খবর পেয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের উদ্ধারকারী দল এসেছে। তারা বলেছেন," মন্ত্রীর অনুমতি ছাড়া হাত দেওয়া যাবে না।" যোগাযোগমন্ত্রীকে জানানো হলো। তিনি যখন আসলেন তখন রাত অনেক হয়ে গেছে। লোকটি মৃত্যুর দিকে চলে যাচ্ছে। চারপাশে লোকজন উদ্ধারের জন্য মানববন্ধন করছে। মন্ত্রী স্বজনদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন ,"আপনারা ধৈর্য ধরুন আমরা দেখছি কি করা যায়। এটা আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। আমাদের সব ধরনের বিকল্প মাথায় রেখে এগোতে হবে। এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন," কবে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করবেন ?" মন্ত্রী বললেন ,"আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে। "ইতোমধ্যে লোকটি মারা গেল।

শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থা একই রকম । এত লম্বা সময় পার করেও আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি কিভাবে পথ চলব। অথচ ক্রমেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। তখন যে বিপদ আরও বাড়তে পারে সে চিন্তা কারো মাথায় নেই।

মূল কথায় ফিরে আসি। আমাদের শিক্ষার কান্ডারী মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী সর্বশেষে ব্রিফিং করেছেন। তাতে আমরা ধরে নিতে পারি যে আগামী এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা অটো পাসের দিকে যাচ্ছে। যদিও তিনি বহুবার বলেছিলেন "আর কিছুতেই অটো পাস দেয়া হবে না।"  মাননীয় মন্ত্রী আপনাকে বিনীতভাবে করজোড়ে অনুরোধ করছি নামকাওয়াস্তে হলেও একটা পরীক্ষার ব্যবস্থা করবেন, অটো পাস দিবেন না। কারন আমার একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হয়েছে। গত বছর এক সন্তান এইচএসসি অটো পাস করেছে। ডাবল গোল্ডেন এসএসসিতে বোর্ড বৃত্তি পেয়েও সে বুয়েটে দরখাস্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর চেয়ে অপমান আর হয়না। অটো পাস খারাপ শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো হলেও ভালো শিক্ষার্থীদের জন্য খারাপ হয়েছে। ভুক্তভোগীরাই সেটা বুঝতে পারছে।

আরও দেখুন: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার রোডম্যাপ চাই

১৯৪৭সালে দেশ বিভাগের সময় যারা ডিগ্রী পরীক্ষার জন্য কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফরম পূরণ করে ছিল তাদেরকে অটো পাস দেয়া হয়েছিল। তাদেরকে পার্টিশন গ্রাজুয়েট বলা হতো। তারা বিব্রত বোধ করতেন। পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর সরকার শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিল। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি ডক্টর এস এম শরীফ এ কমিশনের প্রধান ছিলেন। এজন্য এ কমিশনকে শরীফ কমিশন বলা হত । ১৯৫৯ সালে কমিশন স্নাতক পাস কোর্স দুই বছরের পরিবর্তে তিন বছর করেছিল । উত্তাল ছাত্র আন্দোলনের ফলে তা আবার আগের মত দুই বছর করা হয়। যারা তৃতীয় বর্ষ উঠেছিল

তাদেরকে অটো স্নাতক ডিগ্রী দিয়ে দেয়া হয়। তাদেরকে শরিফ গ্রাজুয়েট বলা হতো। কয়েকদিন আগে আমরা দেখলাম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের শর্তসাপেক্ষে দ্বিতীয় বর্ষে অটোপ্রমোশন দিয়েছে।

আমাদের শিক্ষা মন্ত্রী একজন চিকিৎসক। চিকিৎসকের দায়িত্ব হলো রোগীকে সাহস দেয়া, দিকনির্দেশনা দেয়া। তিনি আমাদের সবাইকে সাহস দেবেন, সিদ্ধান্ত দেবেন। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে তিনি নিজেই ভয় পাচ্ছেন এবং সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন । 

তাই সর্বশেষ বলতে চাই গাছের নিচে চাপা পড়া হতভাগা ব্যক্তির মতো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে দ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে শিক্ষাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচান।

লেখক:

সহকারী অধ্যাপক, কাদিরদী ডিগ্রি কলেজ।


মন্তব্য