০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:২২

ডাকসু কি দিল? এখন তো খাই খাই

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ইতিহাস ঐতিহ্যের নিরব সাক্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দীর্ঘ অাঠাশ বছর ঢাবির ডাকসু ছিল নির্বাচনহীন তথা পতিত। সেই অচল ডাকসু সচল হয়ে শুরু হলো তুলকালাম কান্ড। এ বছরের মার্চে বিতর্কিত নির্বাচনে যে ডাকসু পেলাম সেই ডাকসুর কার্যক্রমের সঙ্গে আগের ডাকসুর কোনো কিছুরই মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। বলা হয় বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের পর ডাকসুর অবস্থান।এটি অতি শক্তিশালী ও গৌরবের। গণতন্ত্র চর্চার তীর্থস্থান বলা হয় ঢাবিকে। সেই তীর্থস্থানের প্রাণ ভোমরা হলো ডাকসু। ডাকসুর সদস্য না হয়েও যখন কেউ ডাকসু কোটায় সিনেট সদস্য হয়। তখন সেই গৌরবোজ্জ্বল ডাকসুর অতীত টেনে আনা বড্ড বেমানান ও ছোটলোকি। ঢাবির ছাত্র ছাত্রীদের ভোটে নির্বাচিত টপ লেভেলের ডাকসুর পাঁচজন নির্বাচিত সদস্য সিনেট সদস্য হয়ে প্রতিনিধিত্ব করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ডাকসু কি জোড়াতালি দিয়ে তৈরি গঠনতন্ত্র মেনে চলে তা বোঝা মুশকিল। এখন তো মাইট ইজ রাইট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্বের জায়গা ছিল বহু আগে।

আজ সবকিছু লয় হতে চলেছে। আগের দিনে সবচেয়ে মেধাবী, নেতৃত্বের গুনাবলীসম্পন্ন ছেলেটি ডাকসু ও হল সংসদের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা নির্বাচিত হতো। আজ যুগ পালটে গেছে। যেনতেন কলা গাছ দাঁড়িয়ে গেলেও ঢাবির শিক্ষার্থীরা তাকে নেতা নির্বাচিত করে। কেননা তাদের কাছে এখন নেতার রেজাল্ট, নেতৃত্বের কোয়ালিটির চেয়ে দলীয় পরিচয় মুখ্য। হোক না বধির, বোবা সেতো দলীয় ও বড় ভাইয়ের আশির্বাদপুষ্ট। সেটাই যথেষ্ট। কোয়ালিটি কোয়ানটিটি ম্যাটার না। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে।

পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, এজিএস টানা সাত বছর ধরে আইন বিভাগে পড়ছেন। অনুত্তীর্ণ তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায়। রেজাল্ট শিটে নাম নেই, তারপরও পড়ছেন চতুর্থ বর্ষে। চতুর্থ বর্ষের প্রথম পর্বের পরীক্ষাও দিয়েছেন। নেতাদের উচিত ছিল আগে পড়াশোনা ছাত্রত্ব পরে রাজনীতি।আগের দিনে তাই ছিল। এখন যুগ বদলেছে। এখন রেওয়াজ হয়ে গেছে আগে নেতা পরে ছাত্রত্ব।নেতা মেধাবী কিনা? এসব আজকাল গৌণ। কতটুকু ফাঁপর দিতে পারে জি ভাই বলে মুখে ফেনা তুলতে পারে সেই হতে পারে নেতা। ছাত্রত্ব থাক বা না থাক। অপশনাল বিষয়। দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছেলেটি ভর্তি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই মেধাবী সন্তানটিও কখনো কখনো চোরাবালির ফাঁদে আটকে পড়ে।হারিয়ে ফেলে চিরচেনা মসৃণ পথ।

ঢাবির শিক্ষার্থীরা হচ্ছেন সবচেয়ে আলোকিত সন্তান। তারা জাতির দুর্দিনে হন প্রভাতের রবি। সেই আলোকিত সন্তানেরা আজ আধারের বুকে হারিয়ে যাচ্ছে, সামান্য স্বার্থের কারণে। বিবেকবোধ বিসর্জন দিয়ে ভাই ভাই নাম উচ্চারণ করে, মুখে ফেনা তুলে তারা পদলেহন তোষামোদে ব্যস্ত। জাতি রাষ্ট্র রসাতলে গেলেও তাদের এ নিয়ে সামান্য দুশ্চিন্তা নেই। চাচা আপন প্রাণ বাঁচানোর রীতিমতো প্রাকটিস তারা আয়ত্ত করে ফেলছে। ডাকসুর ভিপি মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিভাবক। তার ওপর হাত তোলা, বাজে ইশারা করা অর্থ ঢাবির ৪৩ হাজার শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত তোলা, বাজে ইশারা করা। অথচ বড়ই তাজ্জবের বিষয় হলো ভিপি যেন বাংলাদেশর নির্যাতিত গণমানুষের প্রতীক। ইচ্ছে করলেই তাঁকে পেটানো যায়, তার সমাবেশ, অনুষ্ঠান ভন্ডুল করা যায়। যার প্রমাণ আমরা পেয়েছি ব্রাক্ষণবাড়িয়া, বগুড়ায় ইফতারের অনুষ্ঠানে, ঢাবির এসএম হলে এবং সর্বশেষ গত ঈদে বরগুনায় নিজ জেলায় প্রহৃত হবার ঘটনা। ছেলে ধরার মতোই তাকে পিটুনি দেওয়া হয়েছে। পার্থক্য হলো ছেলেধরার গণপিটুনি হজম করতে না পেরে অগস্ত্য যাত্রা করেছে কিন্তু ভিপি নুর সব হজম করে বীরত্বের সঙ্গে টিকে আছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় যে উত্তম মধ্যমের শিকার হয়েছিলেন সেই ধারাবাহিকতা এখনো বহাল আছে। পাকিস্তান আমলে ও স্বাধীন বাংলাদেশে এর আগে ডাকসুর কোনো ভিপি এতোটা নাজেহাল হয়েছে বলে আমার জানা নাই। ভিপির গায়ে হাত তোলার সাহস হচ্ছে শুধু ঢাবির মেরুদন্ডহীন কিছু শিক্ষার্থীদের নির্লিপ্ততা ও নিরবতার কারণে। যারা ভুলে গেছে নুর তাদের নির্বাচিত ভিপি ও অভিভাবক।

এদিকে ডাকসুর অর্থ ভান্ডার নিয়ে শুরু হয়েছে কামড়াকামড়ি। জিএস সাহেব ডাকসুর বরাদ্দ বাড়ানো নিয়ে তৎপর। কত বাড়াতে হবে তাও তিনি বলে দিয়েছেন।বর্তমান ডাকসুর জন্য বাজেট ঢাবির বাজেটের ২৫ শতাংশ তিনি চান ১শতাংশ। দয়ালু জিএস বিগত আটাশ বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ডাকসু ও হল সংসদের জন্য প্রতিবছর যে অর্থ দিয়েছে তার হিসাব তিনি চান না। অথচ এবারের ডাকসুর প্রথম বাজেট অধিবেশনে সকল সদস্য বিগত আটাশ বছরে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ডাকসুর আদায়কৃত অর্থের হিসেব দাবি করেছিল। যে অর্থের পরিমাণ হতে পারে ১২ কোটি টাকা। জিএস কত বড় উদার!

এখানেই ডাল মে কুচ কালা হ্যায়। ঢাবির প্রশাসনকে বিগত ২৮ বছরের অর্থেরও হিসেব দিতে হবে। এটাই স্বাভাবিক। যে ডাকসু এতদিন অকার্যকর সেই ডাকসুর নামে অর্থ নিয়ে তারা কি করেছেন তার হিসাব তো নিতে হবে। ঢাবির সমাজ সেবা সম্পাদক ডাকসুর বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করতে গেলে ভন্ডুল করে দেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন ডাকসুর কাজ কি? অর্থ নিয়ে কামড়াকামড়ি? না সাধারণ শিক্ষার্থীদের কল্যাণ?

একবুক আশা নিয়ে আটাশ বছর পরে যারা আশায় বুক বেঁধেছিল তারা আজ হতাশ। হয়তো তারা আজ আফসোস করছে ডাকসু থাকার চেয়ে না থাকায় ভালো ছিল। অনেকের কাছে সান্ত্বনা সামথিং ইজ বেটার দেন নাথিং।

আজ অর্থ কামাইয়ের ধান্দায় হলের নেত্রীরাও পিছিয়ে নেই। রোকেয়া হলের সাধারণ শিক্ষার্থীরা সাংবাদিক সন্মেলন করে অভিযোগ করেছে হল সংসদের ভিপি ইসরাত জাহান তন্বী হলের কর্মচারী কামাল উদ্দিনের ছেলে কামরুজ্জামানকে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য আট লক্ষ টাকা, জিএস সায়মা আক্তার প্রমি হলের মালী বাবুল চৌহানের ছেলে পলাশ চৌহানকে বাগান মালী পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য পাঁচ লক্ষ টাকা, রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি এবং ডাকসুর কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক বিএম লিপি আখতার এবং সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণী দিশা মিলে আলমগীর নামের একজনকে প্রহরী পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য আট লক্ষ টাকার লেনদেন করেছে। সাংঘাতিক অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে। এর প্রমাণ কি তারা দিতে পারবে? হুম যথেষ্ট প্রমাণ নাকি অভিযোগকারীদের হাতে রয়েছে। ফোনালাপের রেকর্ডিং, ক্লিপ তাদের যুতসই এভিডেন্স।

এতদিন ডাকসু ছিল না সুতরাং ডাকসুর পদে, হল সংসদের কোনো পদে থেকে চাঁদাবাজির সুযোগ ছিল না। ২৮ বছর পর ডাকসু কি নেতৃত্ব উপহার দিল? এটাই কি আমাদের চাওয়া পাওয়া ছিল? আজ হলের মেস, ক্যানটিন, ডাইনিংয়ের খাবারের মান কি উন্নত হয়েছে? না এখনো হল মেসের ডালের পটে অবলীলায় চুলের সিঁথি কাটা যায়! মেসে আগত আগন্তুক ডালকে অপরিষ্কার পানি মনে করে এখনো কি প্লেট ধোঁয়া পানি ফেলে? জানি না। আমার হল জীবনের প্রথম অবস্থায় বেশ কয়েকবার এমনটি হয়েছিল।

২৮ বছর পরের ডাকসু কি উপহার দিল? একজন বারংবার মার খাওয়া ভিপি কথিত ছাত্রবন্ধু, একজন অর্থ বরাদ্দ পাবার আশায় উন্মুখ জিএস, সাত বছর ধরে একটি বিভাগে অনুত্তীর্ণ, সাত বছরে পাঁচবার ফাইনাল পরীক্ষায় ফেল করা এজিএস, প্রশাসনের নির্লিপ্ততা ও অসহযোগিতার কারণে ছাত্রকল্যাণ করতে না পারা একজন আখতার, দীর্ঘদিন সিনেটে অনুপস্থিত ডাকসুর প্রতিনিধির সাথে অনির্বাচিত সিনেট সদস্য। এক বছর মেয়াদের ডাকসু কয়েক মাসে চমক দেখাতে না পারলেও থমকে যায়নি। নখদন্তহীন কাগজের বাঘের হুংকার ছেড়েছে ঠিকই। সাধারণ শিক্ষার্থীরা কিছু পায়নি। এখনো তাদের গণরুমে যাপিত জীবন। পানির মতো স্বচছ ডালে দু’বেলা আহার চলছে। সঙ্গে চলছে বেঁচে থাকার তীব্র লড়াই। এখনো ডাকসু নিয়ে পুরোপুরি মন্তব্য করার সময় আসেনি। তবে উঠন্ত মুলো পত্তনে চেনা যায়।