২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:২৪

‘ডিপ স্টেট’ ও প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা

প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম  © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলাদেশে ‘ডিপ স্টেট’ (Deep State) বা ‘ছায়া রাষ্ট্র’ ধারণাটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেবল একটি তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় হয়ে থাকেনি, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার এক প্রধান নির্দেশক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই ধারণাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন, তার নজিরবিহীন জনপ্রিয়তা এবং তার জীবনের ওপর সম্ভাব্য ঝুঁকির যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা মূলত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সক্রিয় অনির্বাচিত শক্তির প্রভাবেরই প্রতিফলন।

‘ডিপ স্টেট’ শব্দটি আধুনিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বহুল ব্যবহৃত হলেও এর মূল ভিত্তি বেশ প্রাচীন এবং গভীর। সাধারণ অর্থে ডিপ স্টেট বলতে রাষ্ট্রের এমন একটি সমান্তরাল ক্ষমতা কাঠামোকে বোঝায়, যা নির্বাচিত সরকারের বাইরে থেকে নীতিনির্ধারণ এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় প্রভাব বিস্তার করে। এটি কোনো একক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং উচ্চপদস্থ আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা, কখনও কখনও বিচার বিভাগ এবং করপোরেট স্বার্থগোষ্ঠীর একটি জটিল নেটওয়ার্ক। এই ধারণার আদি উৎস তুরস্কে, যেখানে একে ‘দেরিন দেভলেত’ (derin devlet) বলা হতো। তুরস্কের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিজেদের রাষ্ট্রের আসল অভিভাবক মনে করত এবং নির্বাচিত নেতৃত্বের আদর্শিক বিচ্যুতি ঘটলে তারা পর্দার আড়াল থেকে হস্তক্ষেপ করত। আধুনিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ স্টেট’ বা প্রশাসনিক রাষ্ট্রের অতি-বিস্তারকে অনেক সময় ডিপ স্টেট হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, যেখানে দীর্ঘস্থায়ী আমলাগণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থেকে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেন। 

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ডিপ স্টেট মূলত একটি ‘আর্বিটার’ বা সালিশিকারি শক্তি হিসেবে কাজ করে। যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল, সেখানে সামরিক ও প্রশাসনিক এলিটরা নিজেদের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করে। এই দেশগুলোতে ডিপ স্টেট কেবল প্রশাসনিক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি জাতীয় পরিচয় এবং শত্রু নির্ধারণের ক্ষেত্রেও প্রধান ভূমিকা পালন করে। উদাহরণস্বরূপ, পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘকাল ধরে নির্বাচিত সরকারের সমান্তরালে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে আসছে। বাংলাদেশেও ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে এবং বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠেছে যা রাজনৈতিক পরিবর্তনের গতিরোধক হিসেবে কাজ করতে সক্ষম।

বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর শিকড় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক এবং পাকিস্তানি আমলাতান্ত্রিক ধারায় প্রোথিত। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে সামরিক শাসন এবং দীর্ঘকালীন একনায়কতান্ত্রিক শাসনের ফলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের কাছে জবাবদিহি করার চেয়ে ক্ষমতার উচ্চশিখরে থাকা ব্যক্তিদের প্রতি অনুগত থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তিত হলেও সচিবালয় এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা দীর্ঘ সময় ধরে তাদের পদে বহাল থাকেন। তারা সরকারি তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন এবং নীতিনির্ধারণের খসড়া এমনভাবে তৈরি করেন যাতে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে। একে অনেক সময় ‘স্থায়ী সরকার’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের পরও প্রশাসনিক অভিমুখ অনেক ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত থাকে কারণ এই স্থায়ী কাঠামোর সদস্যরা নীতিনির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে।

রাষ্ট্রীয় তথ্য, নিরাপত্তা রিপোর্ট এবং অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ডিপ স্টেট একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সময় দেখা গেছে যে, নির্দিষ্ট কিছু গোয়েন্দা সংস্থা রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর বিভাজন তৈরি করা বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদের অপরিহার্যতা প্রমাণ করতে চায়। বিশেষ করে ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনামলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক ব্যবহার ডিপ স্টেট ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে। ‘আয়নঘর’-এর মতো গোপন কারাগারগুলোর অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রের ভেতরে একটি অন্ধকার জগত ছিল যা দৃশ্যমান আইনের ঊর্ধ্বে কাজ করত। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও ডিপ স্টেটের একটি সূক্ষ্ম ভূমিকা পরিলক্ষিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, গণ-আন্দোলনের মুখে যখন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক এলিটরা নিজেদের পিঠ বাঁচাতে এবং নতুন ব্যবস্থার সাথে মানিয়ে নিতে একটি ‘ব্রোকারেজ’ বা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। এই পরিবর্তনটি অনেক সময় নিছক ক্ষমতার রদবদল নয়, বরং ডিপ স্টেটের টিকে থাকার একটি কৌশলও হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ২০২৫ সালের শেষে ২৫ ডিসেম্বর তার প্রত্যাবর্তন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপির বিশাল বিজয় তার নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তারেক রহমানের জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ হলো তার তৃণমূলমুখী রাজনীতি। তিনি তার পিতা শহীদ জিয়াউর রহমানের মতোই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন। শহীদ জিয়া যেমন ‘গ্রাম সরকার’ পদ্ধতির মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদে উন্নয়নকে বিকেন্দ্রীকরণ করেছিলেন, তারেক রহমানও একইভাবে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বের একটি অভিনব দিক হলো তরুণ প্রজন্মের সাথে তার সম্পৃক্ততা। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে জেনারেশন-জেড-এর যে ভূমিকা ছিল, তাকে ধারণ করে তিনি ‘বাংলাদেশ ২.০’(Bangladesh 2.0)-এর রূপরেখা প্রদান করেছেন। এই ভিশনের মূল লক্ষ্য হলো—মেধাভিত্তিক সমাজ গঠন- যেখানে কোটা বা দলীয় আনুগত্যের বদলে মেধা হবে নিয়োগ ও পদোন্নতির একমাত্র মাপকাঠি। দুর্নীতি রোধে এবং সরকারি সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন।

জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ক্রিকেট এবং ভাষাকে রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টোর অংশ করা। ‘আয়নঘর’-এর মতো গোপন কারাগার বন্ধ করে সেগুলোকে যাদুঘরে রূপান্তরের মাধ্যমে মানবাধিকারের এক নতুন অধ্যায় শুরু করা। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি ২১২টি আসনে জয়লাভ করে এক বিশাল ম্যান্ডেট লাভ করে। এই ফলাফল কেবল একটি দলের জয় নয়, বরং এটি শেখ হাসিনার ১৫ বছরের অপশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এক বিশাল রায়। নির্বাচনে ৫৯.৪৪% ভোটার উপস্থিতি (দৈনিক যুগান্তর ১৪/২/২০২৬) প্রমাণ করে যে, জনগণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসতে কতটা আগ্রহী ছিল।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এবং তার পরিকল্পিত সংস্কার কর্মসূচি অনেক কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যারা গত দেড় দশক ধরে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন এবং ডিপ স্টেটের ছায়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে, তারা এই পরিবর্তনকে সহজে মেনে নিচ্ছে না। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি অংশ দীর্ঘ সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি অনুগত ছিল। যদিও ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর প্রশাসনের উপরিভাগে রদবদল হয়েছে, কিন্তু মধ্য ও তৃণমূল পর্যায়ে এখনো এমন অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন যারা পুরনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগী। এই ‘শত্রু ভেতর থেকে’ (Enemies within) তারেক রহমানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন থানা ও দপ্তর থেকে ৩,৬১৯টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ লুট হয়েছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত ১,৩৬০টি অস্ত্র এবং কয়েক হাজার রাউন্ড গুলি এখনো উদ্ধার করা যায়নি। এই অস্ত্রগুলো বর্তমানে বিভিন্ন অপরাধমূলক গোষ্ঠীর হাতে রয়েছে, যা তারেক রহমানের জনসভা বা চলাচলের পথে চোরাগোপ্তা হামলার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের মেরুকরণ এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ইতিহাস রয়েছে। আওয়ামী লীগের একটি অংশ বর্তমানে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রিত এবং তারা বিভিন্নভাবে বর্তমান সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। এছাড়া ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির সুসম্পর্কের দৃষ্টান্ত টেনে শত্রুপক্ষ একটি অস্থির পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যার সুযোগ ডিপ স্টেট নিতে পারে।

বিশ্ব ইতিহাস এবং বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, জনপ্রিয় নেতাদের ওপর আঘাত আনা এবং তাদের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া ডিপ স্টেট বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর একটি পুরনো কৌশল। বাংলাদেশে জনপ্রিয় নেতাদের হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ হলো ১৯৮১ সালের ৩০ মে শহীদ জিয়াউর রহমানের শাহাদাত। এই ঘটনাই রাষ্ট্রের ভেতরে থাকা কিছু উচ্চাভিলাষী সামরিক কর্মকর্তা এবং নেপথ্য শক্তির মদদে ঘটেছিল, যা ডিপ স্টেট তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে দেখা হয়। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা, কারণ তিনি প্রচলিত ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের কথা বলছেন। Abraham Lincoln, John F. Kennedy, Benazir Bhutto এবং Anwar Sadat—এই চার নেতার হত্যাকাণ্ড নিজ নিজ রাষ্ট্রে গভীর রাজনৈতিক অভিঘাত সৃষ্টি করে। আব্রাহাম লিংকনের হত্যাকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথা বিলোপ ও গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের সংবেদনশীল মুহূর্তে জাতীয় ঐক্যে ফাটল ও পুনর্গঠন নীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করে; জন এফ কেনেডির মৃত্যু শীতল যুদ্ধের উত্তেজনা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকাকে ঘিরে বিস্তৃত ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম দেয়, যা মার্কিন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে; বেনজির ভুট্টোর হত্যাকাণ্ড পাকিস্তানে সামরিক শাসনোত্তর গণতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়াকে বিপর্যস্ত করে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থবিরতা ও অস্থিরতা ডেকে আনে; আর আনোয়ার সাদাতের হত্যাকাণ্ড আঞ্চলিক শান্তি চুক্তি-উদ্যোগের প্রেক্ষাপটে মিশরে তীব্র অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ সৃষ্টি করে এবং পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ সামরিক প্রভাববলয়ের পথ সুগম করে।

ইতিহাসের এসব দৃষ্টান্ত সামনে রেখে বলা যায়, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান প্রশাসনের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা প্রদান করা হচ্ছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সোয়াট (SWAT) টিম এবং বিশেষায়িত গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার চলাচলের পথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই তাকে বিশেষ বুলেটপ্রুফ বাসে যাতায়াত করতে দেখা গেছে, যা চোরাগোপ্তা হামলা থেকে সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পাশাপাশি বিএনপির নিজস্ব ‘চেয়ারপারসন সিকিউরিটি ফোর্স’ (CSF) এবং অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল তার সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে। নির্বাচন পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতার রেশ রয়ে গেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১৬ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বিএনপির নেতা-কর্মী। এই হত্যাকাণ্ডগুলো অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পিত এবং তারেক রহমানের সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার জন্য ঘটানো হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। সরকার এই অপরাধীদের দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছে।

আসলে বাংলাদেশ আজ এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে ‘ডিপ স্টেট’-এর কালো প্রচ্ছায়া নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যখন কোনো শক্তিধর রাষ্ট্র সামরিক ও বাণিজ্যিক যুক্তির আড়ালে কৌশলগত নির্দেশনা প্রদান করে, তখন তার প্রভাব কেবল কূটনৈতিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলে। একদিকে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর নেপথ্য হিসাব—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও এর ভেতরে বহুস্তরীয় জটিলতা কাজ করছে। বিশ্বব্যবস্থার অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ কাঠামো অনেক সময় নির্বাচিত সরকারের নীতিগত স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে, ফলে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রশ্নটিও কেবল একটি ব্যক্তি-নির্ভর বিষয় নয়, বরং এটি বৃহত্তর রাষ্ট্র-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। তাকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থায়, বুলেটপ্রুফ গাড়িবহরে—মাত্র চারটি গাড়ি নিয়ে—চলাচল করতে দেখা গেলেও উদ্বেগ কাটছে না। নিরাপত্তা বলয়ের দৃশ্যমান শক্তির বাইরে অদৃশ্য অনুসরণ ও নজরদারির আশঙ্কা জনমনে এক অস্বস্তির আবহ তৈরি করেছে। দেশীয় কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক শক্তির সম্ভাব্য প্রভাব—উভয়ই তাকে ঘিরে একটি অঘোষিত চাপের বলয় সৃষ্টি করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

ডিপ স্টেটের নেতিবাচক প্রভাব থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত করার এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মতো নেতৃত্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদী উপায় হলো প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে কোনো ব্যক্তি বা দলের অনুগত না রেখে সংসদের কাছে জবাবদিহি করার আইন প্রণয়ন করা জরুরি। তারেক রহমান ইতিমধ্যে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা ডিপ স্টেটের ক্ষমতার উৎসকে সংকুচিত করবে। জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। যখন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলো স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণের সামনে আসে, তখন পর্দার আড়ালে ষড়যন্ত্র করার সুযোগ কমে যায়। তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ‘মিডিয়া কমিশন’ এবং জেনারেশন-জেড-এর সক্রিয় অংশগ্রহণ এক্ষেত্রে একটি প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করতে পারে। 

বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, বরং এটি আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির সাথেও যুক্ত। ভারত ও পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর ডিপ স্টেট বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ভারতের আইডিসিএ (IDSA) রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি অংশ দীর্ঘকাল ধরে ভারত-বিরোধী মনোভাব পোষণ করেছে, যা ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি এই উদ্বেগকে কীভাবে মোকাবিলা করে, তা দেখার বিষয়। তারেক রহমান চীনকে ‘উন্নয়ন বন্ধু’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, যা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনে প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক এই প্রতিযোগিতার মাঝে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে ‘ডিপ স্টেট’ ধারণাটি একদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতার বিশ্লেষণ, অন্যদিকে ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ। এটি কোনো কাল্পনিক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়, বরং রাষ্ট্রের ভেতরে থাকা প্রভাবশালী অনির্বাচিত গোষ্ঠীর এক বাস্তব উপস্থিতি যা গণতান্ত্রিক বিবর্তনকে বাধাগ্রস্ত করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বর্তমান জনপ্রিয়তা এবং তার পরিকল্পিত সংস্কার কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য এক নতুন আশা জাগিয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষ এবং বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম তার ওপর আস্থা রেখেছে যে তিনি মেধাভিত্তিক, ডিজিটাল এবং বৈষম্যহীন একটি ‘বাংলাদেশ ২.০’ উপহার দেবেন। তবে এই আশার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো ডিপ স্টেটের অন্ধকার হাত এবং তার জীবনের ওপর সম্ভাব্য ঝুঁকির আশঙ্কা। তারেক রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল একটি দলের নেতার নিরাপত্তা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের টিকে থাকার শর্ত। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করা এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমেই এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব। অদৃশ্য শক্তির আশঙ্কা কমাতে দৃশ্যমান ন্যায়সংগত প্রক্রিয়াই সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক। 

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি নিরাপদ, স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্র ও জনগণের অনুভূতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে—বিশ্ব রাজনীতির বৃহত্তর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো অনেক সময় জাতীয় নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে। এই বাস্তবতায় তার নেতৃত্বের সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে অভ্যন্তরীণ ডিপ স্টেট কাঠামোর সংস্কার, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শক্তির কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা। ডিপ স্টেটের অন্ধকার প্রভাব থেকে মুক্ত হতে হলে কেবল নিরাপত্তা বলয় বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনের শাসনের দৃঢ় প্রয়োগ। নির্বাচিত সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা তখনই সুসংহত হবে, যখন রাষ্ট্রের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য—উভয় শক্তিই গণতান্ত্রিক কাঠামোর অধীনে থাকবে। একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে তখনই, যখন ক্ষমতার প্রতিটি স্তর জনগণের ইচ্ছার কাছে জবাবদিহিমূলক হয়ে উঠবে এবং কোনো অদৃশ্য শক্তি রাষ্ট্রের গতিপথ নির্ধারণের ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে না। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বাংলাদেশ যে নতুন পথ চলা শুরু করেছে, তার সফলতা নির্ভর করবে নির্বাচিত নেতৃত্বের সাহস এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের ওপর। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিরাপত্তা রক্ষায় রাষ্ট্র এবং জনগণ—উভয়কেই সজাগ থাকতে হবে যাতে কোনো অন্ধকার শক্তি বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে আবার থামিয়ে দিতে না পারে। 

লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়