শিক্ষা সংস্কার: বিএনপি সরকারের নিকট জনগণের প্রত্যাশা
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পটভূমিকা: সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার ও বৈষম্য নিরসনের দাবিতে বাংলাদেশে ২০১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলন শুরু করে। জুলাই ২০২৪ অব্দি ঐ আন্দোলন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রূপ নেয় এবং পরিণতিতে ৫ আগষ্ট ২০২৪ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। প্রথমে কোটাকেন্দ্রীক, এরপর এই আন্দোলন হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন হিসেবে, যা শেষে রূপ নেয় শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে, এতে যোগ দিয়েছে দেশের আপামর জনসাধারণ। মাসজুড়ে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। এই আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারি দলের গুলিতে শিক্ষার্থী ছাড়াও শ্রমিক, সাধারণ মানুষ, নারী এমনকি শিশু পর্যন্ত নিহত হয়েছে। মৃতের সংখ্যা সরকারিভাবে প্রায় দেঢ় হাজার এবং বেসরকারিভাবে দুই হাজারের উপর বলে দাবী করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের মনোভাব ছিল দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শেষ হবে না জুলাই। সে কারণে আগস্ট শুরু হলেও, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আগস্ট মাসের দিনগুলোকেও জুলাই হিসেবে গণনা করছিলেন আন্দোলনকারীরা। তাই ৫ আগস্ট, হাসিনা সরকারের পতনের দিনটিকে ৩৬ জুলাই (জুলাই মাসের ৩১ দিন ও আগস্ট মাসে ৫ দিন এই মোট ৩৬ দিন) উল্লেখ করেছে আন্দোলনকারীরা। জুলাই মাসকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ৫ আগস্টকে ৩৬ জুলাই বলা হয়েছে। এভাবেই ৩৬ জুলাই হয়ে রইল বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি ইউনিক দিন। ৫ আগষ্ট ২০২৪ আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ৮ আগষ্ট শান্তিতে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ডঃ মুহম্মদ ইউনুস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন এবং নবনির্বাচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ক্ষমতা গ্রহণের আগ অব্দি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় কতিপয় উপদেষ্টা নিয়ে দেশ পরিচালনা করেছেন। যেহেতু জুলাই ৩৬ ছিল বৈষম্য নিরসন করে চাকরিতে কোটা সংস্কার এবং স্বৈরাচারী সরকার বিরোধী আন্দোলনের মুল চালিকাশক্তি তাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই লক্ষ্যে শাসন ও বিচার ব্যবস্থার নানাবিধ সংস্কার আনয়নেরজন্যে বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে: ১. নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, যার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ড. বদিউল আলম মজুমদার, ২. পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশন, প্রধান হিসেবে সরফরাজ হোসেন, ৩. বিচারবিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান, ৪. দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশন প্রধান হিসেবে ইফতেখারুজ্জামান, ৫. জনপ্রসাশন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী, এবং ৬. সংবিধান সংস্কার কমিশন, যার প্রধান হিসেবে অধ্যাপক ড. আলী রিয়াজ (পূর্বে ঘোষিত ড. শাহদীন মালিক) দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কমিশনগুলো সুপারিশসহ তাদের প্রতিবেদন সরকারের নিকট দাখিল করেছেন।
কমিশনসমূহের তালিকাদৃষ্টে প্রতিয়মান হয় যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিক্ষা সংস্কার বিষয়ক কোন কমিশন গঠন করে নাই। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষে করণীয় নির্ধারনের জন্যে ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস প্রফেসর মঞ্জুর আহমদকে প্রধান করে ১০ সদস্যবিশিষ্ট একটি শিক্ষা বিষয়ক কমিটি গঠন করে। এই কমিটি ‘শিক্ষা আইন, ২০২৬’ শীর্ষক একটি আইনের খসড়া প্রণয়ন করেন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের নিকট দাখিল করে। চব্বিশ পৃষ্ঠার এই খসড়া আইনে মোট ৫৭ টি ধারা রয়েছে। অধ্যায় রয়েছে ১১ টি। এই আইনের লক্ষ্য সম্বন্ধে প্রারম্ভিকে বলা হয়েছেঃ
“নিরক্ষরতা দূরীকরণ, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার, সকলের জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষার সুযোগ অবারিত, বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক, জীবনব্যাপী ও সর্বজনীন করা এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করিয়া আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রচলিত আইনের বিধানসমূহ অধিকতর সংহত ও কার্যকর করিবার উদ্দেশ্যে পরিপূরক বা সম্পূরক বিধান প্রণয়নকল্পে আনীত বিল যেহেতু মানসম্পন্ন শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক, জীবনব্যাপী এবং যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন; যেহেতু, শিক্ষা সম্পর্কিত প্রচলিত আইনের বিধানসমূহকে অধিকতর সমন্বিত ও কার্যকর করিবার উদ্দেশ্যে পরিপূরক বা সম্পূরক বিধান প্রয়োজন; সেহেতু, এতদ্বারা নিন্মরূপ আইন প্রণয়ন করা হইল”।
উপরোল্লিখিত প্রেক্ষাপটে নূতন বি এন পি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। বলা দরকার, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, অভিভাবকসহ যে বিপুলসংখ্যক জনবল নিয়োজিত তার সংখ্যা ৪ কোটিরও বেশি (প্রাথমিক ২.১০ কোটি, মাধ্যমিক ১.২০ কোটি, উচ্চমাধ্যমিক ৩০–৪০ লাখ, ডিগ্রী (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়য়) ২০–২৫ লাখ, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৫.৮ লাখ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৪.৫ লাখ, কর্মকর্তা-কর্মচারি প্রায় ১০.০ লাখ) [ব্যানবেইস রিপোর্ট ২০২৩]। বলা যেতে পারে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্তাংশ নিয়োজিত শিক্ষাখাতে। সুতরাং শিক্ষাখাতের প্রতি সরকারের অগ্রাধিকার জাতীয় উন্নতির স্বার্থেই প্রয়োজন। কেননা শিক্ষা হলো মানবসম্পদ উন্নয়নের পূর্বশর্ত। মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমেই উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন তথা আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব। আমরা জানি, নবাগত সরকারের বেশ কিছু প্রবীণ সদস্যদের শিক্ষাখাত তথা দেশ পরিচালনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। দেশের মানুষ বিশ্বাস করে, সেই পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে এবং গুণগত শিক্ষাবিস্তারে বাংলাদেশ বহুদূর এগিয়ে যাবে। বিশেষ করে বৈশ্বিক র্যাংকিং এ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ একটি সন্মানজনক স্থান লাভে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কার কেন প্রয়োজন: দেশে শিক্ষা সংস্কারের কথা কেন বলা হচ্ছে? দেশের শিক্ষা এবং শিক্ষাব্যবস্থা কি ঈপ্সিত পর্যায়ে নেই? শিক্ষা নিয়ে দেশবাসী ও সরকার কি বিব্রত? স্বাধীনতা অর্জনের বিগত ৫০ বছরে এত শিক্ষা কমিশন গঠন ও তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রণীত শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের ফলে শিক্ষা সংস্কারের কাজ কতটা সফল হয়েছে? গুণগত শিক্ষা প্রদানে আমরা কতটা সফলতা অর্জন করতে পেরেছি? তিন স্তরের (প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষার বর্তমান অবস্থা কী? শিক্ষায় অনুদান প্রদানকারী প্রথম সারির উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে পরিচিত বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফ –এর মূল্যায়নে দেখা যায় বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও শ্রীলংকার চেয়ে খারাপ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৫ম শ্রেণী পাশ একজন ছাত্র বিজ্ঞান, গণিত ও ভাষা বিষয়ে যা জানে– শ্রীলংকা কিংবা ভারতের ৩য় শ্রেণীর ছাত্র ছাত্রীরা তার চেয়ে ভাল জানে। আমাদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ ছাত্রছাত্রীদের যোগ্যতার যে পরাকাষ্ঠা তা আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল দেখেই অনুমান করতে পারি, যেখানে শতকরা মাত্র ১০ জন পাশ করে ও ৯০ জন ফেল করে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় আজ অব্দি বিশ্বের ৫০০ উৎকৃষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নাম লেখাতে পারেনি। এই বৈশ্বিক র্যাংকিং এ ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যলয় না আসতে পারাকে উচ্চশিক্ষার বিরাট ঘাটতি বলে অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন। যদিও দক্ষিণ এশীয় দেশ ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় উল্লিখিত বৈশ্বিক র্যাঙ্কিং তালিকায় প্রতি বছর স্থান লাভ করতে সক্ষম হয়।
আমাদের এমন কী সমস্যা যার ফলে আমরা দীর্ঘ ৫০ বছর সময়ের মধ্যেও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার যথোচিত সংস্কার এবং মান অর্জন করতে পারি নাই? সকল স্তরে শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক এমন কি আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি সন্মানজনক স্থানে নিয়ে যেতে পারি নাই। প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক ঐ শিক্ষা কোন শিক্ষা যা আমরা আমাদের ছাত্রছাত্রীদের প্রদান করতে আমরা সক্ষম হই নি?
শিক্ষাবিদ ও বিশেজ্ঞদের মতে গুণগত শিক্ষা বলতে সেই শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থাকে বুঝায় যে শিক্ষা কিছু সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক চলক এবং মানদন্ড পূরণ করতে সক্ষম। শিক্ষায় ঐ সকল চলক ও মানদণ্ড পূরণ না করে যেনতেনভাবে শিক্ষা প্রদান করে সার্টফিকেট বিতরণ করে কেবল সংখ্যা বৃদ্ধি করলে তা ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বের জন্যে কোন সুফল বয়ে আনতে পারে না। বর্তমান যুগ তীব্র প্রতিযোগিতার যুগ। শিক্ষা গ্রহণ, জীবিকার্জনের জন্যে কর্ম সংস্থানসহ সকল ক্ষেত্রেই এই প্রতিযোগিতা সমানভাবে বিদ্যমান। সুতরাং ছাত্র-শিক্ষক-গবেষকসহ সকল পেশাজীবিকে এই প্রতিযোগিতার কথা মনে রেখে স্ব স্ব কাজে উৎকর্ষতা অর্জন করতে হবে। তাই শিক্ষার মান বজায় রাখা একটি দেশের জন্য অতীব জরুরি। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শিক্ষা দেশের অন্যতম বৃহত্তম পরিসর। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে যথাযথ কাঠামোর মধ্যে রাখতে হবে। দেশ কত উন্নত হবে অথবা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কতটুকু উন্নয়নের পথে ধাবিত হবে তা বোঝা যায় শিক্ষাসংক্রান্ত পরিকল্পনা দেখে। শিক্ষা এবং শিক্ষার মান ও গুণ কথা দুটির ভিন্ন তাৎপর্য রয়েছে। বর্তমানে বহুল উচ্চারিত শব্দ হলো ‘মানসম্মত ও গুণগত শিক্ষা’। শিক্ষা দেওয়া ও গ্রহণ করার সাধারন রীতি যেটা শুধুমাত্র শিক্ষিত খেতাবের জন্য কিন্তু একজন সুনাগরিক হিসেবে এবং জীবনসংগ্রামে টিকে থাকার জন্যে দক্ষ ও উপযুক্ত মানব হিসেবে গড়ে উঠতে গেলে প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষার । তাই শিক্ষার মান উন্নয়ন প্রয়োজন।
বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কারের ইতিহাস: ১৯৭১ সনে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই অর্ধ শতাব্দী সময়ের ব্যপ্ত পরিসরে শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্যে মোট ৯টি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। এ গুলো হলোঃ ড. কুদরক-ই- খুদা কমিশন-১৯৭২, ড. আব্দুল মজিদ কমিশন- ১৯৮০, ড. মফিজ উদ্দিন আহম্মদ কমিশন-১৯৮৭, ড. শামসুল হক কমিশন-১৯৯৭, ড. আব্দুল বারী কমিশন-২০০২, ড. মনিরুজ্জামান কমিশন-২০০৩ এবং ড. কবীর চৌধুরী কমিশন-২০০৯। এ ছাড়া ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও সর্বশেষ ২০২১ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও চালু করা হয়। যা নিয়ে গোটা দেশের মধ্যে চরম বিতর্ক ও বিশৃংখলা তৈরি হয়। অবশেষে অন্তর্বতী সরকার এই শিক্ষাক্রম স্থগিত ঘোষনা করে ইতিপূর্বেকার ২০১২ সালের সৃজনশীল শিক্ষাক্রম পুনরায় চালু করে। এর মধ্যে নবম শ্রেণী থেকে বিষয় বিভাজন (মানবিক, বাণিজ্য ও বিজ্ঞান) ও সামষ্ঠিক পরীক্ষায় আগের মত বেশি নম্বর বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিক্ষা আইন, ২০২৬ প্রণয়ন করে যা নির্বাচিত সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।
বিভিন্ন শিক্ষা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে বিগত ৫০ বছরে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিভিন্ন সময়ে যে সকল পরিবর্তন আনা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতমঃ শিক্ষাক্রম পরিবর্তন- ১৯৭৭, পাঠ্যবই পরিমার্জন- ১৯৮৬, প্রাথমিক স্তরে যোগ্যতাভিত্তিক পাঠক্রম চালু- ১৯৯২, মাধ্যমিক স্তরে অবজেক্টিব টাইপ পরিক্ষা পদ্ধতি চালু- ১৯৯৫, প্রাথমিকের কিছু বই পরিমার্জন- ২০০২, সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি চালু- ২০১২ এবং সর্বশেষ শিখনকালীন মূল্যায়ন পদ্ধতি সংক্রান্ত শিক্ষাক্রম- ২০২১ চালু। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালের শিক্ষাক্রমের ভিত্তিতে চালু করা ২০২২ সালের শিখনকালীন মূল্যায়ন পদ্ধতি সংক্রান্ত শিক্ষাক্রম বাতিল করে ২০১২ সালের সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি আপদকালীন সময়ের জন্যে চালু রেখেছে। তাছাড়া গোটা পাঠ্যক্রম সংস্কারের কাজ তাদের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই সংস্কারের পথে না গিয়ে সার্বিকভাবে শিক্ষার উন্নয়নের জন্যে কী করা প্রয়োজন তা উল্লিখিত শিক্ষা আইন- ২০২৬ এ লিপিবদ্ধ করে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের অনুমোদনের জন্যে রেখে গিয়েছে। এখন নূতন নির্বাচিত সরকার কোন পথে হাঁটবেন তা তাদের বিবেচ্য বিষয়। এ দিকে বিগত বছরগুলোতে আমাদের শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তা মূল্যায়নের সময় এসেছে বলে প্রতিয়মান হয়।
মানসম্মত ও গুণগত শিক্ষা বলতে কী বোঝায়? গুণগত শিক্ষা এমন একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থা যার উদ্দেশ্য হলো সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থীকে সাহায্য করা যেন শিক্ষার্থীরা তাদের পূর্ণ সম্ভাবনার বিকাশ ঘটিয়ে সমাজে জন্য একজন পূর্ণাঙ্গ ও উৎপাদনশীল নাগরিক হয়ে উঠতে পারে। তাই শিক্ষায় এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে যেন প্রতিটি শিশু স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় এবং স্কুলের লব্ধ জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং তৎপরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন কারগরি ও পেশাভিত্তিক শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে সফলতার সাথে সকল প্রতিযোগিতা পেরিয়ে অংশগ্রহণ করতে পারে। এবং শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতের জন্য উৎপাদনশীল নাগরিক হয়ে গড়ে উঠতে পারে।
এ ছাড়া গুণগত শিক্ষা শিক্ষার্থীদেরকে ন্যায়বোধ, কর্তব্যপরায়ণতা, শৃঙ্খলা, আচরণবিধি, ধর্মনিরপেক্ষতা, বন্ধুত্বর্পূণ মনোভাব, সহাবস্থান, অনুসন্ধিৎসু, দেশপ্রেমিক, দেশের অতীত ও বর্তমান ইতিহাস, দেশের গুণীজন ও সাধারণ জনগণের প্রতি ভালোবাসাবোধ, দায়বদ্ধতা, অধ্যবসায়সহ নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অন্তর্নিহিত গুণ উন্মোচনে সহায়তা করে। তারা কর্মজীবনের জন্য তৈরি হবে এবং বৈশ্বিক পরিবেশে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হবে।
গুণগত শিক্ষা ও উন্নয়ন অংশীদারদের প্রত্যাশা: বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে সর্বজনীন অন্তর্ভুক্তিমূলক গুণগত শিক্ষা বাস্তবায়নে আঙ্গীকারাবদ্ধ। সহস্রাব্দ বাস্তবায়ন লক্ষ্যমাত্রা (এম ডি জি ২০০০-২০১৪) বাস্তবায়নে সরকার কাজ করেছে। কিন্তু এম ডি জি সফল হয় নি। অতপর ২০১৫–২০৩০ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নযোগ্য টেক্সই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্র (এস জি ডি) বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। বলা দরকার এস জি ডি’র লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে ২০২৬ (করোনার জন্যে প্রাপ্ত গ্রেস ২০২৭ সাল পর্যন্ত) সাল নাগাদ বাংলাদেশের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের সনদ পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠতে পারে। সে জন্যে এস ডি জি’র লক্ষমাত্রা ৪ এ প্রদত্ত সকল লক্ষ্য অর্জনের জন্যে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে।
এস ডি জি ৪-গুণগত শিক্ষা অর্জন -এর লক্ষ্যমাত্রা
৪.১ ২০৩০ সালের মধ্যে সকল ছেলে ও মেয়ে যাতে প্রাসঙ্গিক, কার্যকর ও ফলপ্রসূ অবৈতনিক, সমতাভিত্তিক ও গুণগত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে তা নিশ্চিত করা;
৪.২ ২০৩০ সালের মধ্যে সকল ছেলে ও মেয়ে যাতে প্রাথমিক শিক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাসহ শৈশবের একেবারে গোড়া থেকে মানসম্মত বিকাশ ও পরিচর্যার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে তার নিশ্চয়তা বিধান করা;
৪.৩ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের সুযোগসহ সাশ্রয়ী ও মানসম্মত কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও উচ্চ শিক্ষায় সকল নারী ও পুরুষের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা;
৪.৪ চাকরি ও শোভন কর্মে সুযোগলাভ এবং উদ্যোক্তা হবার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক দক্ষতাসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক দক্ষতাসম্পন্ন যুবক ও প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠির সংখ্যা ২০৩০ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো;
৪.৫ অরক্ষিত জনগোষ্ঠীসহ অসমর্থ (প্রতিবন্ধী) জনগোষ্ঠী, নৃ-জনগোষ্ঠী ও অরক্ষিত পরিস্থিতির মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সকল পর্যায়ে সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং শিক্ষায় নারী পুরুষ বৈষম্যের অবসান ঘটানো;
৪.৬ নারী ও পুরুষ সহ যুবসমাজের সবাই এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে সাক্ষরতা ও গণন-দক্ষতা অর্জনে সফলকাম হয় তা নিশ্চিত করা;
৪.৭ অপরাপর বিষয়ের পাশাশাশি, টেকসই উন্নয়ন ও টেকসই জীবনধারার জন্য শিক্ষা, মানবাধিকার, নারী পুরুষ সমতা, শান্তি ও অহিংসামূলক সংস্কৃতির বিকাশ, বৈশ্বিক নাগরিকত্ব এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও টেকসই উন্নয়নে সংস্কৃতির অবদান সম্পর্কিত উপলব্ধি অর্জনের মাধ্যমে সকল শিক্ষার্থী যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে তা নিশ্চিত করা;
৪.৮ শিশু, অসামর্থ্য (প্রতিবন্ধিতা) ও জেন্ডার বিষয়ে সংবেদনশীল শিক্ষা সুবিধার নির্মাণ ও মানোন্নয়ন এবং সকলের জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর শিক্ষা পরিবেশ প্রদান করা;
৪.৯ উন্নত দেশ ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, কারিগরি, প্রকৌশল ও বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মসূচিসহ উচ্চশিক্ষায় ভর্তির জন্য উন্নয়নশীল দেশ, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ, উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে প্রদেয় বৃত্তির সংখ্যা বৈশ্বিকভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো; এবং
৪.১০ শিক্ষক প্রশিক্ষণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ ও উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা। সূত্রঃজাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন
এস জি ডি’র উপরোল্লেখিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বিশেষজ্ঞদের মত হলো- নিন্মোক্ত প্রতিটি উপাদান যথযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবেঃ
মানসম্মত শিক্ষকের পর্যাপ্ততা; যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম প্রণয়ন; মানসম্মত বই ও শিখন সামগ্রী ব্যবহার; শিখন-শেখানো পদ্ধতির ও কৌশলের কার্যকর ব্যবহার;
নিরাপদ ও সহযোগিতামূলক শিখন পরিবেশ; উপযুক্ত মূল্যায়ন ব্যবস্থা; প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তার ও কর্মচারীর সুসম্পর্ক; শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সুবিধা।
গুণগত ও মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নের এ সকল উপাদান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমাদের অবশ্যই কার্যকর প্রাধিকারভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এগুলোর মধ্যে আবশ্যিক সহায়ক উপাদান হচ্ছেঃ
বাজেট বরাদ্দ: ইউনেস্কোর পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন অনুযায়ী একটি দেশের শিক্ষাখাতে বরাদ্দ হওয়া উচিৎ বাৎসরিক মোট বাজেটের ২০% এবং জিডিপি’র ৬%। যাই হোক, সে হিসাবে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। শিক্ষা খাতে বাংলাদেশের চলতি অর্থ বছরের বরাদ্দ জিডিপি’র ১.৮১% এবং মোট বাজেটের ১৩.৭০% এর মত যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিন্ম। বাজেট বরাদ্দ কম থাকার কারণে আমাদের শিক্ষকদের বেতনও কম। কম বেতনে যা দিয়ে একজন শিক্ষক সচ্ছন্দ্যে সংসার চালাতে পারেন না তিনি টিউশনি বা অন্য পার্শ্ব আয়ের কথা চিন্তা না করে একনিষ্ঠভাবে কিভাবে শিক্ষাদানে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারেন। সুতরাং মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ আসলে শিক্ষকদের বেতন ও সামাজিক মর্যাদার কথা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। কারণ শিক্ষকতা অন্যান্য পেশার রোল মডেল। একজন শিক্ষক, সমাজ ও জাতি গড়ার কারিগর। সুস্থ দেশ গড়ার জন্য চাই একজন যোগ্য শিক্ষক। শিক্ষাব্যবস্থাপনা, শিক্ষা প্রশাসন, যোগ্য শিক্ষকমণ্ডলী ও কারিকুলামের ওপর নির্ভর করে মানসম্মত শিক্ষা অর্জন সম্ভব। শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্তসহ মানসম্মত পাঠদানের অভিনবত্ব সৃষ্টির মাধ্যমেই নিশ্চিত হবে শিক্ষার গুণগত মান। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের পাঠদানের ক্ষেত্রে তাদের সদিচ্ছা, ইচ্ছাশক্তি ও আন্তরিকতাই যথেষ্ট। একজন শিক্ষকের জীবনাদর্শ হবে দেশ, জাতি ও সমাজের জন্য আলোকবর্তিকাস্বরূপ। শিক্ষকদের স্বশাসিত হতে হবে। তাড়িত হতে হবে বিবেক দ্বারা। শিক্ষার্থীদের আত্মোপলব্ধির প্রয়োজনে চমৎকার উদ্ভাবনী ক্ষমতা থাকবে শিক্ষকদের। সুতরাং শিক্ষকদের বেতন ও সন্মান খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
যোগ্য শিক্ষকের সংখ্যা বাড়াতে হবে: বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাথমিকে ছাত্র-শিক্ষকের অনুপাত হচ্ছে ১:৩০। মাধ্যমিকে তার চেয়ে সামান্য কম এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ১:২৩। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করতে হলে যোগ্য শিক্ষকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। তাদের সামাজিক সন্মান ও জীবন মান বৃদ্ধির সুযোগ করে দিতে হবে। আর সেজন্যে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের বেতন কাঠামোর অনুরূপ বেতন ও সন্মান বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। এ জন্যে আধুনিক সুযোগসুবিধা সম্বলিত প্রশিক্ষণ প্রতিষানের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
পাঠক্রম পর্যালোচনা: বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্যে নিয়মিতভাবে পাঠক্রম মূল্যায়ন ও পরিবর্তনের জন্যে একটি স্থায়ী কমিশন থাকা প্রয়োজন। এই কমিশন প্রতিনিয়ত শিক্ষাক্রম যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়ন করবে। এই কমিশন সরকারের প্রধান নির্বাহী (প্রধানমন্ত্রী) –এর অধীনে কাজ করলে ভালো হয় বলে বিজ্ঞজনেরা মনে করেন।
ছাত্র-শিক্ষক যোগাযোগ বৃদ্ধি: শিক্ষার সকল স্তরে প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-শিক্ষক যোগাযোগ খুবই দুর্বল। প্রথমত ছাত্রছাত্রীরা শ্রেণীকক্ষে আসে না – অনুপস্থিত থাকে। কিতাবে ৭০% হাজিরার কথা বলা থাকলেও অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এর ব্যত্যয় লক্ষ্য করা যায়। শ্রেণীকক্ষে ছাত্রছাত্রীদের নিয়মিত করা গেলে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারনা।
ছাত্র-পুস্তক যোগাযোগ: শ্রেণীকক্ষে অনুপস্থিতই শুধু নয় পাঠ্যবই এর প্রয়োজনীয় অংশে ছাত্র-ছাত্রীদেরত চোখ বোলানোও হয়ে উঠে না। একজন ছাত্র তার পাঠ্যবই আগাগোড়া পড়েছে কিনা তা যাচাই করার কোন পদ্ধতি বর্তমানে প্রচলিত নেই। তাই একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীতে একজন ছাত্রের পাঠ্যবই পড়ে যে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের কথা আমাদের শিক্ষার কোন স্তরের ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্ত্রেতেই তা হয়ে উঠে না। উদাহরণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার কথা বলা যেতে পারে। ওখানে যে সকল প্রশ্ন করা হয় তা উচ্চমাধ্যমিকের পাঠক্রমের বাইরের উৎস থেকে করা হয় না। পুরো বই পড়া এবং রপ্ত করা থাকলে উত্তর দেয়া (অন্তত ৫০%) কঠিন হওয়ার কথা নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল এ বিষয়ের প্রতি স্পষ্ট ইংগিত করে যে আমাদের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের জন্যে নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তক যথাযথভাবে আয়ত্ব করে নাই। অর্থাৎ ছাত্র-পুস্তক সংযোগ বা যোগাযোগ দুর্বল, কম এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। এই অবস্থা কেন হচ্ছে তার কারণ নির্ধারন করে এর প্রতিকার করতে না পারলে শিক্ষার অবস্থা অপরিবর্তিতই থেকে যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারনা।
শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্কোন্নয়ন: পাঠদানের বিষয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষকদের সম্পর্কন্নোয়ন ও সমন্বয় দরকার। শিক্ষার মান উন্নয়নে অভিভাবকদের ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি অভিভাবক অন্তত সপ্তাহে এক দিন শিক্ষকদের সম্মানের সঙ্গে ছাত্রদের বিষয়ে জানতে চাইবেন। শুধু নিজের সন্তানকে সন্তান মনে করলে হবে না। বিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি সন্তানকে সমান চোখে দেখা উচিত। নিজের সন্তানকে তাগিদ দেওয়ার পাশাপাশি পাশের অন্যের সন্তানকেও জানতে হবে। নিজের সন্তানকে শুধু সন্তান মনে করে আমরা একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমে গিয়েছি। কেন আমার সন্তান রোল ১ করলো না। কেন অমুকের সন্তানের রোল ১ হলো। এতে শিক্ষকরা কিছুটা বিড়ম্বনার শিকার হন। তবে এ ক্ষেত্রে যদি শিক্ষকদের কোনো ত্রুটি বা হাত থাকে তাহলে এ লজ্জাজনক কাজ থেকে সরে আসাই ভালো।
নৈতিক ও সহশিক্ষা জোরদারকরণ: শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবই পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মূল্যবোধ শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা, বিনয় ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করার দীক্ষা অবশ্যই আমাদের শিক্ষকদের দিতে হবে। মনে রাখতে হবে শিক্ষক কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, তিনি সমাজেরও শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নির্ভরতা কমিয়ে মানসিক চাপমুক্ত করতে সহায়তা করা শিক্ষকের একান্ত দায়িত্ব। পরীক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা সৃজনশীলতা হারাচ্ছে। পরীক্ষা নির্ভরতা কমিয়ে, মেধা যাচাই করে প্রাথমিক স্তরেই তাদের ভদ্রতা, নম্রতা, শিষ্টাচার, দেশপ্রেম, পরোপকারিতা ও ন্যায়পরায়ণতা শেখানো উচিত। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরীক্ষার ক্ষেত্রে বারবার নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলে বা নিয়ম চালু হলে তাতে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীর ভূমিকার ব্যাপারে; লেখাপড়ার বিষয়ে কোনো সমস্যা দেখা গেলে তা অবশ্যই শিক্ষকদের জানাতে হবে। দুর্বল শিক্ষার্থী বন্ধুদের প্রতি কখনো খারাপ আচরণ করা যাবে না। তারা যাতে ভালো হয় সেজন্যে সাহায্য করতে হবে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক যাতে সুবিধামতো পড়াতে পারেন সে বিষয়ে শিক্ষককে সহযোগিতা করতে হবে। প্রতিদিনের পড়া প্রতি দিন ক্লাসে শেষ করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা জ্ঞানবৃদ্ধির জন্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সকল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন একটি পরিচ্ছন্ন বিদ্যালয় পাবে, তেমনি তারা কর্মঠ, উদ্যমী ও স্বাবলম্বী হবে এবং পরিচ্ছন্ন থাকার জ্ঞান লাভ করবে। আমাদের শিক্ষার মান উন্নয়নে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। শিক্ষকদের ছাত্র শাসনের ব্যাপারে বিশেষ নিয়মে আবদ্ধ করা যাবে না। সেজন্য শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষকদের কোমলমতি মন নিয়ে ভালোবাসা দিয়ে যত্নসহকারে পড়াতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদের শিক্ষকদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। সবকিছু মিলিয়ে প্রশাসনিক দিক থেকে তৃণমূল পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজালে আমাদের শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব।
খেলাধুলা, আবৃত্তি, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, ইত্যাদি সহশিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে। সহশিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার সুযোগও থাকা চাই অবারিত। ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞান বৃদ্ধির লক্ষে পাঠ্যবই এর বাইরের বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। সেজন্যে গ্রন্থাগার ক্লাশ ও গ্রন্থাগার থেকে পুস্তক ধার করার নিয়ম চালু করতে হবে।
শিক্ষার অনুকুল পরিবেশ: আজকের শিশুদের কেউবা হবে আগামী দিনের প্রকৃত মানুষ, আর প্রকৃত মানুষ হতে পারলেই তারা হতে পারবে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী। কেউ হবে শিল্পী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ, লেখক, কবি ও সাংবাদিক। এগুলো তৈরি হবে শিক্ষাঙ্গনেই। তাই শিক্ষাঙ্গনের শ্রেণিকক্ষই শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জীবনের প্রস্তুতির ক্ষেত্র। পৃথিবীর প্রায় সব দেশই বর্তমান সমাজের প্রয়োজনমতো চাহিদা ও ভবিষ্যৎ সমাজের সম্ভাব্য চিত্রকে সামনে রেখে তাদের শিক্ষাব্যবস্থা তথা শিক্ষাঙ্গনে ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টিতে সচেষ্ট হতে হবে। উত্তম শিক্ষাব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন অনুকূল পরিবেশ। আর এই পরিবেশ গড়ে তোলার দায়িত্ব শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ততাই গড়ে দিতে পারে গুণগত শিক্ষার মজবুত ভিত। শিক্ষাকে গুণগত মানের দিক থেকে উন্নত করতে পারলেই জাতীয় জীবনে এগিয়ে চলা সহজ হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত করা: প্রাথমিক শিক্ষার স্তর ৫ম শ্রেণীর স্থলে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত হওয়া প্রয়োজন। কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনে ১৯৭২ সনে এই সুপারিশ করা হয়েছিল। মনিরুজ্জামান কমিটি (২০০১) ও আব্দুল বারী কমিটিও (২০০২) অভিন্ন সুপারিশ করেছিল। কিন্তু শিক্ষা আইন ২০২৬, এ প্রাথমিক শিক্ষাস্তর ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত করার যুক্তি হচ্ছে – এই বয়সে ছাত্রছাত্রীরা শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতার প্রাথমিক ধাপ মেটাতে সক্ষম হয়। আমাদের দেশের ৪র্থ শ্রেণীর চাকরির যোগ্যতাও ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত চাওয়া হয়। আর ৮ম পর্যন্ত এই প্রাথমিকের পর শুরু হবে বাছাই পর্ব। শুধু মেধাবীরাই ৯ম শ্রেণীতে যাবে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে। বাকীরা টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল ট্রেনিং এ যাবে। বিদেশগামী শ্রমিকেরা হবে ৮ম শ্রেণী পাশ ও ভোকেশনাল ট্রেনিংপ্রাপ্ত দক্ষ শ্রমিক।
মাদ্রাসা শিক্ষা: মাদ্রাসা শিক্ষা দেশের একটি বাস্তব ও ঐতিহাসিক অংশ। খসড়ায় আলিয়া ধারার সঙ্গে মূলধারার সমন্বয়ের ইঙ্গিত থাকলেও মানোন্নয়ন ও সনদের সামঞ্জস্যের প্রশ্নে আরও সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রয়োজন। কওমি ধারার ক্ষেত্রেও স্বীকৃতি ও দক্ষতা সংযোগের বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক আলোচনা জরুরি। সমন্বিত কাঠামো ছাড়া শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের পথ সীমিত হতে পারে। দেশের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফোরকানিয়া/হেফজ মাদ্রাসাগুলোকে সর্বজনীন শিক্ষার অধীনে আনা যায় কিনা তাও নূতন সরকার বিবেচনা করে দেখতে পারেন। মনে রাখতে হবে তারাও আমাদের উন্নয়ন অংশীদার।
কারিগরি শিক্ষা সংস্কার: বিশ্বের যে-সব দেশ কারিগরি শিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, সেসব দেশ অর্থনৈতিকভাবে তত বেশি সমৃদ্ধ হয়েছে। দেশের সব শ্রেণির শিক্ষিত জনগোষ্ঠী সমন্বিত অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখলেও এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে কারিগরি শিক্ষা। বিশেষ করে মধ্যমস্তরের কারিগরি শিক্ষা। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার হারের ওপর গড় বাৎসরিক মাথাপিছু আয় নিবিড়ভাবে নির্ভরশীল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, যেমন - অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন কারিগরি শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করায় আজ তারা উন্নত বিশ্বের কাতারে অবস্থান নিশ্চিত করেছে। ষাট থেকে সত্তর দশকে মালয়েশিয়ার শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি শিক্ষার জন্য ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে এসে ভর্তি হতেন। আর এখন আমাদের ছাত্রদের মালয়েশিয়ায় যেতে হয় তাদের দেশের প্রযুক্তি জ্ঞান অর্জনের জন্য। শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়ে কারিগরি শিক্ষার হার বৃদ্ধি করার কারণেই তারা আজ উন্নত বিশ্বের কাতারে।
আমাদের দেশে ১৯৫৫ সালে তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট (বর্তমান ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মধ্যম স্তরের প্রকৌশলী তথা ডিপ্লোমা প্রকৌশলী তৈরির স্বতন্ত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘ ৬৯ বছরে সরকারি ৫০টি এবং বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় ৫ শতাধিক পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রতি জেলায় স্থাপিত সরকারি বৃত্তিমূলক র্শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (টিএসসি) দক্ষ জনবল তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে কারিগরি শিক্ষার হার প্রায় ১৫-১৬ শতাংশ। বিগত সরকার এ হার ২০২০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছিল। সে টার্গেট অর্জিত হয়নি। বিগত সরকার কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিতের হার ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। এটা খুবই আশাব্যঞ্জক হলেও কারিগরি শিক্ষা এখনো অবহেলিত। কারিগরি শিক্ষায় ৫০ শতাংশ ভর্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে যেহেতু কারিগরি শিক্ষা গ্রহণে এখনো আমাদের দেশে আগ্রহ কম। সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের অনুপাত নির্ধারণ হওয়া প্রয়োজন। বি এন পি’র নূতন সরকার এ বিষয়ে সঠিক দিক নির্দেশনা প্রদান করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এখানে বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার বর্তমান অবস্থার উপর সামান্য আলোকপাত করা দরকার।
বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীনে শের-ই-বাংলা নগরস্থ আগারগাঁও এ অবস্থিত কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর। বাংলাদেশের একমাত্র কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অফিস এখানেই। কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ ও মানোন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৬০ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর অধীনে সরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মোট ২০০টি। এ গুলোতে শিক্ষার স্তর মোট ৩ টি। ১. ডিপ্লোমা ডিগ্রির নিচে ৬ মাস/ ১ বছর মেয়াদি ভোকেশনাল/ট্রেড কোর্স ২. পলিটেকনিক ইন্সটিউটে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ও ৩। স্নাতক পর্যায়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং। এগুলোর মধ্যে সার্টিফিকেট পর্যায়ে ১৩৪ টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ এবং ১ট ভোকাশনাল টিচার্চ ট্রেনিং ইন্সটিটিউট রয়েছে। এ ছাড়া ডিপ্লোমা পর্যায়ে ৫০ টি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট এবং ডিগ্রি পর্যায়ে ৪ টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ রয়েছে। এগুলো ছাড়াও এই অধিদপ্তরের অধীনে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ২০২২-২৩ সালে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে সর্বমোট ১১,১১৮ টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দিয়েছে। এ গুলোর মধ্যে সরকারি ৭৭৭ টি ও বেসরকারি ১০,৩৪১ টি। এগুলোর মোট আসন সংখ্যা হচ্ছে ১৩,৬৯,১০৫ টি। ২০২২-২৩ সালে ভর্তি হয়েছে মোট ৬,৭৩,৫৯১ জন (সরকারি ৯৭,৯২৯ জন ও বেসরকারি ৫,৭৬,৬৬২ জন)। অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক পর্যায়ে মাদ্রাসায় ছাত্রসংখ্যা ৬২,১৬,১১১ জন এবং কারিগরি পর্যায়ে ২০,৭০৬৮ জন ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়েছে।
এ ছাড়া এই অধিদপ্তরের অধীনে রয়েছে ‘জাতীয় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ও গবেষণা একাডেমি (নেকটার)। ১৯৮৪ সালে বগুড়া জেলার শাজাহানপুর উপজেলার জাহাঙ্গীরাবাদ সেনানিবাস সংলগ্ন নেকটার –এর কার্যক্রম শুরু হয়। এর মূল কাজ হচ্ছে – শিক্ষিত বেকার যুবক ও মহিলাদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ ও আত্নকর্মসংস্থান এবং অনলাইন মার্কেট প্লেসে কাজ করার উপযোগী করে গড়ে তোলা। এ ছাড়াও সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জন্যে তথ্য প্রযুক্তি (আই সি টি) বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ দেশে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণে প্রতি জেলায় একটি করে সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও প্রতিটি উপজেলায় একটি করে বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, টেক্সটাইল ও লেদার ইনস্টিটিউটসহ এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ শিক্ষানীতিতে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডকে অধিকতর শক্তিশালী করা ও প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান ও জনবল বৃদ্ধি, যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক-প্রশিক্ষক নিয়োগের অঙ্গীকার করা হলেও বাস্তব অগ্রগতি সামান্যই। প্রতিটি বিভাগে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড হওয়া দরকার। একটি মাত্র কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পক্ষে বিপুল সংখ্যক কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তত্ত্বাধাবন করা সম্ভব নয়। দেশে ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা হলেও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সংখ্যা ১টিই রয়ে গেছে। অর্থাৎ কারিগরি শিক্ষা উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। উপরন্তু পরিকল্পনাহীনতার কারণেই দেশে এখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা পঞ্চাশোর্ধ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত প্রায় ৭০০ সরকারি-বেসরকারি কলেজে অনার্স-মাস্টার্স খোলা হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এখন ১১৪টি (জুন ২০২৩)। এসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতি বছর স্নাতক (স্নাতক পাস সম্মান) ও মাস্টার্স পর্যায়ে প্রায় ১২ লাখ শিক্ষার্থী ভর্তি হন। প্রতি বছর এসব প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়ে আসেন প্রায় ৭-৮ লাখ। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক উচ্চশিক্ষিত লোকবলের চাহিদা আমাদের শ্রমবাজারে নেই। সে কারণে প্রতি বছর প্রায় ৩-৫ লাখ উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণী বেকারের তালিকায় যুক্ত হচ্ছেন।
তাই আমরা মনে করি ১. স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষাকে সীমিত করে সনদনির্ভর দক্ষতাহীন শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা হ্রাস করা। ২. প্রাথমিক (৮ম শ্রেণি পাশ) ও এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের কমপক্ষে ৫০ শতাংশকে কারিগরি শিক্ষাগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা। ৩. সাধারণ শিক্ষায় একাদশ শ্রেণির আসন সংখ্যা যৌক্তিক হারে সংকুচিত করে কারিগরি শিক্ষার আসন বৃদ্ধি করা এবং কোনো আসন যাতে খালি না থাকে তা নিশ্চিত করা। ৪. শুধু পরিমাণগত নয়, গুণগত মানও নিশ্চিত করা। ৫. বেসরকারি পর্যায়ে নতুন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট অনুমোদনের ক্ষেত্রে মান ও ইতোমধ্যে অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। ৬. প্রতিটি বিভাগে ১টি করে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড স্থাপন করা। এবং ৭. শ্রম বাজারের চাহিদা নিরূপণ করে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। [বুয়েট, কুয়েট, চুয়েট, রুয়েট ও বুয়েট এই আলোচনার অন্তর্ভুক্ত নয়]।
উচ্চশিক্ষার গুরুত্ব ও প্রশাসনিক ভারসাম্য: পূর্বেই বলা হয়েছে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা (বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা) বৈশ্বিক মানদণ্ডে উপনীত হতে তাদের সংগ্রাম চালিয়ে গেলেও ঈপ্সিত ফললাভে আজ অব্দি সক্ষম হয় নি। বৈশ্বিক র্যাংকিং এ ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় স্থান করে নিতে পারে নি। যদিও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় তা করতে পেরেছে। তাই উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার মান যথাযথ রাখাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিৎ জ্ঞান সৃজন এবং বিতরণ। এজন্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা কর্ম পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য তহবিল বরাদ্দ করা হয় বটে কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এখনই সময় শিক্ষার মান উন্নয়নের দিকে দৃষ্টিপাত করা আর শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য সর্বপ্রথম যে বিষয়টি দরকার তা হলো সুষ্ঠু পরিকল্পনা। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য যা প্রয়োজন তা যথাসময়ে সম্পন্ন করতে হবে। শিক্ষার মান বজায় রাখতে কোচিং সেন্টারকে প্রাধান্য না দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এর উপযোগী করে তুলতে হবে। উচ্চশিক্ষা সর্বজনীন হওয়া উচিৎ নয়। উচ্চশিক্ষা হবে মেধাভিত্তিক। জ্ঞান সৃজন যার অন্যতম লক্ষ্য। তাই অযথা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা না বাড়িয়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।
শিক্ষা–বাণিজ্য ও মান নিয়ন্ত্রণ: সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যত্রতত্র স্কুল স্থাপন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ও পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই বিভাগ খোলা, অতিরিক্ত টিউশন ফি নির্ধারণ—এসব নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষা একটি সামাজিক দায়িত্ব হলেও বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রে বাজারনির্ভর প্রবণতার দিকে যাচ্ছে। খসড়া আইনে মান নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে, তবে শিক্ষা–বাণিজ্য রোধে স্বচ্ছ অনুমোদনের প্রক্রিয়া, ফি নির্ধারণে নীতিমালা ও নিয়মিত মূল্যায়ন কাঠামো আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। শিক্ষা যদি বিনিয়োগ হয়, তবে সেটি কেবল আর্থিক নয়—নৈতিক ও সামাজিক বিনিয়োগও।
কোচিং সেন্টার নিয়ন্ত্রণ: শ্রেণীকক্ষের পড়াশুনার ঘাটতি পূরণের জন্যে কোচিং সেন্টারের প্রবর্তন। স্কুল কলেজের শিক্ষকরাও এগুলোর সাথে অনৈতিকভাবে জড়িয় পড়েছেন। এ ব্যাপারে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও নির্দেশনা প্রয়োজন। বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, সার্টিফিকেট জালিয়াতি, ছাত্রছাত্রীদের নিকট থেকে মাত্রতিরিক্ত টাকা আদায়সহ এগুলর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি রোধ: বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে লক্ষ্য করা যায় বাংলাদেশে দুর্নীতির ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় সংস্থাগুলোর মধ্যে শিক্ষাবিভাগ অন্যতম। সরকারকে এই অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করতে হবে এবং শিক্ষা বিভাগ থেকে দুর্নীতির মূলোতপাটন করতে হবে। নামে মাত্র পাশ আর ডিগ্রি সার্টিফিকেট নিয়ে শিক্ষিত বেকার তৈরি হয় শিক্ষিত জাতি নয়। এই কাজ দুর্নীতির নামান্তর। তাই এই বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষার চাহিদার পরিবর্তন হতে থাকে। বর্তমান যেহেতু তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর যুগ তাই শিক্ষা ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্প্রসারণশীল হলেও শিক্ষার গুণগত মানের ক্রমাগত অবনতি লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের গভীরতা কতটুকু হচ্ছে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। নকল প্রবণতা বর্তমানে বহুল আলোচিত বিষয় এছাড়া পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, সার্টিফিকেট জালিয়াতি করার মতো খারাপ কাজও করা হয় এগুলো শিক্ষাকে একটা ব্যবসায় পরিণত করছে।
শিক্ষা আইন, ২০২৬ এর চ্যালেঞ্জসমূহ
নূতন সরকার এই আইন অনুমোদন ও এর ধারাসমূহ বাস্তবায়নের দিকে এগোবেন নাকি বিদ্যমান ব্যবস্থাকে অধিকতর নিবিঢ় পরীবিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষা বিভাগে সুশাসন নিশ্চিত করবেন তা গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করার সময় এসেছে বলে মনে হয়। উপরে শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে মানের নিন্মগামীতার যে কথা বলা হয়েছে তা নিরসনের জন্যে নূতন আইনের প্রয়োজনের চেয়ের ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানো অধিকতর প্রয়োজন বলে মনে হয়। উদাহরণ হিসেবে বলছিঃ ১। আমাদের প্রাথমিক পাশ (৫ম শ্রেণী) ছাত্রছাত্রীদের অংক ও ভাষাজ্ঞান ভারত ও শ্রীলংকার একই ক্লাশের ছাত্রছাত্রীদের সমান কেন নয়? ২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় শতকরা ৯০-৯৩ জন ছাত্রছাত্রী ফেল করে কিজন্যে? ৩। বৈশ্বিক র্যাংকিং এ বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও কেন ৫০০ এর মধ্যে আসতে পারে না কেন?
আইন প্রণয়ন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এ সব প্রশ্নের উত্তরের জন্যে আমাদের শিক্ষা প্রশাসনের সাথে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ।
খসড়া শিক্ষা আইন, ২০২৬ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। এতে সমন্বয়ের চেষ্টা আছে, কাঠামো আছে, ভবিষ্যতের ইঙ্গিতও আছে। তবে শিক্ষাকে আরও স্পষ্টভাবে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা, শিক্ষা–বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা, এমপিও প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা জোরদার করা, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের মান উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর সুযোগ বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎমুখী দক্ষতা সংযোজন-এসব করলে এটি সত্যিকার অর্থে পরিপূর্ণ ও টেকসই হবে। পরিমার্জনের মধ্য দিয়ে এটি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি মানবিক, অংশগ্রহণমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী আইনি ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো পরিবর্তনের সুযোগ অতীতে বহুবার এসেছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময় যেমন একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছিল, তেমনি ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণ–অভ্যুত্থানের পরও আমরা গুণগত পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছি। অনেকে বলছেন, ২০২৪ সালের পালাবদলে অনেক ভিন্ন মাত্রা রয়েছে, এবং এই পরিবর্তনের ধারা থেকেই অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি শিক্ষা ক্ষেত্রেও সংস্কার আনার দাবি জোরদার হয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থার এই সাধারণীকরণের প্রবণতা নীতিনির্ধারকদের শিক্ষা বিষয়ে দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ ধারণায় পরিচালিত করেছে, ফলে সঠিক কর্মপন্থা বা পরিবর্তনের পদক্ষেপ চিহ্নিত করতে তারা পিছিয়ে থেকেছে। শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় নারী, ধর্ম, বিবর্তনবাদ, রাষ্ট্রচিন্তায় ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি, মানবসভ্যতার বিবর্তন, ইত্যাদি বিষয় কিভাবে পড়ানো হবে এবং কোন আদর্শের আলোকে ব্যাখ্যা করা হবে—এসব ক্ষেত্রেও শাসকগোষ্ঠীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি অনুসৃত হয়েছে।
এ ছাড়াও সমাজে নানা মতাদর্শ, দর্শন ও বিশ্বাসের বিভাজন তৈরি হয়েছে, যা পাঠ্যসূচির বিষয়বস্তুর গ্রহণ-বর্জন নির্ধারণে দ্বিধা ও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এর ফলে আমরা আজ অব্দি কোনো সর্বজনীন ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা কাঠামো দাঁড় করাতে পারিনি। শিক্ষার এই দুর্বল জনভিত্তি নানা স্তরে বিভাজন তৈরি করেছে, যা যুগোপযোগী ও সহায়ক শিক্ষাব্যবস্থার পথে বড় বাধা হয়ে আছে। অথচ শিক্ষা জাতি গঠনের প্রধান ও প্রাথমিক পদক্ষেপ, যা হতে হবে সময়োপযোগী, সুচিন্তিত ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালিত। গত ৫৪ বছরে আমরা এ কাজে বারবার ব্যর্থ হয়েছি।
এই প্রেক্ষাপটে বিশেষত ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আলোকে শিক্ষার মতো একটি বৃহৎ বিষয়কে বাস্তবভিত্তিক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম এবং নিজস্ব সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রণীত একটি রূপকল্প তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নানা রাষ্ট্র শিক্ষার উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছেছে। তাদের উন্নয়ন নীতিমালা ও কর্মপন্থা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আমাদেরও রয়েছে।
শিক্ষা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো—এগুলোই শিক্ষাব্যবস্থার মূল নিয়ামক। কিন্তু বাস্তবে চিত্রটি জরাজীর্ণ, বিবর্ণ ও দুঃখময়। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত এ অবস্থা বিদ্যমান। গবেষণা, প্রযুক্তি ব্যবহার, প্রশিক্ষণ, সময়মতো পদোন্নতি, নতুন পদ সৃজন, অবকাঠামো সংস্কার ও বাজেট বৃদ্ধি—এসবের বদলে দেখা যায় বদলি বাণিজ্য, পদোন্নতির বিলম্ব, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের ঘাটতি, ত্রুটিপূর্ণ পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, প্রযুক্তিভিত্তিক জ্ঞানের অভাব, উচ্চশিক্ষায় নেতৃত্ব দিতে সক্ষম শিক্ষা ক্যাডারের অবমূল্যায়ন, অন্যান্য ক্যাডারের আধিপত্যসহ নানা সমস্যা।
শিক্ষার্থীদের অবস্থা আরও করুণ। তারা সনদনির্ভর শিক্ষায় আবদ্ধ, যা কর্মসংস্থান, পেশাগত উন্নয়ন বা উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে সামান্যই অবদান রাখছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও গবেষণার পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই, নেই উদ্ভাবন ও বাস্তবভিত্তিক পাঠ্যক্রম। সার্বিকভাবে দেখা যায়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যক্তি বিকাশ ও মানবসম্পদে পরিণত হওয়ার বদলে কেবল বেঁচে থাকার জন্য প্রহসনমূলক স্বীকৃতি অর্জনই যেন লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষা নিয়ে ভাবনা বা নীতিমালা তৈরি হয়েছে বটে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষা কমিশন ও নীতিমালাগুলো প্রাসঙ্গিকতা থাকা সত্ত্বেও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তাই এখন বাস্তবভিত্তিক আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষা সংস্কারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়ন জরুরি। নবনির্বাচিত বি এন পি সরকার এ বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে জাতি আশা করে।
উপসংহার
শিক্ষা যদি হয় জাতির মেরুদন্ড তাহলে শিক্ষার উপর আমাদের সর্বাধিক গুরত্ব দিতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই সময়ে আমদের শিক্ষা ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করতে হবে। চিন্তা করতে হবে, বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে আমাদের অবস্থান। আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট তো আছেই। সে লক্ষে আমাদের শিক্ষা, শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে লক্ষ্যভিত্তিক করে সাজানোর সময় এসেছে।
সর্বস্তরে লক্ষ্যভিত্তিক গুণগত শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্যে অগ্রাধিকারভিত্তিতে নিন্মোল্লেখিত বিষয়গুলো বি এন পি সরকার বিবেচনা করতে পারেনঃ
শিক্ষাখাতে ব্যয় বৃদ্ধি করা। জিডিপি’র ২.৫% - ৩.০০% করা যায় কিনা, ( চলতি অর্থবছরে শিক্ষাখাতে ব্যয় জিডিপি’র ১.৮৩%); এবং বার্ষিক বাজেটের ১৬-১৮% করা। ইউনিসেফ এর মতে জিডিপি’র ৬% এবং বাৎসরিক বাজেটের ২০% শিক্ষা খাতে খরচ করা উচিৎ।
স্কুল কলেজ মাদ্রাসা পর্যায়ের গ্রন্থাগার পরিচালনার পরিবীক্ষণ পদ্ধতি নিবিঢ়তর করা; এমপিও’ভুক্তির সময়ে প্রতিষ্ঠান কতৃপক্ষকে লিখিত নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে যে তারা যথানিয়মে গ্রন্থাগার পরিচালনা করবেন। সেই সাথে প্রতিটি গ্রন্থাগারে ইন্টারনেট সুবিধাসন্বলিত কম্পিউটার সরবরাহ করা।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রম বৃদ্ধির জন্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা; বৈশ্বিক র্যাংকিং এ যথাস্থানে (উচ্চস্থান) অধিষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ্যে প্রত্যেক
বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের নিয়ে টার্মস অব রেফারেন্স সহ একটি সেল তৈরি করা এবং এর কার্যক্রম পরিবীক্ষণ করা; লক্ষ্যভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম (ওবিই) বাস্তবায়নের মাধ্যমে গুণগত শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে সর্বাত্নক ব্যবস্থা গ্রহণ করা; শিক্ষাবিভাগের সকল পর্যায় থেকে দুর্নীতির উচ্ছেদ ঘটানো; এবং সর্বোপরি সমাজের বিদ্যুতসাহী ধনাঢ্য ব্যক্তিদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় সম্পৃক্ত করার কার্যক্রম গ্রহণ করা।
লেখক: উপদেষ্টা, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ ও প্রক্টর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি)
ই-মেইল: amatin@aub.ac.bd