সংসদ নির্বাচন ও বিএনপির ইশতেহারের গুরুত্ব
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের ৫১ দফার বিশদ নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। এবারের ইশতেহারের মূল দর্শন হচ্ছে “সবার আগে বাংলাদেশ’’, যার ভিত্তিতে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। রাজধানী ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে ৬ ফেব্রুয়ারি(২০২৬) বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার উন্মোচন করেন। ইশতেহারে দলটি মোট ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছে, যা সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। বিএনপির ভাষ্যমতে, এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়, বরং একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। দীর্ঘদিনের শাসনামলে তথাকথিত ‘ফ্যাসিবাদী’ শাসনে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার বিপন্ন হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিএনপি জনগণের ক্ষমতা পুনঃস্থাপনের অঙ্গীকার করছে। উল্লেখ্য, বর্তমান ড. ইউনূস সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন নির্বাচনে গত চারটি নির্বাচনের বিজয়ী দল আওয়ামী লীগ অংশ নিচ্ছে না (তাদের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় নিবন্ধন বাতিল হয়েছে)। ফলে নির্বাচনটি মূলত বিএনপি ও অন্য একটি ১১-দলীয় জোটের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হতে যাচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিএনপির ঘোষিত ইশতেহার দেশের রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে, কারণ এতে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গি ও অঙ্গীকারসমূহ উপস্থাপিত হয়েছে, যা ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিএনপির ইশতেহারে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি হলো- ১. ফ্যামিলি কার্ড ২. কৃষক কার্ড ৩. স্বাস্থ্য খাতে ১ লাখ কর্মী নিয়োগ ও সেবা-সংস্কার ৪. শিক্ষায় আনন্দময় ও দক্ষতাভিত্তিক সংস্কার ৫. তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন ৬. ক্রীড়া উন্নয়ন ও পেশাদারি ৭. পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা ৮. ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি উদ্যোগ ৯. ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ।
উপরোক্ত নয়টি ক্ষেত্র ছাড়াও বিএনপির পূর্ণাঙ্গ ইশতেহারে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও শাসনব্যবস্থার সংস্কার বিষয়ক আরো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি উল্লেখ করা হয়েছে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিসমূহ। ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্য পুনঃস্থাপনে উপ-রাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছে। একইসঙ্গে, প্রধানমন্ত্রী পদে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ (মোট ১০ বছর) দায়িত্ব পালন করতে পারবেন – সংবিধানে এমন সীমা আরোপের অঙ্গীকার এসেছে। সংসদীয় ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি ও দক্ষতা বাড়াতে একটি দ্বিতীয় কক্ষ (উচ্চকক্ষ বা সেনেট) প্রতিষ্ঠার কথাও ইশতেহারে উল্লেখ রয়েছে, যেখানে বিশেষজ্ঞ মতামত ও সব শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যাবে। আরও বলেছে, সংবিধানের বিতর্কিত ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ (যা দলীয় নির্দেশনার বাইরে সংসদ সদস্যদের ভোট দিতে বাধা দেয়) সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগ বৃদ্ধি করা হবে। সংসদে বিরোধী দল থেকে একজনকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আছে, যা সংসদীয় কর্মকাণ্ডে বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ এবং সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে শক্তিশালী করার ঘোষণাও ইশতেহারে রয়েছে। প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা খাতে জবাবদিহিতা বাড়াতে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, পুলিশ কমিশন ও লোকপাল (Ombudsman) প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণভাবে, ভবিষ্যতে সব নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে সংবিধানে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে বিএনপি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো একটি “ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’’ বা সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি, যা জাতীয় পুনর্মিলনের অংশ হিসেবে অতীতে সংঘটিত রাজনৈতিক নিপীড়ন, গুম, হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো অনুসন্ধান ও নিরসনে কাজ করবে। দক্ষিণ আফ্রিকা ও কানাডার মত দেশে অতীতের অন্যায়ের মীমাংসার জন্য এ ধরনের কমিশন ব্যবহৃত হয়েছে। বিএনপির ইশতেহারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে তারা প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে; সেই দর্শনের আলোকে এই সত্য ও পুনর্মিলন কমিশনের প্রস্তাব আনা হয়েছে, যাতে সরকারে এলে ভিন্ন ধরণের ঐক্যের রাজনীতি চর্চা এবং অতীতের ক্ষত নিরাময়ের উদ্যোগ নেওয়া যায়। একইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা রক্ষার্থে বাস্তব পদক্ষেপের অঙ্গীকার আছে: প্রকৃত শহীদদের তালিকা প্রণয়ন, পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্তকরণ এবং মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের কল্যাণে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধ ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের শহীদ ও বীরদের সম্মানে বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণ এবং যারা আন্দোলনে আহত বা অন্ধ হয়েছেন তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতিও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত আছে। এসব পদক্ষেপ বিএনপির অতীতের জাতীয় ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে সম্মান জানানো এবং ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আগ্রহকে তুলে ধরে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্যসহনশীলতা (zero tolerance) নীতি গ্রহণের ঘোষণা ইশতেহারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ হয়েছে। বিএনপি জানিয়েছে, তারা ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির সাথে কোনো আপস করবে না এবং সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে খোলা দরপত্র, তাৎক্ষণিক অডিট, কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন এবং পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ইশতেহার ঘোষণাকালে তারেক রহমান উল্লেখ করেছেন যে তাদের শাসনামলে বাংলাদেশকে “দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন’’ হওয়ার অবস্থান থেকে বের করে আনা গিয়েছিল এবং ভবিষ্যতে তারা পুনরায় দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বদ্ধপরিকর। সুশাসন নিশ্চিত করতে স্বাধীন বিচার বিভাগ গঠন এবং আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করার কথাও তিনি বলেছেন। সম্প্রতি এক জনমত জরিপেও দেখা গেছে যে দেশের ৬৭% মানুষ দুর্নীতিকেই সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন। কাজেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের এই অঙ্গীকার ভোটারদের কাছে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বার্তা বহন করছে।
সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বিএনপির ইশতেহারটি একদিকে সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন জীবন-জীবিকার সমস্যা সমাধানে তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান কিছু উদ্যোগ প্রস্তাব করছে (যেমন নগদ অর্থ সহায়তা, কৃষি ভর্তুকি, চাকরি সৃষ্টি), অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছে (যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সংবিধান সংস্কার, দুর্নীতি দমন)। এই দুটি দিক – জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার –কে একত্রে রেখে বিএনপি তাদের রাজনীতির একটি নতুন মডেল উপস্থাপন করতে চায়, যাকে তারা “নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি’’ বলছে।
বিএনপির এই নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার সময়কাল ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এর রাজনৈতিক গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় পর বিএনপি বাস্তব সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছে যে তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরতে পারে – বিশেষ করে এবারের নির্বাচনে ঐতিহ্যবাহী প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ নেই এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচন পরিচালনা করছে। সুতরাং, বিএনপির জন্য নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিকল্পনা জনগণের সামনে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এবং সেই কাজটিই এই ইশতেহারের মাধ্যমে করা হয়েছে। ইশতেহারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি দেশের বিদ্যমান কোনো না কোনো সমস্যার প্রতি সরাসরি সাড়া দেয়: যেমন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও দরিদ্রের কষ্টের বিপরীতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকের দুরবস্থার বিপরীতে কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য খাতে অপ্রতুলতা ও দুর্নীতির বিপরীতে বৃহৎ নিয়োগ ও সংস্কার, শিক্ষার গুণগত সমস্যা সমাধানে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, বেকারত্ব মোকাবিলায় কর্মসংস্থান উদ্যোগ, সামাজিক অসহিষ্ণুতা মোকাবিলায় ধর্মীয় সম্প্রীতির উদ্যোগ, পরিবেশ সংকট মোকাবিলায় পরিবেশ প্রকল্প, এবং বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ডিজিটাল সংযোগ বৃদ্ধির পরিকল্পনা। অর্থাৎ, ইশতেহারটি সামগ্রিকভাবে দেশের সামাজিক- নৈতিক সমস্যা এবং রাজনৈতিক শাসন-সংকটের সমন্বিত সমাধানপথ একসাথে প্রস্তাব করছে।
এই প্রতিশ্রুতিগুলোর গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে যে জনগণ এখন রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে সুশাসন ও সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ভোটারদের অগ্রাধিকারের তালিকায় দুর্নীতি, বেকারত্ব, সেবা থেকে বঞ্চনা ইত্যাদি শীর্ষে রয়েছে এবং তারা এমন নেতৃত্ব চায় যারা বাস্তবে জনকল্যাণে কাজ করবে। বিএনপির ইশতেহার ঠিক এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই সাজানো হয়েছে, যা জনপ্রত্যাশার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। উদাহরণসরূপ, দুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি (যেমন স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, পূর্ববর্তী সরকারের সময়কার কেলেঙ্কারির তদন্ত) জনগণের আস্থার সংকট দূর করতে সহায়ক হতে পারে। আবার মিড-ডে মিল বা নগদ সহায়তার মতো উদ্যোগগুলো সরাসরি ভোটারদের জীবনমান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বহন করে, যা ভোটারকে আকর্ষণ করার একটি কার্যকর উপায় হতে পারে।
ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান ও আদর্শের প্রতিফলনও ঘটায়। উদাহরণসরূপ, সংবিধানে “আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’’ বাক্যটি ফেরত আনার কথা বলে দলটি তাদের ইসলামপন্থী-জাতীয়তাবাদী ভাবধারার প্রতি অটল থাকার বার্তা দিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা রক্ষণশীল ও ধর্মপ্রাণ ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান থেকে এ ধরনের বাক্যাংশ বাদ দেওয়ার পর যে মতবিভেদ সৃষ্টি হয়েছিল, সেই প্রেক্ষাপটে এই প্রতিশ্রুতি তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যদিকে, সব ধর্মের নেতাদের জন্য ভাতা ও কল্যাণের ঘোষণার মাধ্যমে বিএনপি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করতেও প্রয়াস পাচ্ছে যে, তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী। একইভাবে, “সবার আগে বাংলাদেশ’’ (Bangladesh First) শ্লোগান তুলে ধরে দলটি জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চে রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইশতেহারে বলা হয়েছে, অন্য দেশকে বন্ধু ভাববে কিন্তু কারো করুণায় মাথা নত করবে না – জাতীয় স্বার্থই সর্বাগ্রে দেখবে। এটি ইঙ্গিত করে যে বিএনপি পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্যমূলক ও স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ অবস্থান নেবে, যা পার্শ্ববর্তী দেশের প্রতি বর্তমান সরকারের নীতির সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
ইশতেহারের আরেকটি বড় প্রভাব হলো এটি নির্বাচনী আলোচনার এজেন্ডা নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে। বিএনপির ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলোর জবাবে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোকেও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, বিএনপি যখন ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নগদ সহায়তার কথা বলছে, তখন অন্য দলগুলোও ভিন্ন উপায়ে গরিবের সহায়তায় কী করবে তা প্রতিশ্রুতিতে আনতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। আবার বিএনপি যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলছে, তখন প্রতিপক্ষ জোটকেও নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যবস্থা নিয়ে নিজেদের মতামত ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে। এভাবে বিএনপির ইশতেহার ইতোমধ্যে নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং ভোটারদের কাছে মূল ইস্যুগুলোতে দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সাহায্য করছে।
তবে ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে। প্রশাসনিক সংস্কারগুলো (যেমন স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, পুলিশ কমিশন, লোকপাল) বাস্তবায়ন করতে গেলে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোর বাধার মুখোমুখি হতে হবে। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল; হঠাৎ ক্ষমতায় এসে বিএনপির পক্ষে সেই যন্ত্রকে সংস্কারমুখী করা কঠিন চ্যালেঞ্জ হতে পারে, যদিও প্রবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে অসম্ভব নয়। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন ও অন্যান্য সাংবিধানিক সংশোধনী আনতে সংসদে যথেষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন, যা নির্বাচনে জয়লাভের পরেই নিশ্চিত হবে। কাজেই অনেক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে নির্বাচনী ফলাফল ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর।
এদিকে, ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো জনমনে কতটা প্রভাব ফেলছে তার কিছু ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচন-পূর্ব জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ব্যাপক সংখ্যক ভোটার – বিশেষ করে তরুণ ও শহুরে মধ্যবিত্তরা – বিএনপির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। একটি জরিপে উঠে এসেছে যে পূর্বে আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন এমন ভোটারদের প্রায় ৪৮% এবার বিএনপিকে ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন। এর পেছনে বিএনপির জনপ্রিয় আন্দোলন যেমন ভূমিকা রেখেছে, তেমনি তাদের ঘোষিত কর্মসূচিগুলোও নতুন আকর্ষণ তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বিশেষ করে “দুর্নীতি ও দুঃশাসনের অবসান’’ এবং “ভোটের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা’’র বার্তা সাধারণ মানুষের সাথে গভীর সংযোগ তৈরি করেছে। তাছাড়া বহু তরুণ ভোটার – যারা আগে কখনও ভোট দেননি বা এবারই প্রথম ভোট দেবেন – তাদের অনেকেই বিএনপি বা জামায়াত-সমর্থিত জোটের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন বলে সমীক্ষায় উঠে এসেছে। এসব লক্ষণ ইঙ্গিত করে যে বিএনপির ইশতেহার ও প্রচারণা তরুণ প্রজন্মেও প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে, যাদের জন্য চাকরি ও ডিজিটাল সুযোগের প্রতিশ্রুতিগুলো সরাসরি আকর্ষণীয় হিসেবে কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বিএনপির ইশতেহার কিছু বার্তা প্রেরণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের সংযোগ বাড়ানোর অঙ্গীকার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। আবার গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিগুলো পশ্চিমা দেশ ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হবে। গত এক যুগের নির্বাচনে অনিয়ম ও গণতন্ত্রহীনতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অনেক আন্তর্জাতিক পক্ষ বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল; বিএনপি ক্ষমতায় এলে আইনের শাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার রক্ষায় মনোযোগী হবে – ইশতেহারের এমন অঙ্গীকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও আশ্বস্ত করতে পারে। তবে প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিতও ইশতেহারে রয়েছে। যেমন “বন্ধু হবে, কর্তা হবে না’’- নীতির কথা বলা হয়েছে – ইঙ্গিত যে বিএনপি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে চায় যাতে বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থ রক্ষিত হয়। বিএনপি নেতারা বলেছেন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে বের করে আনতে হবে – যা আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
গবেষণা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বিএনপির ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারটি সাম্প্রতিক বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এতে একদিকে জনগণের তাত্ক্ষণিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় – যেমন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, কৃষক-দরিদ্রের দুর্দশা – সমাধানের জন্য স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের রূপরেখাও তুলে ধরা হয়েছে। ইশতেহারটি দলটির আদর্শিক অবস্থান (জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা) এবং প্রায় দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও আত্মসমালোচনার প্রতিফলনও উপস্থাপন করেছে। স্পষ্ট প্রতীয়মান যে বিএনপি জনগণের আস্থা অর্জন করতে চায় একটি “ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতি’’ উপস্থাপনের মাধ্যমে, যেখানে প্রতিশোধ নয় – পুনর্মিলন, ক্ষমতা নয় – অধিকার, এবং লুটপাট নয় – উৎপাদন হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি।
নির্বাচনী রাজনীতিতে ইশতেহার প্রণয়ন অনেক সময়ই দলের রুটিন কার্যক্রম মনে হলেও বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপির এই ইশতেহার জনমনে আলোড়ন তুলেছে এবং নীতিগত বিতর্কের সূচনা করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের নির্বাচন আদর্শিক বিষয়ের চেয়ে সুশাসন ও জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতির ওপর বেশি নির্ভরশীল হবে। সে ক্ষেত্রে বিএনপির দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ভোটারদের মনোজগতে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নির্বাচনের ফলেই প্রতিফলিত হবে। অবশ্য প্রশ্ন থেকেই যায় – ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা বাস্তবায়নযোগ্য এবং কত দ্রুত বাস্তবে ফল দেওয়া সম্ভব? অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনী ইশতেহারের অনেক প্রতিশ্রুতি পরবর্তীতে উপেক্ষিত হয় বা বাস্তবায়নে গতি পায় না। এবার যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তবে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে জনগণের উচ্চাশা পূরণে ইশতেহারের অঙ্গীকারগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়া। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ এবং বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোর প্রতিরোধ মোকাবিলা করে সত্যিই যদি তারা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, এক লাখ নিয়োগ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সত্য কমিশন গঠন ইত্যাদি বাস্তবায়ন করতে পারে – তবে তা বাংলাদেশে একটি নতুন যুগের সূচনা করবে। আর যদি প্রতিশ্রুতিগুলো কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার জন্য তাদেরকেও অতীতের সরকারগুলোর মতো সমালোচনার মুখে পড়তে হবে।
সব মিলিয়ে, বিএনপির এই নির্বাচনী ইশতেহার ক্ষমতাসীন দলের বিকল্প হিসেবে নিজেদেরকে জনগণের সামনে উপস্থাপন করার একটি সুসংগঠিত প্রচেষ্টা। এতে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামীর জন্য একটি পরিশীলিত রূপরেখা দেওয়ার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় মানবিকতা, ন্যায় ও অন্তর্ভুক্তির যে অঙ্গীকার ইশতেহারে করা হয়েছে, তা যদি বাস্তবায়িত হয় তবে বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে নতুন করে পথচলা শুরু করতে পারে। এখন ভোটাররা বিএনপি’র পক্ষে রায় দিয়ে ঠিক করবেন, এই প্রতিশ্রুতিগুলোতে তারা আস্থাবান এবং আগামী দিনে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাবে ‘বিএনপি’।
লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়