২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২২:০৯

ডাকসুর চার মাসের জবাবদিহিতা: জাতীয় রাজনীতির ছোট মডেল

ডাকসুর চার মাসের জবাবদিহিতা জাতীয় রাজনীতির ছোট মডেল  © সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে দুর্লভ যে বিষয়টি, তা হলো কাজের হিসাব দেওয়া। নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি থাকে ঢেউয়ের মতো, কিন্তু নির্বাচনের পর সেই প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি জানার সুযোগ সাধারণত আর থাকে না। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) চার মাসের কার্যক্রমের লিখিত ও প্রকাশ্য প্রতিবেদন কেবল একটি ছাত্রসংগঠনের উদ্যোগ নয়—এটি রাজনীতির সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

ডাকসু নেতৃত্ব তাদের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র চার মাসের মাথায় যে ২২৫টি উদ্যোগ ও কার্যক্রমের হিসাব জনসমক্ষে তুলে ধরেছে, সেটি মূলত জবাবদিহিতার একটি কাঠামোগত অনুশীলন। এখানে শুধু সাফল্যের তালিকা নয়, কাজের ধরন, ক্ষেত্র, ব্যয় ও অগ্রাধিকারের একটি চিত্রও হাজির করা হয়েছে। ছাত্ররাজনীতিতে যেখানে বহু সময়ই ক্ষমতা ভোগই মুখ্য হয়ে ওঠে, সেখানে এই ধরণের রিপোর্টিং একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।

এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় দিক হলো, ক্ষমতা মানেই দায়বদ্ধতা—এই ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।

ডাকসুর রিপোর্টিং পদ্ধতি দেখিয়ে দেয়, জবাবদিহিতা মানে কেবল নির্বাচন নয়; বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। জাতীয় রাজনীতিতে যেখানে বিরোধী দল দুর্বল, সংসদ কার্যকর নয় এবং নাগরিক প্রশ্নের জায়গা সীমিত—সেখানে এ ধরনের স্বেচ্ছা জবাবদিহিতা একটি বিকল্প গণতান্ত্রিক অনুশীলন হতে পারে।

ডাকসু কার্যক্রম প্রতিবেদনে দেখা যায়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, আবাসন, সংস্কৃতি, মানসিক স্বাস্থ্য, নারী শিক্ষার্থীদের কল্যাণসহ বহুমাত্রিক বিষয়ে পরিকল্পিত হস্তক্ষেপের চেষ্টা হয়েছে। এগুলোর সবকিছু সফল হয়েছে—এমন দাবি করাই উদ্দেশ্য নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, কী করা হয়েছে, কী করা যায়নি এবং কী করার প্রক্রিয়ায় আছে—তা প্রকাশ্যে বলা হয়েছে। এখানেই জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে তুলনার জায়গাটি তৈরি হয়।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ, মন্ত্রণালয় কিংবা রাজনৈতিক দলগুলো যদি বছরে অন্তত একবার এমন কার্যক্রমভিত্তিক পারফরম্যান্স রিপোর্ট জনগণের সামনে হাজির করত, তাহলে রাজনীতির ভাষা বদলে যেত। উন্নয়ন আর স্লোগানের বদলে আলোচনায় আসত—কোন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে? ,কোনটি হয়নি?, কেন হয়নি?, কার দায় কতটুকু?

ডাকসুর রিপোর্টিং পদ্ধতি দেখিয়ে দেয়, জবাবদিহিতা মানে কেবল নির্বাচন নয়; বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। জাতীয় রাজনীতিতে যেখানে বিরোধী দল দুর্বল, সংসদ কার্যকর নয় এবং নাগরিক প্রশ্নের জায়গা সীমিত—সেখানে এ ধরনের স্বেচ্ছা জবাবদিহিতা একটি বিকল্প গণতান্ত্রিক অনুশীলন হতে পারে।

ডাকসুর চার মাসের কার্যক্রম মূল্যায়ন ও প্রকাশ্য প্রতিবেদন কেবল একটি ক্যাম্পাস ইভেন্ট নয়; এটি জাতীয় রাজনীতির জন্য একটি মাইক্রো মডেল। যদি রাষ্ট্রের বড় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই সংস্কৃতি গ্রহণ করে, তবে রাজনীতিতে বিশ্বাসের সংকট কিছুটা হলেও কাটতে পারে।

অবশ্যই, ডাকসুর কার্যক্রম সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কিছু প্রকল্পের অগ্রাধিকার, ব্যয়ের স্বচ্ছতা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিন্তু গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই—প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকলে উত্তর দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও তৈরি হয়। ডাকসু সেই দরজাটি অন্তত খুলে দিয়েছে।

এই কারণেই বলা যায়, ডাকসুর চার মাসের কার্যক্রম মূল্যায়ন ও প্রকাশ্য প্রতিবেদন কেবল একটি ক্যাম্পাস ইভেন্ট নয়; এটি জাতীয় রাজনীতির জন্য একটি মাইক্রো মডেল। যদি রাষ্ট্রের বড় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই সংস্কৃতি গ্রহণ করে, তবে রাজনীতিতে বিশ্বাসের সংকট কিছুটা হলেও কাটতে পারে।

পরিশেষে বলি, গণতন্ত্র টিকে থাকে ব্যালট বাক্সে নয়, গণতন্ত্র টিকে থাকে জবাবদিহিতায়। ডাকসু সেই কথাটিই আমাদের আবার মনে করিয়ে দিয়েছে। এখন শুধু এই ধারা জারি রাখার পালা...

লেখক: কেফায়েত শাকিল, সিনিয়র রিপোর্টার, বাংলাভিশন [kafayet.chowdhury@gmail.com]