ডাকসু নির্বাচন: অনেক হারানোর গল্প
দীর্ঘ আটাশ বছর পর আসছে ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। এ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে প্রার্থীসহ সকল শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরাজ করছে উৎসব-উত্তেজনা। তবে সবচেয়ে সুখকর যে দৃশ্য, যা কখনও কল্পনাই করা যেত না, তা হলো মধুর ক্যান্টিনে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের পাশে ছাত্রদলসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের সভা করা।
গত ৪ মার্চ মধুর ক্যান্টিনে গিয়ে এই বিরল দৃশ্যের দেখা মেলে। একদিকে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ মিটিং করছেন, এরই উল্টোদিকে ছাত্রদলের নেতারা মিটিং করছেন। অবিশ্বাস্য হলেও মধুর ক্যান্টিনের চেহারা এখন প্রতিনিয়তই এমন। গণতন্ত্রের জন্য এটা খুবই সুখকর। ডাকসু নির্বাচনে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাওয়া বলতে এটুকুই যে, সব দলের একটা সহাবস্থান দেখা যাচ্ছে। এজন্য ছাত্রলীগকে ধন্যবাদ জানাই।
তবে কিছু প্রাপ্তি যেমন যোগ হচ্ছে তেমনি অনেক হারানোর গল্পও রয়েছে ডাকসু নিয়ে। কী হারিয়েছি আমরা এই আটাশ বছরে? হারিয়েছি হয়তো অনেক কিছুই। তবে এরমধ্যে দুটি বিষয় উল্লেখ করতেই হয়।
প্রথমত, দীর্ঘদিন ডাকসু না থাকায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একটি বঞ্চনার উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। গত মাসেই ফাল্গুনের ঝড়বৃষ্টি চলে গেল। একটি ভিডিও ভাইরাল হয় ঝড়ের পর। ভিডিওতে দেখা যায়, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের বারান্দায় অনেক শিক্ষার্থী ঝড়বৃষ্টি থেকে বাঁচতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে। কিন্তু বাতাসের দাপটে ঠিকই বৃষ্টির পানি জাপটে বারান্দার ভেতরে প্রবেশ করছে। ছাত্রদের এমন অসহায় অবস্থা দেখে অনেকেই সহানুভূতি দেখাচ্ছেন। অনেকেই আবার এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দুষছেন। কেউ কেউ আবার বলছেন, একদিকে ছাত্ররা আবাসন সংকটে ভুগছে অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের জন্য নির্মিত হচ্ছে বিশ তলাবিশিষ্ট বহুতল ভবন। বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা প্রাণ তারা ঝড়বৃষ্টিতে কষ্ট করছে। ডাকসু থাকলে এমন দৃশ্য হয়তো আমাদের দেখতে হতো না।
কলাভবনের বহু বিভাগে শ্রেণিকক্ষের অভাবে ক্লাস বাতিল করা হয়। অন্য বিভাগের ক্লাসরুম ভাড়া নেওয়ার মত করেও ব্যবহার করতে হয়। অন্য বিভাগের কোনও রুম না পেলে অনেক শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার থিয়েটার ভবনে ক্লাস তুলে নিয়ে যান। কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ না। লেকচার থিয়েটারের কিছু রুমের যাচ্ছে-তাই অবস্থা। কিছু রুমে বৈদ্যুতিক পাখা নেই। পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। কিছু রুম আবার এতই সংকীর্ণ যে, শিক্ষার্থীর পরিমাণ একটু বেশি হলেই গাদাগাদি করে বসতে হয়। অনেক সময় দাঁড়িয়ে থেকেও ক্লাস করতে হয়।
প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটে শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ থাকে তলানিতে। সর্বশেষ ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরের জন্য শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ২.১২ শতাংশ। ডাকসু থাকলে এই হার অনেক বেড়ে যেত তা হয়তো বলা যাবে না, তবে শিক্ষার্থীরা এতো সহজে বিষয়টি মানত না।
দ্বিতীয়ত, ২৮ বছর ডাকসু না থাকাতে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাতীয় রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সারাজীবনে কোনও ধরণের রাজনীতির চর্চা নেই কিন্তু শেষ বয়সে এসে তিনি সাংসদ হয়ে বসে আছেন। ডাকসুর দীর্ঘদিনের অচলায়তনের ফলেই এমনটি ঘটেছে। এর ফলে রাজনীতি চলে গেছে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতের মুঠোয়। এজন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে কারা? নিঃসন্দেহে দেশের জনগণ। কারণ, দেশের প্রান্তিক জনগণের সাথে তাদের যোগাযোগ কম। যে গাছের শেকড় অত্যন্ত দুর্বল তাতে যতই পানি ঢালুন, সেই গাছ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না তা দিনের আলোর মত ধ্রুব সত্য। অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে ছাত্র সংগঠনগুলো কি যোগ্য নেতৃত্ব উৎপাদন করতে পারছে না। পারছে কি পারছে না আমি সে তর্কে যেতে চাই না। একটা কথাই বলতে চাই, ‘সিলেক্টেড’ আর ‘ইলেক্টেড’ দুইটার অবস্থান দুই মেরুতে। দুটোর গুণগত মান কখনও এক হতে পারে না।
এখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি কথা শোনা যাচ্ছে, সংগঠন নয় ‘ব্যক্তি’ প্রাধান্য পাবে এবারের ডাকসু নির্বাচনে। যার ভাবমূর্তি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভালো, যার গ্রহণযোগ্যতা বেশি, যে ইতিবাচকভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে সেই বিজয়ী হবে। কোনও আলাদা প্যানেল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। যেই নির্বাচিত হোক, সাধারণ শিক্ষার্থীদের চাওয়া থাকবে, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যেন শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ করেন।
মো. সাঈদ হোসেন ইরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী,
সাহিত্য সম্পাদক পদপ্রার্থী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ছাত্র সংসদ