০৭ মার্চ ২০১৯, ১২:৩৪

সহজ কথায় কাশ্মীর সংকট

ব্যাপারটা সহজ ভাষায় তুলে ধরতে চাই। তাই শুরুতেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের সব ইতিহাস বাদ দিয়ে রাখলাম। অবশ্য ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস। আমি মনে করি আগের ঐতিহাসিক তিক্ততা এড়িয়েও কাশ্মীর সংকটের সমাধান সম্ভব ছিল। একটা গণভোটই তো প্রয়োজন ছিল, তাইনা? সব জায়গায় ব্রিটিশদের না টানলেও চলে। সব দোষ ‘ইহুদি-নাসারাদের’ কাঁধে চাপিয়ে হাত ধুয়ে বসে থাকলে চলে না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বের ক্ষমতা কাঠামো বদলে দিয়েছিল। পরাশক্তি জার্মানির পতন হলো। তার জায়গায় নয়া পরাশক্তি আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান নজর কাড়ল সবার। বিজয়ী পক্ষের সহযাত্রী হিসেবে ভাগ্য বদলানোর কথা ছিল ব্রিটিশদেরও। কিন্তু যুদ্ধের ব্যাপক ক্ষয়- ক্ষতিতে ব্রিটেনের আর্থিক অবস্থা হয়ে পড়ে নড়বড়ে। প্রধানমন্ত্রী এটলি সংসদকে জানালেন, ‘আর পারছিনা, খরচ কমাতে হবে।’

ব্রিটেনের ব্যয় সংকোচন নীতির প্রথম আঘাতটা এলো কলোনি শাসন ব্যবস্থার উপর। অবশ্য এমন আঘাত নিজ থেকে আনতে চায়নি ব্রিটেন। তার দরকার পড়েছিল অর্থের। সাহায্য চাওয়া হয় নয়া পরাশক্তি আমেরিকার কাছে। রাজি হয় আমেরিকা,তবে পরামর্শ আসে ‘কলোনিগুলো হস্তান্তর করে দিন।’ তাই হলো। পূর্ণভাবে না হলেও কলোনি হস্তান্তর শুরু হলো

লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনকে দায়িত্ব দেওয়া হলো কংগ্রেস আর মুসলিম লীগ নেতাদের এক টেবিল বসিয়ে ভারতের হস্তান্তর পর্ব সেরে ফেলতে। ভারত-পাকিস্তানকে পুরো স্বাধীন করে দেওয়ার পরিবর্তে বৃটিশ পার্লামেন্টের নির্দেশনা ছিল ‘স্বায়ত্তশাসিত উপনিবেশ’ বানাও। এর বাইরে কাশ্মীরের মত যেসব করদ রাজ্য ছিল তাদের শাসকদের বলা হলো, ইচ্ছেমত স্বাধীন থাকতে নতুবা ভারত-পাকিস্তানের যেকোন একটি বেছে নিতে।

প্রথম অপশনটি বেছে নিলেন কাশ্মীরের রাজা হরি সিং। কিন্তু বিপত্তি অনিবার্য ছিল কারন কাশ্মীরে সংখ্যাগুরু হলেন মুসলমানরা, তাদের শাসক একজন সংখ্যালঘু রাজা! ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের মতই আরেকটি আন্দোলন দেখা দিল- ‘কাশ্মীরকো ছোড় দো।’ তবে তা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নয়,কাশ্মীরের রাজা হরি সিং এর বিরুদ্ধে। তারা বিদ্যমান ডোগরা রাজতন্ত্রের বিলুপ্তি চাইলেন। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন শেখ আব্দুল্লাহ। মজার ব্যাপার হলো এই আন্দোলনকে গুন্ডাপান্ডাদের আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, কারন আব্দুল্লাহ ছিলেন দ্বিজাতি তত্ত্বের বিরোধী।

৪৬ সালে জেলে ঢুকানো হলো আব্দুল্লাহকে। গদি রক্ষায় হিন্দু চরমপন্থীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিলেন হরি সিং। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলো। অবশ্য বন্ধু নেহেরুর কথায় আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন শেখ আব্দুল্লাহ। তবে বেরোতে পারেন নি জেল থেকে। এরপর বিভিন্ন জায়গায় বাঁধে দাঙ্গা।

১৯৪৭ এর জুনে পুনরায় শুরু হয় আন্দোলন। এবার নিরস্ত্র নয়, সশস্ত্র আন্দোলন। পুঞ্চ, গিলগিট ও মুজাফফরাবাদের বিদ্রোহী প্রজারা রাজধানী শ্রীনগরের দিকে এগোতে থাকে। অক্টোবরের ২৪ তারিখ পুঞ্চ এলাকার প্রজারা গঠন করে আজাদ কাশ্মীর সরকার। মহারাজ হরি সিং সপরিবারে পালিয়ে গেলেন হিন্দু অধ্যুষিত জম্মুতে। ২৬ অক্টোবর ভারতের সঙ্গে চুক্তি সই করলেন। এর প্রেক্ষিতেই পরদিন কাশ্মীরে নামলো ভারতীয় সেনা। সংকটে নতুন মাত্রা।

ভারতের সাথে চুক্তি সইয়ের আগে পাকিস্তানের সাথেও একটি চুক্তি ছিল হরি সিং এর। ঐ চুক্তি পাকিস্তানকে বৈধতা দিয়েছিল কাশ্মীরের ডাক, তার ও যোগাযোগ সিস্টেম দেখার। ফলে সেই চুক্তি বহাল থাকা অবস্থায় ভারতের সাথে কথা করা নতুন চুক্তি ক্ষুব্ধ করে পাকিস্তানকে। তারা এবার বিদ্রোহীদের দেয় সহায়তা। মুজাহিদ দাবি করা বিদ্রোহীরাও বলতে থাকে ভারতের সাথে করা রাজা হরি সিং এর চুক্তি অবৈধ। অবশ্য এই চুক্তির আগেই মুক্তি মিলেছিল শেখ আব্দুল্লাহর।

মুজাহিদদের আক্রমণে বিপর্যস্ত হরি সিং ধরনা দিয়েছিলেন কারাবন্দি এই নেতার কাছে। সংকট মোকাবেলার উপায় কী?

নেহেরু, আব্দুল্লাহ, মাউন্ট ব্যাটেন আর হরি সিংরা করেছিলেন দফায় দফায় মিটিং। তারই পরিণতি ২৬ অক্টোবরের চুক্তি।

চুক্তিটির কিছু শর্ত ছিল এরকম....

১. কাশ্মীরের আলাদা সংবিধান ও পতাকা থাকবে।

২. কাশ্মীরের প্রধান নির্বাহীকে বলা হবে প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী নন।

৩. ভারতীয়দের কাশ্মীরে ঢুকতে হলে অনুমতিপত্র লাগবে।

৪. প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র এবং ডাক, তার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা দেখবে ভারত।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু মহারাজ হরি সিং কে বলেছিলেন, ‘কাশ্মীরে ভারতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি ফয়সালা হবে কাশ্মীরীদের গণভোটের মাধ্যমে। ১৯৪৮ এর পহেলা জানুয়ারি কাশ্মীর সংকট জাতিসংঘে নিয়ে গেলো পাকিস্তান। ৬ জানুয়ারি নিরাপত্তা পরিষদ জানায়, নেহেরুর প্রতিশ্রুত গণভোটই ঠিক করবে কাশ্মীরীদের ভাগ্য- হয় তারা স্বাধীন থাকবে, নতুবা ভারত বা পাকিস্তানকে বেছে নেবে। গণভোটের শর্ত অনুযায়ী যুদ্ধ বিরতি হয় ১৯৪৯ সালের পহেলা জানুয়ারি। এই যুদ্ধ বিরতি রেখা ধরে কাশ্মীর বিভক্ত হয় দুটি অংশে। আজাদ কাশ্মীর ও জম্মু-কাশ্মীর। প্রথম অংশের নিয়ন্ত্রণ পায় পাকিস্তান, পরের অংশ যায় ভারতের কাছে। এক সময় ভারতীয় কাশ্মীরের শাসক হন ( প্রধানমন্ত্রী) শেখ আব্দুল্লাহ। ১৯৫২ সালের ২৬ জুলাই নেহেরু ও আব্দুল্লাহ একটি চুক্তি সই করেন। কাশ্মীরের পৃথক পতাকা,পৃথক সংবিধান ও পৃথক নাগরিকত্বের অধিকার বাতিল হলো। একসময় প্রধানমন্ত্রীর পদও বাতিল হয়ে গেলো, ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতই কাশ্মীরের নির্বাহী প্রধান হলেন মুখ্যমন্ত্রী। পরবর্তীতে আব্দুল্লাহর উত্তরসূরীরের কয়েকজন হয়েছেন কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী।

নেহেরুর প্রতিশ্রুত গণভোটও আর হলো না, কাশ্মীরী জনগণও নিজেদের ভাগ্য গড়ে নেয়ার সুযোগ পেল না।

লেখক: সোহেল রানা, গণমাধ্যমকর্মী