০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:০৯

আজ বাংলা ভাষায় অন্যরা বাসা বেঁধেছে

হরিচাঁদ দাশ রাতুল

ভাষা কী— সহজ কথায় বলতে গেলে মানুষের মনের ভাব আদান প্রদানের মাধ্যমকে ভাষা বলে। শুধুই কি তাই? আমার তো মনে হয় ভাষা হল মানুষের পার্থক্যগত আচরণ যা সহজেই অন্য সংস্কৃতি থেকে আমাদের সহজেই আলাদা করে। ভাষা এমন এক প্রকার বাহন যা মানুষের স্বাধীন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, আচার-আচরণ, সমাজ ব্যবস্থা, রীতি-নীতি বহন করে। একমাত্র ভাষার মাধ্যমেই সহজেই আলাদা করা যায় সংস্কৃতিবোধ এমনকি স্বাধীনসত্ত্বা। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস দেখুন— আজ আমার দেশের স্বাধীন ভাষাই আমার দেশে পরজীবী হিসেবে বসবাস করছে।

বাংলা ভাষা যতই না মধুর তার থেকে বেশি নাটকীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ তা অর্জনের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ইতিহাস সবারই জানা। সেদিন রক্তের বিনিময়ে পাওয়া ভাষা আজ আমরা উচ্চারণ করতেই লজ্জা পাই। যদিও কোন ব্যক্তি ভালভাবে মাতৃভাষা বাংলা ব্যক্ত করতে পারে তাকে  সমাজের অনেকে ‘ক্ষ্যাত’ উপাধিতে ভূষিত করে। এই লজ্জা কার?

পৃথিবীতে ভাষার জন্য রক্ত দেওয়ার ইতিহাস শুধু বাঙ্গালিরই আছে। মানুষ মাত্রেই স্বীকার করবে বাঙালি আবেগী জাতি। আর সেই আবেগের তাড়নায় তারা কেড়ে নেওয়া মুখের ভাষা ফিরিয়ে এনেছিল। শুধু তাই নয়— সেই আবেগের কল্যাণে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আজও বাঙালি আবেগী আছে— তবে তা নিজেদের বিলিয়ে দেবার ক্ষেত্রে। ঠিক নীলকরদের আমলে কিছু বাঙ্গালির দাসত্বের মতো। পথে-ঘাটে চলার সময় একটু লক্ষ্য করলে দেখবেন বাংলাতে আজ বিদেশী ভাষার কি ছড়াছড়ি। একটা উদাহরণ দিই—

সেই দিন আমার এক বন্ধু আমাকে বলল, ‘দোস্ত, জাস্ট ফিউ মিনিট ওয়েট কর, আমি ইমিডিয়েটলি কাম ব্যাক করতেছি।’ বাহ! এগার শব্দের এক লাইন বাংলা ভাষা, এতে বাংলা শব্দের স্থান হয়েছে মাত্র তিনটি। আমার কাছে বিষয়টা অনেকটা ঠিক সেই ব্রিটিশ শাসন আমলের মতো মনে হয়। অনেক ইংরেজ মিলে একজন বাঙ্গালীকে কোন কাজ করতে বাধ্য করতেছে। শুধু যে ইংরেজি ভাষা তা কিন্তু নয়—আছে হিন্দি, উর্দু ছাড়াও বাংলার স্বীকৃতি না পাওয়া অনেক অজানা ভাষা। অফিসে-আদালতে, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে হর-হামেশাই ব্যবহার হচ্ছে এমন ভাষা। এমনকি অন্য ভাষার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় বিভিন্ন দোকান, ব্যাংক ও বিনোদন কেন্দ্রের প্রধান ফটকে। মনে হয় যেন বাংলার বুকে জন্ম নেওয়া অন্য কোন নতুন বাংলা ভাষা। এরই মাধ্যমে সার্থকতা লাভ করেছে ভবানী প্রসাদ মজুমদারের বিখ্যাত সেই উক্তি ‘দাদা জানেন তো আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না’।

চাকরিতে সুযোগ পাওয়ার জন্য ইংরেজি জানতে হবে ভাল কথা কিন্তু তাই বলে কি যোগাযোগ, কথাবার্তার জন্য বাংলিশের এক অখাদ্য জগাখিচুড়ি বানাতে হবে এমন কি কোন কথা আছে? আমার মাতৃভাষায় অন্য ভাষাকে বাসা বানানোর সুযোগ দিতে হবে তার যুক্তিই বা কতটুকু? শ্রদ্ধেয় আনিসুল হক স্যারের লেখা ধার করে বলতে হয়, মাতৃভাষা মানে তো মায়ের ভাষা নয়। মাতৃভাষা মানে যিনি মা তিনিই ভাষা। ভাষা আমাদের মা। আজ আমাদের মায়ের মুখ মলিন আজ আমাদের নয়ন জলে ভাষার দিন।

তাই আসুন ভাষার মাসে শপথ করি, যেকোনো মূল্যে বাংলাকে অক্ষুণ্ণ রাখব। তবে অন্য ভাষাকে সম্মান করে সমমূল্য দিয়ে নয়। আর তা না হলে আবার ভাষা শহিদেরা জেগে উঠবে। বলবে, ‘ফিরিয়ে দাও সেই রক্ত, লও এ বিদেশী ভাষা’। বাংলা ভাষার মধ্য দিয়েই বাঙ্গালিত্ব প্রকাশ পাক। সেই শপথ নিয়ে অন্য ভাষার বাসা বাংলা হতে ধ্বংস করে দেই। সার্থক করে তুলি সেই বীরদের রক্তের মূল্য। তাই শেষে বলতে পারি, জেগে উঠো বাহে! আবার সবার কণ্ঠে বাংলা ভাষা তার নিজস্ব স্বকীয়তা চায়। আসুন আবার জেগে উঠি বাংলায়।

 

হরিচাঁদ দাশ রাতুল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী।