২০ জানুয়ারি ২০১৯, ১৫:৪০

বাংলাদেশে একটি শিক্ষাবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় দরকার

মু. মিজানুর রহমান মিজান

উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের আমার এক শিক্ষক আমাকে স্নাতকের (সম্মান) ডিসিপ্লিন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি তাকে বলেছিলাম, আমার ডিসিপ্লিন হলো বিএড। এটি শুনে আমাকে তিনি বলেন ও, মাস্টার হবে নাকি? পরে তাকে বোঝাতে পেরেছি, ব্যাচেলর অব এডুকেশনে অধ্যয়ন করা মানে টিচার এডুকেশন বা শিক্ষক শিক্ষায় অধ্যয়নই নয়, শিক্ষক শিক্ষা হতে পারে এর একটি চ্যাপ্টার বা কোর্স। তাঁকে আমি বোঝাতে পেরেছিলাম শিক্ষা বিষয়টি সামগ্রিক শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করে আর শিক্ষক শিক্ষা শিক্ষকতা এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের সাথে জড়িত।

শিক্ষা যে একটি স্বতন্ত্র জ্ঞানক্ষেত্র সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষতো দূরে থাক আমাদের দেশের উচ্চ শিক্ষিতদের একটি বিশাল অংশই অজ্ঞাত। জরিপে হয়ত এর পরিমান ৮০ বা ৮৫ শতাংশ পেরিয়ে যাবে। বাংলাদেশে শিক্ষার শিক্ষার্থীরা দেশের মধ্যে নিজেদের আভিজাত্য দিনে দিনে রঙিন করেই চলেছে, শিক্ষকতাসহ ও নিজেদের প্রচেষ্টায় দেশের বড় বড় আসনগুলো দখল করে নিচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষামূলক উদ্যোগের পাশাপাশি অন্যান্য সেক্টরেও ক্যারিয়ার গড়ছেন।

শিক্ষক শিক্ষা হল শিক্ষাবিজ্ঞানেরই একটি অংশ। এ দুটি বিষয়ের মধ্যে যে ফারাক বিদ্যমান তা সহজে বোঝানোর জন্য আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে শিক্ষা এবং শিক্ষক শিক্ষা দুই নামে দুটি ডিগ্রি পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে যেহেতু বিষয়টি সবার কাছে সহজেই বোধগম্য হয়। আমার মনে হয়, আমাদের দেশেও এমন ব্যবস্থা করলে মন্দ হয় না, বরং মানুষের মধ্য থেকে বিভ্রান্তি দূর হবে; পূর্বে কিন্তু এমন ছিল। পাশাপাশি এর ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রসমূহ সম্পর্কেও মানুষ জানতে পারবে বা ভবিষ্যতে আগ্রহ প্রকাশ করবে। বেশি ভাল হয় যদি আমাদের দেশে একটি শিক্ষা বিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।

শুধু কি এই বিষয় পরিচিতির জন্যই একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে? না, এটি আমাদের এখন প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেশে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি চিকিৎসা, প্রকৌশল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং কৃষি বিষয়ক ভিন্ন ভিন্ন পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন কিছু উদ্দেশ্য। তবে কী ধরণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বাংলাদেশে একটি শিক্ষা বিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয়?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে এবং সেসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়মিত শিক্ষাবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এম.ফিল, পিএইচডি ডিগ্রী প্রদান করা হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নিউজল্যান্ড, মিশরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের বিশেষ কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ইন্সটিটিউট বা ডিপার্টমেন্ট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান নিজ দেশের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বাইরের শিক্ষার্থীদেরও ডিগ্রি প্রদান করছে। বাংলাদেশের বহু শিক্ষার্থী-শিক্ষকরাও নিউজল্যান্ডের ক্যান্টারবারি বিশ্ববিদ্যালয় বা ফিলিপাইনের ডেলা সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের মত আরো অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে থাকেন প্রয়োজনের তাগিদে। খরচ করতে হয় লাখ লাখ টাকা। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যারাই ডিগ্রি নিয়েছেন বা নিচ্ছেন তাঁদের বড় অংশ নিজের খরচে নেন নি। কখনও সরকার, আবার কখনও বা ওই বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর খরচ বহন করেছে। সরকার যেহেতু দেশের ও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার স্বার্থে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে প্রতি বছরই এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানার্জনের জন্য শিক্ষার্থী পাঠায়। এ থেকেই এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের গুরুত্ব বোঝা যায়। শিক্ষা ডিসিপ্লিনে অনলাইনেও অনেক রকমের কোর্স করার সুযোগ করে দিচ্ছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান। ধীরে ধীরে এর প্রসার বাড়ছেই।

বাংলাদেশে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ সমূহ), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা ইনস্টিটিউট রয়েছে। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও ‘শিক্ষাবিজ্ঞান নামে আলাদা ফ্যাকাল্টি চালু করেছে। যেসব ইনস্টিটিউট, কলেজ, ফ্যাকাল্টি থেকে শিক্ষা বিষয়ের ওপর বিভিন্ন প্রোগ্রাম চালু রয়েছে যেমন, ব্যাচেলর অব এডুকেশন (১ বছর), ব্যাচেলর অব এডুকেশন (চার বছর), মাস্টার্স অব এডুকেশন (এক বছর), ঢাবিতে সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স ( এক ও বার বছর) ইত্যাদি। কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও এ সুযোগ প্রদান করছে।

শিক্ষক হতে গেলে বা শিক্ষকতায় ক্যারিয়ার গড়তে গেলে সবারই শিক্ষায় কনো না কোন ডিগ্রি থাকা আবশ্যক বলেই গণ্য করা হয় বহির্বিশ্বে, হোক সে প্রাথমকি বিদ্যালয় কিংবা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে। আমাদের দেশেও এই ডিগ্রি অর্জন করতে হয় তবে তা উচ্চতর পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য নয় অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিসিএস এর মাধ্যমে যারা শিক্ষকতায় প্রবেশ করেন। বি.এড. ডিগ্রি শুধু তাদেরই অর্জন করতে হয় যারা বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও প্রাথমিকের শিক্ষক হতে চান। শিক্ষা নিয়ে যারা কথা বলেন তাঁরা বিভিন্ন সময়েই এ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে থাকেন।

ধরা যাক, কেউ একজন প্রাথমিক বা উচ্চতর পর্যায়ের বাংলার শিক্ষক হতে চাইলেন, এমতাবস্থায় তাকে বাংলার ওপর নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে অবগত থাকলেই চলবেনা তাকে আরো বেশ কিছু বিষয়ে পারদর্শী হতে হবে। শিখন-শিক্ষন কৌশল (শিক্ষার্থীদের শ্রেণি, বয়স, জ্ঞানস্তর ও বিষয় অনুসারে), পেডাগজি, শিক্ষা-মনোবিজ্ঞান তথা গাইডেন্স ও মকাউন্সেলিং, পাঠ পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট বিস্তারিত ধারণা ও এর ব্যবহার, শ্রেণি ব্যবস্থাপনা, সঠিক উপকরণের সঠিক ব্যবহার, শিক্ষার্থী মূল্যায়ন পদ্ধতি, অভীক্ষা পদ ও পত্র প্রণয়ন, মার্কিং, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, শিক্ষাক্ষেত্রে নেতৃত্ব, পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতাসহ যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে গভীর ধারণা প্রয়োগের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে বিভিন্ন বিতর্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই বিতর্ক সৃষ্টির মূলে আপাতদৃষ্টিতে প্রধান কারণ হিসেবে আমরা ভাল শিক্ষা বিশেষজ্ঞের অভাবকে বড় করে লিখতে পারি। যে কারণে সরকারি বিভিন্ন শিক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন প্রজেক্টে বিদেশি শিক্ষাবিদদের দেখতে অভ্যস্ত। স্বদেশ ও বিদেশের শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ও খুব ভাল এনে দিতে পারছেনা যার প্রমান হিসেবে আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় চলমান বিতর্ককে সামনে আনতে পারি। যেমন, বর্তমানে মাধ্যমিক পর্যায়ে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া হয় অথচ বেশিরভাগ শিক্ষকই জানেন না বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে কিভাবে কাজ করতে হয়। যারা মোটামুটি জানেন তারাও নিজেদের জ্ঞানকে প্রয়োগ করতে পারছেন না উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাবে। তারা ভাল মানের প্রশিক্ষণ পাবেন কিভাবে যদি ভাল মানের প্রশিক্ষক তৈরি করা না যায়।

টিচার্স ট্রেনিং কলেজের ছাত্র হওয়ায় আমি দেখেছি, যারাই এখানে ভাল প্রশিক্ষণ দেয়ার চেষ্টা করেন তারা বিদেশ থেকে কোন শিক্ষা বিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা শিক্ষার কোন একটি বিষয়ে ডিগ্রি/প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন। আবার কিছু সংখ্যক রয়েছেন যারা কেবল ডিগ্রি নেওয়ার জন্যই নিয়েছেন। এক্ষেত্রে বলতে পারি, সরকারের অর্থের ক্ষতি হয়েছে কারণ তাঁরা নিজেদের অর্থে সে ডিগ্রি অর্জন করেননি। আবার অনেকে নিজেদের মেধার পরিচয় দিয়ে স্কলারশিপ পেয়েছে ওইসব প্রতিষ্ঠানে। তবে এমন না যে, বিদেশে ডিগ্রি ছাড়া প্রশিক্ষকরা ভাল করছেন না। করছেন, তাদের সংখ্যা বিষ প্রয়োগে পুকুরে থাকা মাছ মেরে ফেলার পর যে দু’চারটে জীবিত থাকে তার মতই। তাদেরওতো প্রশিক্ষণের দরকার আছে। আমার চেনা কিছু শিক্ষক/প্রশিক্ষক রয়েছেন যাদের ক্লাস পারফরমেন্সই বিরক্তিকর।এরা যখন প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন তখন তাদের ওপর প্রশিক্ষণার্থীরা না কত বিরক্ত হয়! এমনকি বাংলার প্রমিত উচ্চারণেও আছে সমস্যা। এসব সমস্যা থেকে উঠে আসা সম্ভব হয় যদি প্রত্যেক শিক্ষক/প্রশিক্ষককে সঠিক ভাবে তাদেরকে শিক্ষাবিজ্ঞানে দক্ষ করে তোলা যায়। আজ এ অভাববোধ হয়তো হতোনা যদি আমাদের একটি শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় থাকত। শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁদের নির্ধারিত একডেমিক ও প্রশিক্ষণগত কাজের পাশাপাশি চলমান গবেষণার মাধ্যমে সরকারের শিক্ষানীতি, শিক্ষাক্রম ও এমন অন্যান্য দিকে উন্নয়ন/সংশোধনসহ এ সংক্রান্ত নানাবিদ তথ্য প্রদান করে সহায়তা করতে পারে।

উচ্চ শিক্ষার প্রসারে প্রতিটি জেলায় একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের। তাই বলছি, অন্তত একটি শিক্ষা স্পেশালিস্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হোক, সেটি হতে পারে বাংলাদেশের যেকোন জেলায়। শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি নতুন নয়, বেশ পুরোনো। বিভিন্ন শিক্ষাবিদদের মতামত ও সুপারিশ রয়েছে, কেউ কেউতো রূপরেখাও তুলে ধরেছেন। অপেক্ষায় আছি স্বতন্ত্র শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের। আশা করছি আমাদের সরকার ও প্রশাসন বিষয়টি ভেবে দেখবেন।

লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা
ইমেইল: mizanur.r.mizan@gmail.com