২৮ নভেম্বর ২০১৮, ২৩:১৭

যেখানে সুখের স্মৃতিই বেশি

  © টিডিসি ফটো

‘সময় এবং নদীর স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না’-কথাটির যথার্থতা প্রতিনিয়ত বুঝতে পারছি। চট্টগ্রাম কলেজের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছি ২০১৭ সালে। বুধবার (২৮ নভেম্বর) স্নাতকোত্তরের পরীক্ষাও শেষ করলাম। অথচ মনে হচ্ছে এইতো সেদিন প্রথম বর্ষের প্রথম ক্লাসে বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর শাশ্বতী দাস ম্যাডাম এসে ক্লাসে উপস্থিত থাকার গুরুত্ব, অনুপস্থিত থাকার কুফল, প্রতিটি বিষয়ের উপর হালকা টিপস আর ক্লাসে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে গেলেন।

কথাগুলোর গুরুত্ব আমরা সব সময় বুঝতে পেরেছি। ক্যাম্পাসে লাইফে কাটানো প্রতিটি মুহুর্ত অতীতের খাতায় উঠে গেছে। তাই পিছনে ফিরে সেই স্মৃতিগুলো আওড়ানো ছাড়া আর কিছুই করার নেই আমাদের। আমি এতোবেশী ভাগ্যবান যে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুবাদে আমার এইচএসসি লাইফের তিন প্রিয় স্যারকে (রেজোয়ানুল হক স্যার, মুজিবুর রহমান স্যার এবং ফাতেমা ম্যাডাম) পুনরায় শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি। প্রফেসর প্রণবেশ চৌধুরী স্যার, প্রফেসর শ্বাস্বতী দাস ম্যাডাম, প্রফেসর আবুল হাসান স্যার এবং সদ্য বিদায়ী প্রফেসর আবু তাহের স্যারের মতো চারজন স্বনামধন্য, গুণী, কিংবদন্তীতুল্য বিভাগীয় প্রধান পেয়েছি। যাঁদের আদর, ভালোবাসা, দিক-নির্দেশনা আমার জীবনের গতিপথকে অনেক বেশি প্রভাবিত করেছে।

চট্টগ্রাম কলেজের ইংরেজি বিভাগ আমার পরিবার। এই সেই বিভাগ যেটাকে আমরা হয়তো কিছুই দিতে পারিনি। কিন্তু এই বিভাগই আমাদের সবাইকে আলাদা করে পৃথিবীর বুকে একটা নির্দিষ্ট পরিচয় দিয়েছে। যে পরিচয় নিয়ে আমরা বুক চিতিয়ে সারা দুনিয়া দাপিয়ে বেড়াতে পারবো। গর্বভরে সারা জীবন বলতে পারবো আমি চট্টগ্রাম কলেজ ইংরেজি বিভাগের একজন প্রাক্তন ছাত্র।

ভাল-মন্দেই হয় একটি পরিবার। তবে চট্টগ্রাম কলেজের ইংরেজি বিভাগে পরিবারটাতে খারাপের চেয়ে ভাল আর দুঃখের চেয়ে সুখের স্মৃতিই বেশি। যে পরিবারের সকল সদস্যই ভালোবাসতে পারার মতো একটা অতুলনীয় গুণ বহন করে। পরস্পরের প্রতি আস্হা, সম্মান আর অপরিসীম মমত্ববোধসম্পন্ন আর কোনও বিভাগ চট্টগ্রাম কলেজে আছে কিনা আমার জানা নেই। আমরা পেরেছি শিক্ষকদের প্রতি আমাদের আর আমাদের প্রতি শিক্ষকদের অকৃত্রিম ভালোবাসার একটা নজির স্থাপন করতে। আমরাই পেরেছি বিভাগের বড়দের প্রতি ছোটদের সম্মান আর ছোটদের প্রতি বড়দের আন্তরিকতার মিশেলে একটা স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করতে। চট্টগ্রাম কলেজে স্বর্গের একটা টুকরো হলো ইংরেজি বিভাগ।

কলেজ লাইফে স্যারদের অবদানের কথা, পিতামাতার মতো কেয়ার করার কথা, নিজেদের ছেলের মতো ভালোবাসার কথা, বর্ণনা করার কোনো শব্দ, ভাষা, শক্তি কিংবা সামর্থ্য আমাদের কারোরই নেই। কারণ সৃষ্টিকর্তা কিছু জিনিসের বর্ণনা নিজে করতেই পছন্দ করেন। তাই পৃথিবীর কারো সাধ্য নেই একজন ছাত্রের জীবনে স্যারদের ভূমিকা নিয়ে বর্ণনা করার।

এখনো প্রতিনিয়ত কানে বাজে রেজোয়ানুল হক স্যারের সাবলীল ভঙ্গিমায় কথা বলা। মুজিবুর রহমান স্যারের নিখুঁত প্রেজেন্টেশন। আনিকা রাইসা ম্যাডামের মাতৃতুল্যা শাসন। ফাতেমা ম্যাডামের বাস্তবিক উৎসাহ। নাজমুল হক স্যারের মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া। আলমগীর চৌধুরী স্যারের কোমল ভালোবাসা। শচীদানন্দ স্যারের মিতভাষীতা। রোকসানা পরভীন ম্যাডামের আনন্দমুখর ক্লাসরুম। সুমন স্যারের বন্ধুত্বসুলভ আচরণ। আর পারভিন আক্তার ম্যাডামের মুচকি হাসিতে সালাম গ্রহণ সারা জীবন মিস করবো।

ব্যাচমেটদের নিয়ে বিভাগে কাটানো দিনগুলো যেমন মজাদার আর ফুরফুরে ছিল তেমনি এক জনের প্রতি আরেকজনের ছোট ছোট খুনসুটি আর কথা কাটাকাটি দিন দিন আমাদের সম্পর্কটাকে আরও বেশি মজবুত করে দিয়েছে। সবাই মিলে একসাথে পিকনিকে যাওয়া, ছবি তোলা, ফেয়ারওয়েল পার্টি উদযাপন করা হৃদয়কে প্রতিনিয়ত খুব বেশি নাড়া দেয়।

হাজার ভুল বুঝাবুঝির পরেও আমরা পরস্পরের প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক, সহানুভূতিশীল, সহমর্মিতাসুলভ, সাহায্যপরায়ণ এবং বন্ধুত্বসুলভ আচরণ করি। কারণ আমরা কেউ কাউকে অহংকার করিনা, কেউ কাউকে ঘৃণা করিনা। সবাই শুধু ভালোবাসি। যে একটু রাগ করেছে বলে মনে হয় তাকে খুব সহজেই কাছে টেনে নেওয়ার চিন্তায় মগ্ন থাকি। সেজন্যই আমরা বন্ধুত্বপরায়ণ ব্যাচ হিসেবে সমগ্র বিভাগে সুপরিচিত। ইংরেজি বিভাগ আমাকে শুধুমাত্র অনেক বন্ধুই দেয়নি দিয়েছে ভালোবাসার মানুষ, অনেক ভাই-বোন; যাদের শুধুই ভালোবাসা যায়।

সুদীর্ঘ এ জীবন যাত্রায় দুই একটা সিঁড়ি সবে পার হতে চলেছি। সামনের সিঁড়িগুলোও যেন পিতৃতুল্য প্রিয় স্যার ও মাতৃতুল্যা ম্যাডাম, বন্ধু-বান্ধব এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের নির্মল ভালবাসায় সিক্ত হয়ে পার হতে পারি সে কামনাই করি। ভালো থাকুক ভালোবাসার প্রিয় ইংরেজি বিভাগ, ভালো থাকুক ভালোবাসার প্রিয় মানুষগুলো।

ঝরে পড়া শিশিরের শুভেচ্ছা রইল।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ
মাস্টার্স ২০১৫-১৬ সেশন
mohammadikbal2013@gmail.com