১৮ অক্টোবর ২০১৮, ২০:৪৯

সময় নয়, জীবনের গুরুত্বই বেশি

সড়ক দুর্ঘটনা; অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু সব দোষ কিন্তু চালকের নয়। অামরা যারা চলি তাদের দোষও অাছে বলে মনে করি। অামাদের দোষ হলো- অামরা অসচেতন। বড্ড অসচেতন। অামাদের কাছে জীবনের চেয়ে সময়ের মূল্য বেশি। তাই জীবনকে হাতে নিয়ে সময় বাঁচানোর জন্য এভাবে চলন্ত ট্রেনের সামনে দৌঁড়ায়। [ ছবিটি প্রথম অালো অনলাইন সংস্করণ থেকে নেয়া]। 
এমন দৃশ্য কিন্তু প্রতিনিয়ত দেখা যায়। সড়ক পথে তো অারো বেশি। হাত উঁচিয়ে দ্রুতগামী গাড়ির গতিরোধ করে রাস্তা পারাপারের দৃশ্য বাংলাদেশে অহরহ। 

অামরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। অাইন প্রণয়ন করতে জানি অামরা, তবে অাইন মানতে জানিনা। অামাদের কাছে ইজ্জত সম্মানই গুরুত্বপূর্ণ, জীবন নয়। জীবনের চেয়ে সময়কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি অামরা। যেভাবে সময় বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ করি সেভাবে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করি না বলে অামাদের এ দুর্গতি। সড়কে যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে উঠে পড়ি। স্টেশনে স্টেশনে উঠানামা করিনা বরং একেবারে বাসা/বাড়ির গেইটের সামনে গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়ি। গেইট থেকে একটু দূরে নিয়ে গেলেই গালাগাল করে চালকের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করি। যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে রাস্তা পারাপার করি। অাপনি নগরির যতো ব্যস্ততম রাস্তা দেখবেন সবখানে সাধারণ একটি দৃশ্য দেখবেন; তাহলো হাত উঁচিয়ে গাড়ি থামিয়ে মানুষ রাস্তা পার হচ্ছে।

অামাদের দেশে অনেক ব্যস্ততম স্থানে ফুটওভার ব্রীজ নির্মাণ করা হয়েছে। মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে রাস্তা পারাপার করতে পারে তজ্জন্য অনেক টাকা ব্যয় করে সরকার এসব ফুটওভার ব্রীজ নির্মাণ করে। দুঃখের বিষয় হলো- এসব রাস্তা দিয়ে অামরা চলাচল করিনা। ফুটওভার ব্রীজ দিয়ে উঠানামা করে রাস্তা পার হবো এতো সময় অামাদের নাই। অামরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের লোক। ফলে এসব ফুটওভার ব্রীজে কুকুর ঘুমায়। পাগলেরা ঘুমায়। বাস্তুহারা ভাসমান লোকেরা বসবাস করে। 

অামরা সচেতন নয় বলে সড়কে অামাদের অকাল মৃত্যু ঘটে। অামাদের কারণে অনেক নিষ্পাপ শিশু এবং মা বোনদেরও মৃত্যু হয়। কেবল অামাদের অসচেতনতার কারণে। অামি বলবোনা চালকদের দোষ নাই। গাড়ির চালক, হেল্পার ও যারা রাস্তায় চলে কিংবা গাড়িতে চড়ে সবাই তো মানুষ । অামরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। অামরা সচেতন হলে নিজেরাই বাঁচবো। অামরা বাঁচলে অামাদের দেশ বাঁচবে। তাহলে কেন অসচেতন! কেন অামরা জীবনকে পরোয়া না করে সময়কে পরোয়া করি? 
সময় যথেষ্ট পাওয়া যাবে যদি বেঁচে থাকি, এ তো সবার জানার কথা। অাপনি যদি সময়কে গুরুত্ব দিতে গিয়ে জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দেন তাহলে সময় অার থাকলো কোথায়! কারণ, সময়ের সমষ্টি তো জীবন। জীবন শেষ মানে সময় শেষ। জীবন অাছে মানে সময় অাছে।। 

কিছুদিন অাগে দৈনিক অাজাদী পত্রিকায় সড়ক দুর্ঘটনার একটি নিউজ পড়েছিলাম। অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া একজন ছাত্র মোটর সাইকেল চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়। সেই অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া কিশোর ছেলেটি মোটরসাইকেলে করে তার পরিবারের দু’জন শিশুকে সকালবেলা স্কুলে পৌঁছে দিচ্ছিল। ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে রোডে সে মোটর সাইকেল চালাচ্ছিল একহাতে। একহাতে মোটরসাইকেলের হ্যাণ্ডল অপরহাতে মোবাইল ফোন। হুম, সে মোটর সাইকেল চালাতে চালাতে মোবাইল ফোনে কথা বলছিল। এমতাবস্থায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সে একটি ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে। তিনজনই জায়গায় মৃত্যু বরণ করে।

অাচ্ছা! ছেলেটার কতটি অপরাধ জানেন?
প্রথমতঃ অপ্রাপ্ত বয়স্ক। যেখানে প্রাপ্ত বয়স্ক হয়নি সেখানে লাইসেন্সের প্রশ্নই অাসেনা। 
দ্বিতীয়তঃ হেলম্যাট নাই। হাইওয়ে রোডে বের হয়েছে, কিন্তু হেলম্যাট নাই। হেলম্যাট ছাড়া। 
তৃতীয়তঃ সে মোবাইল ফোনে কথা বলছিল। কি দুঃসাহসিকতা! হাইওয়ে রোডে একজন কিশোর পেছনে দু'জন শিশু বসিয়ে এক হাতে মোবাইলে কথা বলতে বলতে অন্যহাতে হ্যান্ডেল ধরে একহাতে গাড়ি চালানো! এ তো চাট্টিখানি কথা নয়!
ছেলেটির এসব অপরাধের জন্য অামি তার পরিবারকে দোষবো। তারা সন্তানকে যথাযথ শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই এমন দুর্ঘটনা। একটি ছেলের সাথে অারো দু’জনকে হারাতে হয়েছে কেবল অবহেলার কারণে। পরিবার কি করে তাকে এলাউ করলো!  কিভাবে পারলো একটি কিশোরের হাতে মোটরসাইকেল দিয়ে পেছনে দু’টি শিশু তুলে দিতে!

চালকের দোষ অবশ্য নাই বলবো না। অামরা যারা রাস্তায় চলি তাদের অসচেতনতার কথায় বলছি। চালক হোক অার যাত্রী হোক সবাই তো মানুষ। অাসুন সবাই সচেতন হই। অামরা সচেতন হলে অামরা বাঁচবো। অামরা বাঁচলে দেশ বাঁচবে। পরবর্তী প্রজন্ম শিক্ষা পাবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।