পর্যটন শিক্ষার্থীদের জাতীয় প্ল্যাটফর্ম সময়ের দাবি
বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছোট্ট একটি দেশ। পদ্মা, মেঘনা আর যমুনার মত শত শত ছোট-বড় নদ-নদী এদেশকে দিয়েছে নদীমাতৃক বাংলার রূপ। নদীর পলি জমে হয়েছে এই বাংলার জমি উর্বর আর সেই উর্বর জমিতে ফসল ফলিয়ে ক্ষুধা নিবারণ হয় এদেশের ১৬ কোটি জনতার। হাজারো পুকুর-দিঘি, খাল-বিল, হাওর-বাওর আর নদ-নদী এদেশে ছড়িয়ে আছে জালের মত, ঠিক আমাদের দেহের শিরা-উপশিরার মত। তবে, এই বাংলার প্রাচুর্য শুধুমাত্র ফসল আর নদীতে নয়।
নানা ধরনের শিল্প, বাণিজ্য আর উদ্ভাবনের আমরা পিছিয়ে নেই। শিল্প-বাণিজ্যের প্রসঙ্গে বলতে হয়, বাঙালি একসময় বণিক জাতি ছিল। আদিকাল থেকে ব্যবসায় ছিল বাংলার মানুষের আয়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আর সেই ব্যবসায়ের হাত ধরেই বিদেশিদের প্রথম আগমন ঘটে ভারতীয় উপমহাদেশে। উল্লেখ্য, তখন বাংলাদেশ ভারতীয় উপমহাদেশের অংশ ছিল। এটা খ্রীষ্টপূর্ব ৩২০ এর আগের কথা যখন গ্রীকরা প্রথম আসে বাংলায় রেশম, মসলা আর স্বর্ণের বাণিজ্যের জন্য। সেই থেকে আজ পর্যন্ত নানান দেশ-জাতি, বর্ণ-ধর্মের মানুষের বাংলায় আগমন একটি চলমান প্রক্রিয়ায় রূপ নেয়।
এবার তাকাই পর্যটনের দিকে। প্রাচীনকালে পর্যটনের মূল চালিকা শক্তি ছিল ব্যবসায়, পেশাগত ভ্রমণ, ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ভ্রমণ এবং জ্ঞানচর্চার আর আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়া-আসার মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রাচীনকালে সনাতন ধর্মাবলম্বীগন বিভিন্ন মন্দির ও অন্যান্য তীর্থস্থানে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে প্রায়শই যাতায়াত করতেন। বিভিন্ন বড় এবং প্রসিদ্ধ মন্দিরগুলো ছিল তাদের প্রধান আকর্ষণ। তাদের থাকা-খাওয়ার দায়িত্ব অনেক সময় মন্দির কর্তৃপক্ষ বহন করতেন তবে অনেকেই নিজের উদ্যোগে নিজেদের ব্যবস্থা করে নিতেন। অনেকে আবার জ্ঞানচর্চার জন্য বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের প্রয়োজন অনুভব করতেন। সেসময় প্রাচীন বংগ জ্ঞানচর্চার আধারে পরিণত হয়। মহাস্থানগড়, ময়নামতি বৌদ্ধবিহার তার জীবন্ত প্রমাণ। এভাবেই ধীরে ধীরে বিকাশিত হতে থাকে পর্যটনের বিশালতা। পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজা-বাদশাহগন পরিবহণ ও যোগাযোগের জন্য উন্নত রাস্তা, রাস্তার পাশে বিশ্রামাগার ও আস্তাবল গড়ে তোলেন। পথিক, তীর্থযাত্রী বা বণিকেরা এখানে বিনা খরচে থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা উপভোগ করতেন।
ইংরেজ শাসনামলে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীগন দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত শুরু করেন দেশ শাসন তথা শোষণের কাজে। তাদের মধ্যে অনেকেই চারপাশ ঘুরে দেখতেন। তখন পর্যটন বলতে ধনী বা বিত্তশালীদের বিলাসিতাকেই বুঝাতো। ইংরেজদের ২০০ বছর শাসন-শোষণের পর হয় ভারত ভাগ। এসময় অনেক হিন্দু বাঙালি বাংলাদেশ ছেড়ে ভারত চলে যান আবার অনেক মুসলমান চলে আসেন পূর্ব-পাকিস্তান বা বাংলাদেশে। পশ্চিম-পাকিস্তানি (বর্তমান পাকিস্তান) শাসকেরা পর্যটনের বিষয়ে ছিলেন উদাসীন। তারা ১৯৭০ এর আগে পর্যটন নিয়ে খুব একটা আগ্রহ প্রকাশ করেনি।
স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পর্যটন ককর্পোরেশন অধ্যাদেশ ও নীতিমালা প্রণয়ন করে ১৯৭৩ সালে পরিচালনা পর্ষদ গঠন করেন। তখন এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল। পরবর্তীতে এটাকে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্থানান্তর করা হয়। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন মূলত পর্যটন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি পর্যটকদের বিভিন্ন ধরণের সেবা প্রদান করে থাকে। এছাড়াও নানা ধরণের গণসচেতনতা মূলক কাজ করে থাকে। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন এর অধীনে ন্যাশনাল হোটেল এন্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয় সরকারি ভাবে পর্যটনে উন্নতমানের যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যে। ২০১০ সালে তৎকালীন সরকার পর্যটনের প্রচার-প্রচারণার জন্য বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড গঠন করে। বর্তমানে এই তিনটি সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা পর্যটনের মানোন্নয়ন, প্রচার-প্রচারণা এবং প্রশিক্ষণ কাজে নিয়োজিত। এগুলোর প্রচেষ্টায় মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে বাংলাদেশের পর্যটন ধীরে ধীরে বিকাশিত হতে থাকে।
বর্তমানে বাংলাদেশে পর্যটকদের আন্তর্জাতিক মানের সেবা প্রদানের জন্য ডজন খানেক পাঁচ তারকা হোটেলের পাশাপাশি শতাধিক উন্নতমানের হোটেল রয়েছে। এসব হোটেলে থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থার পাশাপাশি আছে আরাম-আয়েশ আর বিনোদন সকল ব্যবস্থা। এগুলোর মধ্যে অনেকেই উন্নত আতিথিয়তা সেবা প্রদানে দেশ-বিদেশে যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছে। হোটেল ছাড়াও রিসোর্ট-রেস্টুরেন্ট সহ অন্যান্য সকল ধরণের উন্নত সেবা প্রদানে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
২০০৯ সালে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পর্যটকদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষায়িত পুলিশ হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট ট্যুরিস্ট পুলিশ গঠিত হয়। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট এবং সুন্দরবনে বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট পুলিশের একটিভ জোন রয়েছে। দেশি-বিদেশি সকল ধরণের পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে “হ্যালো ট্যুরিস্ট” নামক একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করে। এই অ্যাপের মাধ্যমে অনেকেই ট্যুরিস্ট পুলিশের সেবা গ্রহণ করছে। উল্লেখ্য, তাদের তৎপরতায় পর্যটক হয়রানি অনেকাংশে কমে এসেছে।
এবার তাকাই অর্থনীতির দিকে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে রয়েছে পর্যটনের ভূমিকা। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল এন্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের পরিসংখ্যান ২০১৭ অনুযায়ী ২০১৬ সালে পর্যটন শিল্প বাংলাদেশের জিডিপিতে ৪২১.৪ বিলিয়ন টাকার সরাসরি অবদান রাখে যা জিডিপির ২.২ শতাংশ। আর সে বছর মোট অবদান ছিল ৮৪০.২ বিলিয়ন টাকা। এছাড়াও চাকরির ক্ষেত্রেও রয়েছে পর্যটনের ভূমিকা। বর্তমানে পর্যটন প্রতক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানে ব্যবস্থা করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ পর্যটন বাৎসরিক ৫০ লাখের কোটা অতিক্রম করেছে অনেক আগেই। অন্যদিকে, অন্তর্মুখী পর্যটকের সংখা প্রায় ৭ লাখ ছাড়িয়েছে।কিন্তু তবুও তা পর্যটনে উন্নত দেশগুলোর তুলনায় নগন্য। বিশ্বের ১৮৫ টি দেশেরমধ্যে বাংলাদেশ পর্যটনে ১৭৩তম। বিশেষজ্ঞদের মতে, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ পর্যটনে একটি সম্মানজনক স্থানে পৌছাতে পারবে।
এদেশের বিভিন্ন স্থানে হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠা, প্রচার-প্রচারণা,সচেতনতা তৈরি, দক্ষ কর্মী উন্নয়নসহ নানা উন্নয়নমুখী পদক্ষেপ পর্যটনকে এগিয়ে নিয়া যাচ্ছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে পর্যকিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে পর্যটন সেবা প্রদানকারী বিভিন্ন সংস্থা যেমন (আটাব, তোয়াব) থাকলেও শিক্ষার্থীদের জন্য জাতীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কোন সংস্থা নেই।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ বেশ কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্বববিদ্যালয় সহ কলেজ এবং কিছু ট্রেনিং ইন্সটিটিউট পর্যটনের উপর উন্নত শিক্ষা-প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শিক্ষার বাহিরে অন্য কিছু করার সুযোগ না পেয়ে নানা ধরণের মানসিক জটিলতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং হীনমন্যতায় ভুগছে। তাই, জাতীয় পর্যায়ে পর্যটন শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সংস্থা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। এমন একটি সংস্থা যেটা সারা বাংলাদেশের সকল পর্যটন বিষয়ক শিক্ষা-প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করবে। তাদের মধ্যকার নেতৃত্ব গুণাবলী, দক্ষতা, দলগত উন্নয়ন এবং পর্যটন বিকাশের মানসিকতা তৈরিতে সাহায্য করবে।
এখানে, আশার বিষয় হচ্ছে,বর্তমানে ঢাকা বিশ্বববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম এন্ড হস্পিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের কতিপয় শিক্ষার্থী এ বিষয়ে কাজ করা শুরু করেছে। তারা ন্যাশনাল ট্যুরিজম স্টুডেন্টস' এসোসিয়েশন নামে জাতীয় পর্যায়ে কাজ করতে সক্ষম একটি পর্যটন শিক্ষার্থী সংস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের এই প্রচেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্বববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সহায়তা প্রদান করছে। ছাত্র-শিক্ষকমণ্ডলীর মতে, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ সংস্থা দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটন বিকাশে অসামান্য ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক: চতুর্থ বর্ষ, ডিপার্টমেন্ট অব ট্যুরিজম এন্ড হস্পিটালিটি ম্যানেজমেন্ট। ফ্যাকাল্টি অব বিজনেস স্ট্যাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।