শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশ
মানব শিশু পরিবারে জন্ম গ্রহন করে। জন্ম থেকেই শিশু একটি শিক্ষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জীবন পরিচালনার সকল শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জন করে থাকে। পরিবার, পরিবেশ ও সমাজ থেকেই শিশু জীবনের সম্যক শিক্ষা ও জ্ঞান পেয়ে থাকে। এই শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্ণধারে পরিণত হয়। তাই শিশুর সঠিক জ্ঞানীয় বিকাশ মানে একটি রাষ্ট্রের সঠিক অগ্রগতি, সুষম বিকাশ। পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে শিশু জন্মদান, পরিচর্যা, শিক্ষা কার্যক্রম ও সামাজিকীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে করা হয়। মাতৃগর্ভ থেকেই শিশুর প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়া হয় যেন শিশুর পূর্ণাঙ্গ মানসিক ও জ্ঞানীয় বিকাশ ঘটে। কিন্তু আমরা শিশুর সুস্থ ও স্বাভাবিক জ্ঞানীয় বিকাশ নিয়ে কতটা সচেতন? কতজন শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশে সঠিক দিক নির্দেশনা দিয়ে উপযুক্ত দায়িত্ব পালন করতে পারি? হয়তো আমাদের এ বিষয়ে জ্ঞানের সল্পতা আছে, কারো কারো সচেতনতার অভাব থাকতে পারে, অথবা পারিবারিক, আর্থিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতার জন্য উপযুক্ত দায়িত্ব পালন করতে পারছি না। এই বিষয়ে আমাদের সঠিক জ্ঞান ও সচেতনতা যথাযথ ভূমিকা পালনে সাহায্য করতে পারে। শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশে আমাদের সামান্য জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়াসে একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বাস্তব সম্মত উপায়ে উপস্থাপনের চেষ্টা করছি।
প্রখ্যাত সুইস মনস্তত্ত্ববিদ জঁ পিয়াজেঁ (Jean Piaget-1896-1980) “The Psychology of the Child” গ্রন্থে শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশ চারটি পর্যায়ে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশ তত্ত্বে দেখিয়েছেন শিশু কিভাবে মানসিক তথা বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ভিন্ন ভিন্ন স্তর অতিক্রম করে। তাঁর তত্ত্ব শুধু শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশ প্রক্রিয়া অনুধাবনের উপর গুরুত্বারোপ করে না বরং শিশুর বুদ্ধিমত্তার প্রকৃতি অনুধাবনে জোর দেয়। তিনি বিশ্বাস করেন শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় শিশু সক্রিয় ভুমিকা পালন করে যেমনটি একজন বিজ্ঞানী পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিশ্ব সমন্ধে জ্ঞান অর্জন করে। শিশু তার চারপাশের পরিবেশের সাথে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞান বৃদ্ধি করে। বিদ্যমান জ্ঞানের উপর নির্ভর করে এবং নতুন তথ্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পূর্বে ধারণকৃত ধারণার সমন্বয় সাধন করে। তিনি চিহ্নিত করেন শিশু বড়দের থেকে ভিন্নভাবে চিন্তা করে। এবং বড় শিশু ও ছোট শিশুর চিন্তার মধ্যে গুণগত ও পরিমাণগত পার্থক্য বিদ্যমান। পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন যে শিশুর বুধিমত্তা বড়দের থেকে কম নয়। এই জ্ঞানীয় বিকাশ ও বুধিমত্তা বিকাশের ক্ষেত্রে শিশু চার পর্যায়ের একটি ক্রম অতিক্রম করে।
জঁ পিয়াজেঁর জ্ঞানীয় বিকাশ তত্ত্বে তিনটি মৌলিক উপাদান লক্ষ করা যায়।
১। Schemas বা জ্ঞানের মৌলিক এককঃ Schemas বলতে তিনি বুঝিয়েছেন জ্ঞানীয় আদর্শ যা বিশ্বের মানসিক চিত্র রূপায়ণে আমাদেরকে সক্ষম করে তোলে। ঝপযবসধং বুদ্ধিমান আচরণের মূল উপাদান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন যা জ্ঞান সংগঠনের উপায় এবং প্রতিটি বস্তু, কাজ ও বিমূর্ত ধারণার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় একজন ব্যক্তি রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কেনার ব্যপারে ঝপযবসধং থাকতে পারে। এখানে ঝপযবসধং হল ব্যক্তির আচরণের সংরক্ষিত রূপ বা ধরণ যার জন্য সে মেন্যু দেখবে, পছন্দের খাবার পেতে অনুরোধ করবে, খাবে ও বিল পরিশোধ করবে। এক কথায় আমরা একে জ্ঞান বলতে পারি।
২। অভিযোজন প্রক্রিয়াঃ আত্তীকরণ, সংগতি রক্ষা ও ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে উত্তরণে সহায়তা করে।
আত্তীকরণঃ আত্তীকরণে শিশু নতুন বস্তু ও পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিদ্যমান জ্ঞান (Schemas) ব্যবহার করে। আমাদের দেশে শিশুদের টাকার প্রতি দুর্বলতা দেখা যায়। তিন থেকে ছয় মাস বয়সের শিশুদের হাতে টাকা দিলে আঁকড়ে ধরে, ফেলে দেয় না। কাগজ দিলে হাতে রাখতে চায় না। কিছুক্ষণ রেখে ঠিকই ফেলে দেয়। মনে প্রশ্ন জাগে এত ছোট বয়সের একটি শিশু কীভাবে বুঝল যে টাকা ফেলনা নয়? তিন থেকে ছয় মাস বয়সের মধ্যে বা এরও আগে শিশুটি তার সাথে মিথস্ক্রিয়া হচ্ছে এমন সব মানুষ বা শিশুটিকে পরিচর্যা (আদর-যত্ন) করছে (মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজন) থেকে টাকার গুরুত্ব সম্পর্কে শুনে শুনে (শ্রবণশক্তির মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করে) টাকা যে মূল্যবান কিছু সে ব্যাপারে অবগত হয়, ধারণা লাভ করে। ফলে শিশু টাকা হাতে পেলে কাক্সিক্ষত বস্তু মনে করে ও টাকাকে আঁকড়ে ধরে। শিশুর হাত থেকে টাকা নিয়ে গেলে বা কেঁড়ে নিলে শিশুকে চিৎকারও করতে দেখা যায়।
ভারসাম্য রক্ষাঃ আত্তীকরণের মাধ্যমে শিশু নিজের জ্ঞান ব্যবহার করে অধিকাংশ নতুন বস্তু, পরিস্থিতি ও তথ্য মোকাবেলা করে। শিশুরা সাধারনত বই থেকে ক বর্ণ শেখা ও ক বর্ণ দিয়ে কলা শব্দ গঠন শেখার আগেই কলা খেয়ে থাকে। ক বর্ণ ও কলা শব্দ শেখার আগেই শিশু কলা বস্তুতি সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান পেয়ে থাকে। ফলে বই থেকে যখন ক বর্ণ শেখানো হয় এবং ক বর্ণ দিয়ে কলা শব্দ গঠন শেখানো হয় ও ছবি দেখে সে ক তে কলা দ্রুত শিখে নেয়।
সংগতি রক্ষাঃ এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান জ্ঞান কাজ না করলে শিশু নতুন বস্তু ও পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিজেকে পরিবর্তন করে। শিশু জন্মের পর থেকেই মা-বাবা সম্পর্কে ধারণা পেতে থাকে। ছয় মাস বয়সের মধেই মা-বাবাকে চিনে নিতে পারে। একটু বড় হয়ে যখন কথা বলতে শেখে তখন মা কিংবা বাবা অবয়ব আকৃতির প্রতিবেশি কাউকে দেখলেই মা অথবা বাবাকে প্রশ্ন করে উনা কে? পুরুষ হলে ও সম্পর্কের ধরণ ঠিক থাকলে মা-বাবা বলে আঙ্কেল আর মহিলা হলে বলে আন্টি। কয়েক বার শেখানোর পর আঙ্কেল আন্টিকে চিনে নেয়।
৩। জ্ঞানীয় বিকাশের পর্যায়ঃ শিশুর আচরণের মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার পর জঁ পিয়াজেঁ একটি তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে জ্ঞানীয় বিকাশের ক্ষেত্রে শিশু চারটি স্বাতন্ত্র্য বুদ্ধিবৃত্তিক ধাপ উত্তরণ করে। প্রথম ধাপের জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে দ্বিতীয় ধাপে পদার্পণ করে। এভাবে চতুর্থ স্তর অতিক্রম করার মাধ্যমে শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশ পূর্ণতা পায়।
ইন্দ্রিয়ানুভূতি পর্যায়
প্রতিটি মানব শিশুই কিছু জৈবিক বৈশিষ্ট্য ও প্রবৃত্তি নিয়ে জন্ম গ্রহন করে। জন্ম থেকে ২ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর ইন্দ্রিয়ানুভূতি হয় ও সে বিভিন্ন বস্তুর সাথে পরিচিত হয়। শিশু প্রথমে শ্রবণশক্তি অর্জন করে। কারণ জন্মের পর শিশু প্রথম মা ও ধাত্রীর কথা শুনে। মা ও পরিচায়িকার মুখ চিনার আগে তাদের কণ্ঠের পরিচয় পায়। তাদেরকে বার বার দেখে পরে মুখ চিনে। মায়ের স্তন ও দুধের ঘ্রাণে পরিচিত জগতের সূচনা হয়। শ্রবণ, স্পর্শ ও দৃষ্টিশক্তির সমন্বয়ে বস্তু চিনে নিতে সক্ষম হয়। মানুষ ও বস্তুর পার্থক্য বুঝে। মোট কথা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে শিশু জ্ঞান অর্জন করে। পরিবেশের সাথে মিথস্ক্রিয়ার ফলে শিশুর অনুভূতি জাগে। আশেপাশের জগত স¤পর্কে ধারণা লাভ করে। খেলনার বস্তু নিজে চিনে নেয় ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রীয়াশীল হয়। কোন কিছু ধরতে পারে, ২ বছর বয়সের মধেই সে হাঁটতে শেখে।
পূর্ব-সক্রিয়তা পর্যায়
শিশুর ২ থেকে ৭ বছর বয়স পর্যন্ত এই পর্যায়ের ব্যাপ্তি। পূর্ব-সক্রিয়তা পর্যায়ে শিশু বস্তুর প্রতীকী চিন্তা করতে শেখে। শব্দ ও ছবি দিয়ে বস্তু চিনতে সক্ষম হয়। যদি শিশুকে ক তে কলম শেখানো হয় সে কলম শব্দকে কলম বস্তুটির প্রতীক মনে করে। কলম বস্তুর সং¯পর্শে প্রতীক কলম ও বাস্তব বস্তু কলমের সমন্বয় সাধন করে কলম যে লেখার সামগ্রী তা চিনে নেয়। এ সময় শিশুকে আত্মকেন্দ্রিক হতে দেখা যায়। সে জন্যই সব কিছু নিজের অধিকারে রাখতে চায়। আমার আমার করে। অন্যের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবনার সূচনা। কোন শিশু মা-বাবার পছন্দ নয় এমন কোন কাজ করে ফেললে মন খারাপ করে। বলে মা/বাবা বকা দেবে। অর্থাৎ ওর কাজটি মা-বাবা কীভাবে দেখছে সে চিন্তা করে। মা-বাবা কোন বস্তু যেভাবে পরিচয় করিয়ে দেয় সেভাবে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করে। শিশুকে আপেল খেতে দিয়ে যখন বলে শেখানো হয় এটি আপেল, শিশু আপেলকে আপেলই বলে। ভাষা শেখার সঙ্গে সঙ্গে যখন চিন্তা করতে শেখে তখন নির্দিষ্ট শব্দ দিয়ে বস্তু চিহ্নিত করে। আমাদের দেশের শিশুরা বর্ণমালা শেখার সময় প্রতিটি বর্ণ দিয়ে এক একটি শব্দ শেখে এবং শব্দগুলো দিয়ে বস্তুর সঙ্গে পরিচয় ঘটে। ভাষা শিক্ষার সূচনা পূর্ববর্তী পর্যায়ে হতে পারে। তবে এ পর্যায়ে ভাষা জ্ঞানের সূচনা সুস্পষ্ট হয়। অভিনয়ের দক্ষতা অর্জন করে। পরিচিত জগত স¤পর্কে ধারণা পাকা হয়। পরিচিত জিনিসগুলো যুক্তিযুক্ত করতে চায়। নতুন জিনিসের প্রতি প্রচ- আগ্রহ দেখা যায়। নতুন সব বস্তু স¤পর্কে জানতে চায়। বার বার প্রশ্ন করে এটা কী? কেন এমন? অন্যের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাসঙ্গিক ও যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা দেয়। খেলনার সামগ্রী দিয়ে নিজের জগত সাজায়।
বাস্তব সক্রিয়তা
৭ থেকে ১১ বছর বয়সে শিশু এই স্তর অতিক্রম করে। সুনির্দিষ্ট ঘটনা যৌক্তিকভাবে ভাবতে শেখে। রক্ষণশীল ধারণা বুঝতে শুরু করে। পিতা-মাতা, শিক্ষক ও গুরুজনকে সম্মান দেখায়। বাসায় অতিথি আসলে আতিথিয়েতা করে ও সৌজন্যবোধ দেখায়। তাদের চিন্তাধারা আরো যৌক্তিক ও সঙ্গবদ্ধ হয়। শিশুকে যদি বলা হয় মানুষ সমাজে বাস করে সে প্রশ্ন করে সমাজ কী? কোন কাজ করতে নিষেধ করলে জানতে চায় কেন নিষেধ। ঘটনা অনুধাবনে আরোহী যুক্তি ব্যবহার করে। প্রতিবেশি দোকান থেকে মজা কিনে নেওয়ার সময় কয়েকবার দোকানিকে আঙ্কেল ডাকলে দূরে বেড়াতে গিয়ে কোন দোকান থেকে মজা কেনার সময় সেখানের দোকানিকেও আঙ্কেল ডাকে। কারণ শিশু মনে করে সব দোকানিই আঙ্কেল। সুনির্দিষ্ট তথ্য স¤পর্কে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছার চেষ্টা করে। আমরা শিশুকে দিক চেনায় যেমন- উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম এবং শেখায় সূর্য পূর্ব দিকে উঠে ও পশ্চিম দিকে অস্ত যায়। শিশু প্রতিদিনই এই ঘটনা দেখে বাস্তবে প্রমাণ পেয়ে সাধারণ সিধান্তে পৌঁছায় যে সূর্য পূর্ব দিকে উঠে ও পশ্চিম দিকে অস্ত যায়। জ্ঞানীয় বিকাশের এই পর্যায়ে শিশু খুব সুনির্দিষ্ট ও আক্ষরিক চিন্তা করলেও যুক্তি ব্যবহারে আরো দক্ষ হয়। আগের পর্যায়ের আত্মকেন্দ্রিকতা ধীরে ধীরে বিলীন হতে থাকে। পরিস্থিতি বিবেচনায় উন্নত চিন্তাশক্তি দিয়ে অন্য মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বিচার-বিবেচনা করে। চিন্তাভাবনা অধিকতর যৌক্তিক হলেও কখনও কখনও অনমনীয় হয়। কোন জিনিস দাবি করলে ( ধরা যাক খেলনার পিস্তল ) সেটা না পাওয়া পর্যন্ত মা-বাবাকে স্বস্তি দেয় না। এমনকি পিস্তল না পেলে খাবে না, স্কুলে যাবে না ইত্যাদি বলে।
বিমূর্ত ও প্রাক্কলিত ধারণাগুলো যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসার প্রাণান্তকর চেষ্টা দেখা যায়। অন্য মানুষের ভাবনা ও অনুভূতি অনুধাবন করতে শিখে। তাদের চিন্তাভাবনা অনন্য মনে করে এবং নিজের অনুভূতি ও মতাদর্শ অন্যের সাথে প্রকাশ করতে চায় না।
আনুষ্ঠানিক/ বাহ্যিক সক্রিয়তা
১২ থেকে তদূর্ধ্ব বছর বয়সের এ পর্যায়ে কিশোর বা তরুণের বিমূর্ত ভাবনার সূচনা হয়। প্রাক্কলিত সমস্যার যুক্তি বিন্যাস করে। নৈতিক, দার্শনিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়াবলী তাত্ত্বিকভাবে উপস্থাপন করে। ঠিক-বেঠিক, উচিৎ-অনুচিত, ভাল-মন্দের সিধান্ত নিতে পারে। সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী ইভ-টিজিং বা বাল্য বিবাহ বা যৌতক প্রথাকে অন্যায় ও নিন্দনীয় কাজ মনে করে। অষ্টম বা নবম শ্রেণির কোন মেয়ের বিয়ে হতে দেখলে ওর বন্ধুরা প্রতিবাদ করে। জাতীয় কবি নজরুল এই বয়সে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে ভেবেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাধারণ বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের নিয়মিত পাঠক ছিলেন।
বিমূর্ত ভাবনার যুক্তি বিন্যাস করে। অবরোহী যুক্তি ব্যবহার করে। যুক্তি-বিন্যাসের মাধ্যমে সাধারণ তত্ত্ব থকে বিশেষ তথ্যে পৌঁছার চেষ্টা করে। সাধারণ সিদ্ধান্ত যেমন সূর্য পূর্ব দিকে উঠে ও পশ্চিম দিকে অস্ত যায় এই ধারণা ভেঙ্গে যায়। বিশেষ সিধান্ত যেমন সূর্য উঠেও না ডুবেও না এবং মহাবিশ্বের প্রতিটি গ্রহ নক্ষত্র নিজ নিজ কক্ষ পথে প্রতিনিয়ত আবর্তন করছে এই সিধান্তে আসে। চূড়ান্ত পর্যায়ে জঁ পিয়াজেঁর তত্ত্বে অধিক যুক্তির ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এবং শিশু যুক্তি বিন্যাসে অবরোহী পদ্ধতি ব্যবহার করে। বিমূর্ত ধারণা অনুধাবন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে মানুষ সমস্যার বহুমুখী কার্যকরী সমাধান দিতে সক্ষম হয়। বিশ্বকে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করার প্রয়াস পায়।
আবদুল আউয়াল, স্কুল শিক্ষক