৩১০টি আবেদন করেও শিক্ষক হতে পারছেন না ভারতী

শিক্ষক
লোগো  © ফাইল ছবি

১৫তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার লিখিত অংশে ৮০ আর ভাইভায় ১৬ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন ভারতী সরকার। তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করেছেন ৩১০টি প্রতিষ্ঠানে। তবে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন থেমে গেছে ভারতীর। সমস্যা সমাধানে একাধিকবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং নিয়োগ সুপারিশ করা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) কার্যালয়ে গেছেন। তবে কোনো পক্ষই তার সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেনি।

ভারতী সরকারের বাবা নেই। টিউশনি করিয়ে অসুস্থ মাকে নিয়ে কোনো রকম জীবনযাপন করছেন। তার বর্তমান বয়স বিবেচনায় পরবর্তী বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলে এই সমস্যার সমাধান হবে। তবে সেই নিশ্চয়তা দেয়নি কর্তৃপক্ষ। সমস্যার সমাধান না হলে আর কখনোই শিক্ষক হওয়া হয়ে উঠবে না তার। তাই দুশ্চিন্তায় প্রতিটি দিন কাটছে ভারতী সরকারের।

গত ১১ মে এনটিআরসিএ’র কার্যালয়ের সামনে কাগজ হাতে বিষণ্ণ মনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ভারতী। সেদিন ভুল চাহিদায় সুপারিশপ্রাপ্তদের দ্রুত পুনঃসুপারিশের দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া অবস্থায়  ভারতী দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, এনটিআরসিএ চাইলেই আমার সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে। আজ চার মাস হলো তাদের কাছে এসে আকুতি জানাচ্ছি। তবে আমার সমস্যার কোনো সমাধান তারা দিচ্ছেন না।

গণিত বিষয়ে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়েও তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠানে আবেদন কেন করেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে ভারতী বলেন, ছোটবেলা থেকেই শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। সেই স্বপ্ন পূরণে সরকারি বিভিন্ন নিয়োগে চেষ্টা করেছি। তবে সফল হতে পারেনি। বয়স শেষ হয়ে যাওয়ায় আর কোথাও আবেদন করতে পারছিলাম না। এনটিআরসিএ আমার স্বপ্ন পূরণের একমাত্র পথ ছিল। আমি পরবর্তীতে আর কোনো প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারতাম না। সেজন্য ৩১০টি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছি।

এ বিষয়ে এনটিআরসিএতে কোনো অভিযোগ করেছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ভারতী বলেন, আমার সমস্যার সমাধান করে আমাকে নতুন করে সুপারিশ করতে আবেদন করেছি। তবে এনটিআরসিএ থেকে আমাকে কিছুই জানানো হয়নি। আমি এনটিআরসিএ’র চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করেছি। কিন্তু তারা কোনো কিছুই বলছে না।

জানা গেছে, তৃতীয় নিয়ােগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হওয়ার পর ভারতী প্রভাষক (গণিত) পদে আবেদন করেন। তার সম্মিলিত মেধাক্রম ৩৯৮ এবং সিরিয়াল ৪৬৬। এক্ষেত্রে নিয়মানুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নিয়ােগের জন্য পৃথক পৃথক আবেদন দাখিল করেন তিনি। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার মেধাক্রম অনুযায়ী তিনি টাঙ্গাইলের আলহাজ্ব শফিউদ্দিন মিঞা এন্ড একাব্বর হােসেন টেকনিক্যাল কলেজে নিয়োগের জন্য সুপারিশ পান। নির্দেশনা অনুযায়ী এনটিআরসিএ বরাবর ভিআর ফরম পাঠান এবং ইতােমধ্যে তার পুলিশ ভেরিফিকেশনও সম্পন্ন হয়। 

আরও পড়ুন: চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তি: শূন্য পদের তথ্য সংগ্রহ শুরু জুনে

পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ ভারতীকে নিয়ােগপত্র প্রদান করেন। গত ১ ফেব্রুয়ারি আলহাজ্ব শফিউদ্দিন মিঞা এন্ড একাব্বর হােসেন কারিগরি কলেজে প্রভাষক (গণিত) পদে যােগদান করেন ভারতী। যােগদানের পর কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটি তার নিবন্ধন সনদ যাচাই করলে ভারতীর সনদটি কলেজের নির্ধারিত পদের জন্য প্রযােজ্য না বলে জানায়। তাই কলেজ কর্তৃপক্ষ ওই মাসের ১৯ ফেব্রুয়ারি তার যােগদান পত্র বাতিল করেন।

ভারতী সরকারের সমস্যা জানতে এনটিআরসিএতে যোগাযোগ করে দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস। প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ভারতী সরকারের সার্টিফিকেট গণিত (জেনারেল)। তবে তিনি যে প্রতিষ্ঠানে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন সেটি কারিগরি (বিএম) শাখার। এর ফলে তার যোগদান নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ভারতী সরকার বলেন, আমি প্রথমবারের মতো আবেদন করেছি। আবেদন করার সময় নাম রোল রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার পর বিএম এবং জেনারেল মাদ্রাসা একসাথে প্রদর্শন করায় আমি সবগুলোতে আবেদন করেছি৷  ফলে এই দায় আমার একার না। এনটিআরসিএ কেন আমাকে এই পদে সুপারিশ করল? তাদের কাছে আমার সনদ ছিল। কর্তৃপক্ষ এটি যাচাই করতে পারত। তারা এটি না করে আমাকে সুপারিশ করেছে। আমার শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছে। 

তিনি বলেন, তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তির ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এনটিআরসিএ কর্তৃক প্রাপ্ত বিষয়ভিত্তিক সনদের ভিত্তিতে সনদধারী ই-এডভারটাইজমেন্টে প্রদর্শিত তার সংশ্লিষ্ট বিষয়/বিষয় সমূহের বিপরীতে তালিকায় বর্ণিত সকল প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারবেন।’ আর ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রাপ্ত আবেদনসমূহ সরকারি বিধি-বিধান অনুসরণ করে সমন্বিত জাতীয় মেধাতালিকা হতে মেধার ভিত্তিতে বাছাইয়ের পর নিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান বরাবর সুপারিশপত্র প্রেরণ করা হবে’। 

তিনি আরও বলে এনটিআরসিএ বিশেষ গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। সেখানে তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, প্রার্থীকে আবশ্যিকভাবে কেবলমাত্র তার শিক্ষক নিবন্ধন সনদে উল্লেখিত বিষয়  এবং সংশ্লিষ্ট পদ ও প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে হবে। অথচ তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে এনটিআরসিএ এই বিষয়টি উল্লেখ করেনি। তারা বিষয়টি উল্লেখ করে দিলে আমাকে এই সমস্যার মধ্যে পড়তে হত না।

আরও পড়ুন: বিশেষ গণবিজ্ঞপ্তির ফল ঘোষণা করবেন শিক্ষামন্ত্রী

ভারতী আরও বলেন, তারা আমাকে যেভাবে আবেদন করতে বলেছে আমি ঠিক সেভাবেই আবেদন করেছি। ধরে নিলাম আমি আবেদনের ক্ষেত্রে ভুল করেছি। তবে ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে এনটিআরসিএ নিজেই বলেছে, তারা আমাদের আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ করবে। তাহলে আমার প্রশ্ন হলো এনটিআরসিএ কেন আমার আবেদন যাচাই করেও বিএম প্রতিষ্ঠানে সুপারিশ করল। আমি যখন আবেদন করেছিলাম তখন সফটওয়্যারে সাধারণ কোটা এবং বিএম আলাদা করার ব্যবস্থা ছিল না।

এসব বিষয়ে জানতে এনটিআরসিএ’র চেয়ারম্যান এনামুল কাদের খানের ব্যবহৃদ মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে এনটিআরসিএ সদস্য (শিক্ষাতত্ত্ব ও শিক্ষামান) এ বি এম শওকত ইকবাল শাহীনকে ফোন দেওয়া হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সর্বশেষ এনটিআরসিএ’র সচিব ওবায়দুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ভারতী সরকারের বিষয়টি আমাদের জানা নেই। বিষয়টি নিয়ে চেয়ারম্যানের সাথে আলোচনা করে জানাবেন তিনি।


x