ভিসিদের দুর্নীতি বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশাদার নীতির অবক্ষয়

রাবি ভিসি
অনিয়মের কারণে বেশ সমালোচনায় রাবির সদ্য বিদায়ী ভিসি

বিশ্ববিদ্যালয় হলো উচ্চ শিক্ষার বিদ্যাপীঠ, যেখানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়ে থাকে। কোন কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এম ফিল ও পি এইচ ডি ডিগ্রিও প্রদান করা হয়। এ সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের আসনে থাকেন চ্যান্সেলর বা আচার্য যিনি পদাধিকার বলে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হয়ে থাকেন এবং ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) যিনি আচার্য কর্তৃক মনোনিত হয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়ে থাকেন।

ভিসি বা উপাচার্যগন সাধারণত কোন না কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত  মেধাবী এবং প্রশাসনিক কাজে দক্ষ ও অভিজ্ঞ চৌকশ প্রফেসরদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হন। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আচার্য বা চ্যান্সেলর হয়ে থাকেন রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে শিক্ষামন্ত্রীও আচার্য পদে সমাসীন হতে পারেন। সকল ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ বোর্ড হিসেবে কাজ করে থাকে ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশন (ইউজিসি) বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত ভাইস চ্যান্সেলর বা উপাচার্যগণ হবেন দায়িত্বে কর্তব্যপরায়ণ,  কাজে নিষ্ঠাবান, কর্মসম্পাদনে সৎ, প্রশাসনে নীতিবান, নেতৃত্বে অতুলনীয়, নির্লোভ, ন্যায়পরায়ণ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ, জবাবদীহি তথা এক কথায় তিনি হবেন সকলের জন্য এক আদর্শিক রোল মডেল। এটি সর্বসাধারণের প্রত্যাশা। অনেক ভিসি এমনটাই হয়েছেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের দেশে রয়েছে ভূরি ভূরি। কিন্তু কালক্ষণে কিছু কিছু উপাচার্যের আচরণ ও কর্মকান্ডে দুর্নীতির এমন এক পরিসীমা অতিক্রম করে থাকে , যার ফলে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষক সম্প্রদায়সহ সমগ্র জাতির মাথা লজ্জায় হেট হয়ে যায়। ইদানিং বাংলাদেশে এটি প্রায়শই লক্ষণীয়। 

সাম্প্রতিক একটি জরিপে প্রকাশ পেয়েছে যে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য বিদায়ী উপাচার্য ছাড়াও দেশের আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত শুরু হয়েছে। কাজটি করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভিভাবক সংস্থা হিসেবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হচ্ছে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে শেষের দুটির সাবেক এবং প্রথম ছয়টির বর্তমান উপাচার্যের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এর বাইরে আরও ১৩ উপাচার্যের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে তদন্ত শেষ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন।

মোট ২১ উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের বেশির ভাগই স্বজনপ্রীতি, নিয়োগ, ভবন নির্মাণ ও কেনাকাটায় আর্থিক দুর্নীতিসংক্রান্ত। আইনে সংশোধন ও শর্ত শিথিল করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করে আগের জায়গায় আইন ফিরিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। পত্রিকার মাধ্যমে উপাচার্য কর্তৃক ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে অবৈধভাবে শিক্ষক বহিষ্কার ও অপসারণের মতো তুঘলকি কাণ্ডও আমরা জানতে পারছি। 

প্রাসঙ্গিক হিসাবে এখানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য তার শেষ কর্মদিবসে ১২৫ জনকে নিয়োগ দিয়ে গেছেন। এই নিয়োগকে মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে অবৈধ বলেছে। এর আগে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে নিয়ে যে দুর্নীতি কেলেংকারীকেও এটি হার মানিয়েছে। দেশে বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪৯। ইউজিসি থেকে সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দেওয়া এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অন্তত ১০ ধরনের অনিয়ম ঘটে থাকে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-পূর্বানুমতি ছাড়া নতুন বিভাগ খোলা, অনুমোদন ছাড়াই অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ, এক খাতের টাকা অন্য খাতে ব্যয়, টেন্ডার ছাড়া কেনাকাটা ইত্যাদি।

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা নিঃসন্দেহে পীড়াদায়ক। দেশে দুর্নীতির বিস্তার আর যেখানেই হোক না কেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেতো হওয়া মোটেই প্রত্যাশিত নয়। উপাচার্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার বিষয়টিতো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। জ্ঞানের আলোয় সমাজকে আলোকিত করার মহৎ দায়িত্বে নিয়োজিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদবিধারীরা যদি অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হন, তবে জাতির আর ভরসা করার জায়গা থাকে কোথায়? একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশেষ সুনাম ও মর্যাদা ছিল, যা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অতীত গৌরব ও ঐতিহ্যের কোনো কিছুই আজ আর অবশিষ্ট নেই। এর কারণ সম্ভবত ছাত্ররাজনীতির দৌরাত্ম্য ও ঢালাওভাবে সবকিছুর দলীয়করণ। বর্তমানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ও শিক্ষক ছাড়াও নিয়োগ প্রক্রিয়ার অধিকাংশই সম্পন্ন হয় দলীয় বিবেচনায়।

দেখা যায়, নিয়োগপ্রাপ্তরা দলের প্রয়োজনে বেপরোয়া ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়াসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িত হতেও দ্বিধা করেন না। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম পরিচালনার দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় কতিপয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ভর্তি ও সনদ বানিজ্যের অভিযোগ থাকলেও উপাচার্যদের বিরুদ্ধে বড় রকমের কোন দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম, নিয়োগ বানিজ্য ও সীমাহীন অনৈতিক কর্মকান্ডের তেমন সিরিয়াস কোন অভিযোগ পাওয়া যায় না।

উপাচার্যরা কেন এবং কীভাবে এ জাতীয় দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন, সেটি নিয়ে গবেষণা হওয়া খুবই স্বাভাবিক। পত্রিকায় উপাচার্যদের অনিয়মের যে খবর প্রকাশিত হচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সম্পর্কে একধরনের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে। এমনকি সৎ হিসেবে পরিচিত অনেক উপাচার্যও পত্রিকার এসব সংবাদে বিব্রত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের শিক্ষা, জ্ঞান, গবেষণা এবং সর্বোপরি পদের সঙ্গে বড়ই বেমানান। এটি প্রফেশনাল এথিক্সের মারাত্মক লংঘন।

কারণ, উপাচার্য এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যনির্বাহী প্রধান, যেটিকে শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বলা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিত্য-নতুন জ্ঞান সৃষ্টি হয়, জ্ঞানের চর্চা হয়, গবেষণার ফলকে মানবকল্যাণে ব্যবহারের পদ্ধতি হিসেবে আবিষ্কৃত হয়, শিক্ষার্থীদেরকে তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক জ্ঞান দানের পাশাপাশি সংস্কৃতিমনা এবং মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে তৈরি করা হয়। এক কথায়, বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞান ও মানবসম্পদ তৈরির তীর্থস্থান। আর এখানে নেতৃত্বে দিতে হয় একজন উপাচার্যকেই। শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি উপাচার্যকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিষয়টিও দেখতে হয়। এটিও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সামলাতে হয়, কারণ এই কাজগুলো শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শিক্ষা প্রশাসনকে সুচারুভাবে পরিচালনা করা একজন উপাচার্যের মৌলিক দায়িত্ব।

উপাচার্যকে শিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি আর্থিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সঙ্গে লিয়াজোঁ করতে হয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করতে হয় এবং সর্বোপরি সরকারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে একযোগে কাজ করতে হয়। শিক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ, গবেষণায় দক্ষ, প্রকল্প পরিচালনায় চৌকস এবং প্রশাসন পরিচালনায় অভিজ্ঞ এসব গুণাবলিসম্পন্ন একজন যোগ্য ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব এই দায়িত্বগুলো সুচারুভাবে পালন করা।

উপাচার্যদের এরুপ নির্লজ্জ-বেহায়পনার দুর্নীতির খবরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় নৈতিকতার মান এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে ভিসিদের এহেন নৈতিক পদস্খলনের পিছনে ইউ জি সি প্রদত্ত  নীতিমালা না মেনে দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য ও অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে দায়ী করেছেন। বিভিন্ন তথ্যে দেখা গেছে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদ শুন্য হলে স্বীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দলীয় প্রফেসররা অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে স্ব স্ব লোবিষ্ট নিয়োগ করে ভিসি হওয়ার প্রতিযোগিতায় দৌড় ঝাপ করে থাকেন এবং অবশেষে যার লোবিং যত শক্তিশালী তিনিই ভিসি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। এই যদি হয় ভিসি নিয়োগের প্রক্রিয়া। দুর্নীতিতো হবেই। একদিকে তিনি যে টাকা দিয়ে পদ কিনেছেন সে টাকা উসুল করতে হবে এবং অন্যদিকে যাদের ছত্র ছায়ায় ও যাদের মদদে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়েছেন মাসে মাসে বা ক্ষণে ক্ষণে তাদেরকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে খুশি রাখা হয়ে যায় নিয়োগ প্রাপ্ত ভিসির রুটিন কাজ। এত টাকা তিনি কিভাবে দিবেন! তাইতো কারনে  অকারনে নিয়োগ বোর্ড বসিয়ে এবং টেন্ডার দিয়ে উক্ত অর্থ উপার্জন তার জন্য অনিবার্য হয়ে ওঠে। ফলে এভাবে তারা দ্রুত দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং ঘটে যায় পুকুর চুরির মত তুলকালাম কান্ড। এটির কোনটিই হয়ত হতোনা, যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষক-কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রফেশনাল এথিক্স বা পেশাদার নীতির শিক্ষা বা নীতি চর্চার প্রশিক্ষণ প্রদান করা হতো।

সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ে উপচার্যের মত অন্যান্য নীতি নির্ধারণী ও শিক্ষকের পদগুলিতে নিয়োগ দানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নীতি-নৈতিকতা অবলম্বন করা আবশ্যক- এটি প্রফেশনাল এথিক্সের অন্যতম বিষয়। উপাচার্য হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও এডমিন হেড তথা সর্বোচ্চ কর্তা ব্যক্তি। তিনি হবেন শিক্ষার পরিবেশ ও মান উন্নয়নে এক আলোকময় স্বপ্নদ্রষ্টা। বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট অন্যদেরও স্বপ্ন দেখাবেন। সর্বপরি, এবং এই স্বপ্নপূরণে দক্ষ নেতৃত্বের প্রোকাষ্ঠা তৈরি করবেন। 

একজন উপাচার্য হবেন নীতি-নৈতিকতার মূর্ত প্রতিক। তার নীতি ও আদর্শ দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা,  কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা হয়ে উঠবেন তাঁর সুনীতি ও আদর্শের সৎ অনুসারী। বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যতম কাজই হলো শিক্ষা কার্যক্রম। সেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সবাই পাঠদানের সঙ্গে যুক্ত। কাজেই উপাচার্যকে হতে হবে রোল মডেল শিক্ষাবিদ, যাঁকে সবাই আদর্শ মেনে শিক্ষা কার্যক্রমকে গতিশীল রাখবেন এবং নৈতিক উন্নয়ননের একনিষ্ঠ চর্চা করবেন। উপাচার্যকে নিজের কাজের প্রতি সৎ ও নিবেদিত থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কাজ দুটোকেই ভালোবাসতে হবে এবং পরিকল্পনামতো কাজ করে যেতে হবে। কাজে স্বচ্ছতা থাকতে হবে এবং অবশ্যই অবশ্যই উপাচার্যকে আর্থিক ও নৈতিকভাবে সৎ হতে হবে। তাহলে দুর্নীতি যেমন দূরীভূত হবে তেমনি নৈতিক অবক্ষয়রোধে শিক্ষার্থীদের মাঝে সততার শিক্ষা দেয়াও সম্ভব হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় চিন্তা ও গবেষণার এক মহান লালন ক্ষেত্র। শ্রেণিকক্ষে ও ল্যাবরেটরিতে শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো গবেষণা, যা বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করে তোলে। বিভাগ ভিত্তি সাহিত্য, সংস্কৃতি,  ধর্ম, রাজনীতি, ভূগোল, ইতিহাস বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অবাধ গবেষণা ও মোলিক চর্চা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রধান দিক যা বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সুউচ্চ আসনে  পৌঁছাতে সাহায্য করে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত বর্তমান যুগে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে তুমুল প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সরকারি কোষাগার থেকে টাকা এলেও গবেষণার জন্য বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় দেশি-বিদেশি, সরকারি-বেসরকারি ফান্ড সংগ্রহ করে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে চুক্তি করে যৌথভাবে গবেষণা সম্পন্ন করে থাকে। এসব ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান হিসেবে উপাচার্যকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হয়। গবেষণা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তি উপাচার্য হলে এই জাতীয় ফান্ড সংগ্রহ এবং চুক্তির ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাবে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচিতি ও আর্থিক বানিজ্যের দিকে না তাকিয়ে একজন দক্ষ এবং কৌশলী প্রশাসক ব্যক্তিকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়াও একধরনের প্রফেশনাল এথিক্স। নীতি মেনে নিয়োগ হলেই তিনি একজন যোগ্য অভিভাবক হিসেবে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী তথা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সবাইকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতো ভাবতে পারেন এবং ব্যক্তিগত আক্রোশে প্রতিশোধ, শাস্তি বা বহিষ্কারের মতো গর্হিত কাজ থেকে বের হয়ে আসতে পারেন। 

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সকল শিক্ষকদের প্রফেশনালন এথিক্স বা পেশাদার নৈতিকতার জ্ঞান প্রদান করা এখন সময়ের দাবি। আমরা জানি প্রফেশনাল এথিক্স বা পেশাদার নৈতিকতা হলো এমন নীতি যা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশে কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আচরণ পরিচালনা করে। মূল্যবোধগুলির মতো, পেশাদার নীতিগুলি এমন পরিবেশে অন্য ব্যক্তির এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি কীভাবে আচরণ করা উচিত সে সম্পর্কে নিয়ম সরবরাহ করে। পেশাদারিত্বের কিছু সর্বজনীন নীতি রয়েছে যা সকল পেশায় প্রযোজ্য, যেমন; সততা, বিশ্বাসযোগ্যতা, আনুগত্য, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা, আইন মেনে চলা, অন্যের কল্যান করা, কারোর ক্ষতি সাধন না করা, দায়িত্বের প্রতি সচেতন থাকা এবং সকলের প্রতি ন্যায়পরায়ণ থাকা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তথা যে কোন প্রতিষ্ঠানের নেতা সহজ কথায় সমুদ্রে নৌকার মাঝির মত। মাঝি যেমন তার দক্ষ নেতৃত্বে সততার সাথে নৌকা পরিচালনা করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে সামনের দিকে এগিয়ে চলেন তেমনি একজন ভিসি বা নেতা তার সততা ও দক্ষতা দিয়ে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে নৈতিক উন্নয়নে উদবুদ্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্মুখপানে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। ফলে শিক্ষাঙ্গনে যেমন শিক্ষার মান বজায় থাকবে তেমনি শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা পেশাগত জীবনে একাগ্রতা, একনিষ্ঠতা, সততা ও নৈতিকতার মানদন্ডে নিজেদেরকে দীক্ষিত করে আদর্শ ব্যক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। অতএব ভাইস চ্যান্সেলর ও অন্যান্য সকল পদের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি রোধকল্পে প্রফেশনাল এথিক্স এর শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ অতিব আবশ্যক। এক্ষেত্রে সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদেরকে জবাবদিহিতামূলক ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

প্রবন্ধিক: শিক্ষা গবেষক ও প্রিন্সিপাল, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ঢাকা