তবে কেন পুরুষ নির্যাতন চলতেই থাকবে?

হুরায়রা শিশির
হুরায়রা শিশির © সংগৃহীত

কিছু হাসব্যান্ড আছেন, বউকে মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসেন। অনেক অন্যায়-অত্যাচার ও বাজে ব্যবহার মাফ করে দেন, ভালোবাসার জায়গা থেকে। কিন্তু বউ! ওই বোঝা, ভালোবাসা আর উদারতার জায়গাটা দুর্বলতা ভাবেন। অপমান বাড়িয়ে দেন ক্রমান্বয়ে। উল্টো, তাকেই কষ্ট দিতে থাকেন কর্কশ বা রাগী কথা বলে বলে। তখন একটা সময় স্বামী নিতে পারেন না।

এতো তুচ্ছ তাচ্ছিল্য নিতে নিতে প্রচন্ড ঘৃণা পেয়ে বসে। তখন হঠাৎ সুনামির মত খেপে যান। আত্মসম্মানের জায়গাটায় নিঃশ্বাস আটকে পড়ে... আর কত! কেবল ঝড়ের তান্ডব তুলেই শান্ত হন তখন। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। বউ বুঝতে পারেন, এতোদিন কি মর্মান্তিক মানসিক নির্যাতন দিনের পর দিন করেছেন না বুঝে। ক্ষমা চান, অনুশোচনা হয়। স্বামীকে মানুষ মনে করেন তখন সব হারিয়ে।

কিন্তু সুনামি তো তাদের ঘর ভেঙ্গে দিয়ে গেছে। এখন কোথায় ফিরবেন তিনি! স্বামীর ঘরের দরজা বন্ধ! স্বামী বেচারা হয়তো আর বিয়েই করতে চান না। একা জীবন খুব হালকা আর আনন্দের মনে হতে থাকে। মনে হয় নিঃশ্বাস নিতে তো পারছি।

দিন শেষে বাড়ি ফিরে নিজের কাজগুলো করতে হচ্ছে, কাল কি খাবে কোন কাপড় পড়বে ভাবতে হচ্ছে। কিন্তু স্যুট-কোর্ট পরে পেট পুরে খেয়ে বাইরে গিয়ে কাজে মন না বসিয়ে দিন দিন ডিপ্রেশন একটা সময় সুইসাইডের চিন্তা তো হচ্ছে না।

সমাজ শুধু জানে, নারীরা পুরুষের অত্যাচারে কাঁদেন এবং নিপীড়িত হন। অবশ্যই বর্বর পুরুষের এমন একটা সংখ্যা আছে। যুগ যুগে, যাদের জন্য নারীর জীবন দুর্বিষহ-বিধস্ত। কিন্তু পয়সার এক পিঠ না! অন্য পিঠও  আছে। অন্য পিঠে, হাজার হাজার পুরুষ আছে। হাহাকার আছে মনের। তাদের নির্যাতনের গল্পগুলো কিন্তু যুগ যুগের পুরানো।

কিন্তু ছেলেরা ধৈর্য ধরে কষ্ট এবং অপমান লুকিয়ে রাখেন লজ্জায়। তারা তাদের পরিবার, বউ এবং নিজের গোপনীয় বিষয়গুলো প্রকাশ্যে আনতে চান না। প্রকাশের স্বাধীনতা তাদেরও তো আছে তাই না? কিন্তু প্রকাশ করেন না, তার যন্ত্রণা সবার সামনে।

এর চেয়ে ধুকে ধুকে মরে যাওয়া, সমাজ থেকে হারিয়ে যাওয়া, পরিবারে নিঃসঙ্গতা হওয়া, একা একা নিজের জীবনের মাঝে নিজেই হারিয়ে যাওয়া মনে করেন সম্মানের। নয়তো ঘরের কথা জনে জনে জানলে নুড অথবা অসম্মান ফিল করবেন।

খুব ছোট করে এই হল, সমাজের পুরুষ নির্যাতনের ভাষা এবং প্রকাশ। খুব অসহায়! আমি কাজ করি সম্পর্ক এবং বিয়ে নিয়ে। আমার খুব খুব কাছে থেকে পুরুষ নির্যাতন, পুরুষ এবং পুরুষের বোবা যন্ত্রণা দেখার সুযোগ হয়েছে; বলেই হয়তো আমি এইভাবে বললাম। যা বলাও সমাজের বাধা! কুসংস্কার! 

পুরুষ! পুরুষের আবার লজ্জা, কষ্ট, যন্ত্রণার কি আছে? পুরুষ তো লোলুপ চোখ দিয়ে নারীকে দেখতেই থাকে আর কষ্ট দিয়েই কুল পাচ্ছেন না? কিন্তু নারী! সব নারী কি বেগম রোকেয়া! নারীরও তো ভিন্ন ভিন্ন রুপ আছে।

নারীরও তো শুমিতাদেবী, সানিলিউন, তাসলিমা নাসরিন, পরিমনি বা মাদার তেরেসা, মা জাহানারা ইমাম, রানী ভিক্টোরিয়া বিভিন্ন রুপ, জোস-পদবি-কর্ম-গুণ-কাজ-সুখ্যাতি বা কুখ্যাতি আছে, তাই না? তবে কেন পুরুষ নির্যাতন চলতেই থাকবে? পুরুষ নির্যাতন চলতে থাকবে, কথা বলা যাবে না!

কথা যদি হয়, তবে নারী বা পুরুষ সবার জন্য কথা হতে হবে। বিয়ে কেবল নারী পুরুষ একসাথে থাকার চুক্তিপত্র না। বিয়ে হলো নারী এবং পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, একটি টিম আগামীতে সন্তান নিয়ে ভালো থাকার। আর সম্মান, ভালবাসা, ত্যাগ-মান অভিমান, সহমর্মিতা, বিশ্বাস, যত্ন হলো তার ভিত্তি এবং সাধনা। তবেই তো সংসার হবে ভালবাসার। 

লেখক: বিয়ে এবং সম্পর্ক বিষয়ক পরামর্শক