করোনা: পেট ভরে না ঘোড়ার, চলে অমানবিক নির্যাতন

চট্টগ্রামের ওয়্যারলেস এলাকায় ঘোড়াদের ময়লার ভাগাড়ে ছেড়ে দিয়েছেন
করোনায় আয় কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের ওয়্যারলেস এলাকায় ঘোড়া ছেড়ে দিয়েছেন মালিকগণ  © টিডিসি ফটো

ঘোড়া দিয়ে বরযাত্রীর ঘোড়ার গাড়ি শকট তৈরী কিংবা সমুদ্র সৈকতে বাড়তি বিনোদন পেতে ঘোড়ার পিঠে চড়ার আগ্রহ যেন বাঙালির চিরচেনা ঐতিহ্য। কিন্তু করোনার প্রাদুর্ভাবে একদিকে সমুদ্র সৈকতে নেই আগের মতো দর্শনার্থী অন্যদিকে বিয়ে বাড়িতেও নেই পুরোনো সেই ঐতিহ্য। যার ফলে আয় না থাকায় বিপাকে ব্যবসায়ী ঘোড়া মালিকেরা। অর্থাভাবে খাবার জুটছে না বাণ্যিজ্যিক উদ্দেশ্যে পালন করা এসব ঘোড়ার পেটে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রাণিকল্যাণ কর্মীদের পোস্ট করা কিছু ছবিতে দেখা যায়, খাবার দিতে না পারায় চট্টগ্রামের ওয়্যারলেস এলাকায় ঘোড়াদের ময়লার ভাগাড়ে ছেড়ে দিয়েছেন ঘোড়ার মালিকগণ। বেঁচে থাকার কঠিন লড়াইয়ে ময়লার ভাগাড় থেকে খাবারের সন্ধানে ছুটছে অভুক্ত ঘোড়াগুলো।

এছাড়া সরেজমিনে নগরীর সাগরিকা, ওয়্যারলেস ও পতেঙ্গা এলাকায় ঘোড়ার খামারে দেখা মেলে অভুক্ত ঘোড়াগুলোর করুণ দশার চিত্র। দেখে বোঝার উপায় নেই এগুলো দ্রুতগামী চতুষ্পদ প্রাণী। খাদ্যাভাব ও পুষ্টিহীনতায় পাজরের হাড় বেরিয়ে আসা এসব ঘোড়াগুলোকে প্রথম দেখায় যে কেউ গরুর বাছুর মনে করে ভুল করতে পারে। করোনায় এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি এসব ঘোড়া ও ব্যবসায়ী মালিকরা। নির্বিকার অভুক্ত এসব ঘোড়াগুলোর কোনটির চামড়ায় ক্ষত, কোনটির চোখ দিয়ে ঝড়ছে পানি। বোবা জীবনের চাপা আর্তনাদে ধুকছে এসব ঘোড়া।

নগরীর সাগরিকা এলাকায় এক ঘোড়া ব্যবসায়ী জানান, একদিনে একটি ঘোড়ার ৮ থেকে ১০ কেজি খাদ্যের দরকার হয়, খাদ্য তালিকায় আছে বার্লি, ঘাস ও ভুসি। কিন্তু আয় না থাকায়, ঘোড়াগুলোকে১ বস্তা কুঁড়া আর ২ বস্তা ভুষি এনে তিনদিন ধরে খাওয়াতে দিচ্ছি। সামান্য খাবারে পেট ভরছে না এসব ঘোড়ার।

ওয়্যারলেস এলাকার আরেক ঘোড়া ব্যবসায়ী বলেন, করোনায় আমরাই খেতে পারছি না, পর্যটক না থাকায় আয় বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি নিজেদের ঘর-সংসার চালাতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। ঘোড়ার খাবার কিভাবে দিব?। সরকার যদি আমাদের আর্থিক সহযোগীতা করে তাহলে ভালো হয়। তাছাড়া খাবার না খেতে পেরে ঘোড়াগুলো মারা যাবে।

খাবার না পেয়ে ময়লা-আবর্জনায় মুখ দিচ্ছে ঘোড়া

বাণিজ্যক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা এসব ঘোড়ার উপর চলে অমানবিক নির্যাতন ও। অধিকাংশ ঘোড়া মালিকই জানেন না ঘোড়া প্রতিপালনের সঠিক নিয়ম। নেই যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। রোগাক্রান্ত ঘোড়ার চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের বিষয়টিও চরমভাবে উপেক্ষিত।।অর্থাভাবে চিকিৎসা না করিয়ে ঘোড়াদের পরিত্যক্ত করেন অনেক ঘোড়ার মালিক। পরিত্যক্ত এসব ঘোড়াদের জন্য নেই আলাদা আশ্রয়স্থল।শুধু তাই নয়, এসব ঘোড়া মালিকদের নেই সুবিশাল ঘোড়াশাল। সারাদিনের ভারবহনের পর, একটু নিজের মত বিশ্রাম নিতে পারাও হয়ে ওঠেনা এসব ঘোড়ার।

এ প্রসঙ্গে পিপল ফর এনিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাণীকল্যাণ কর্মী স্থপতি রাকিবুল হক এমিল বলেন, প্রাণীকল্যাণ আইন ২০১৯ এর ধারা ৮ অনুযায়ী অতি দ্রুত একটি বিধিমালা প্রস্তুত করে ঘোড়ার শ্রমকে সরকারের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর-এর নজরদারিতে আনা জরুরী। অপরদিকে বাংলাদেশে ঘোড়ার মত প্রাণির চিকিৎসা উপকরণ, অভিজ্ঞ প্রাণিচিকিৎসক নিশ্চিতকরণ ও বৃদ্ধ বা কর্মক্ষম ঘোড়ার পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে মাঠ পর্যায়ে ঘোড়ার যথেচ্ছা ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

চট্টগ্রামের প্রাণিকল্যাণ সংগঠন Society Of Rise For Paws and Claws এর সভাপতি তৃষা ভট্টাচার্য বলেন, 'খাদ্যাভাব ও পুষ্টিহীনতায় পাজরের হাড় বেরিয়ে আসা এসব ঘোড়ার উপর তার ওজনের চাইতে বেশি বোঝা ( মানুষ ) টানতে বাধ্য করা হয়, যেতে না চাইলে বা একটু বিশ্রাম চাইলে বেড়ধক পেটানো হয়'।এই যুগে এসেও এমন অমানবিক কাজের জন্য আমাদের লজ্জিত হওয়া উচিৎ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলার প্রাণিসম্পদ অফিসার ডাঃ মোহাম্মদ রেয়াজুল হক মুঠোফোনে দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বৈশ্বিক মহামারির ফলে বর্তমানে আমাদের দেশ সহ বিভিন্ন দেশে একটা সংকটময় অবস্থা বিরাজ করছে। করোনায় আয় কমে যাওয়ায় ঘোড়া মালিকরা তাদের ঘোড়ার খাবার দিতে পারছেন না এ বিষয়ে আমরা অবগত। আমরা সংকটকালীন এসময়ে কিভাবে ঘোড়াগুলোকে রক্ষা করা যায় সেটি চেষ্টা করছি। ভবিষ্যতে এমন সংকট হলে ঘোড়াকে কিভাবে সুরক্ষা দিতে হবে সেটি নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে আমাদের।

তিনি আরও বলেন, বানিজ্যিক উদ্দেশ্য যারা ঘোড়া পালন করেন তারা প্রতিকূল অবস্থায় কিভাবে ঘোড়াকে সুরক্ষা দিবেন এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) উপাচার্যের সাথে আমি কথা বলে একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবো।


মন্তব্য