০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১:২৭

নির্বাচনের ৬০ ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বোয়িং চুক্তি স্বাক্ষর

প্রতীকী ছবি  © টিডিসি সম্পাদিত

ওয়াশিংটন ডিসিতে সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকালে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। যার মেয়াদ আগামী ১০ বছর। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ৭২ ঘন্টা আগে এই চুক্তি অন্তর্বর্তী সরকারের কূটনৈতিক ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া বলেই বিবেচিত হচ্ছে।

চুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ১৪টি বোয়িং বিমানের জন্য ৩.৭ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৫,০০০ কোটি টাকা)। বিশ্লেষক অর্থনীতিবিদ এবং আইনবিজীবীরা একে "নীতির মৌলিক লঙ্ঘন" বলে অভিহিত করেছেন।

এই চুক্তির মাধ্যমে দেশে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স জেট অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স দীর্ঘস্থায়ী বহরের সংকট সমাধান এবং পতাকাবাহী বিমানের ভবিষ্যত সুরক্ষিত করার জন্য এটিকে অপরিহার্য বলে দাবি করা হয়েছে। বাস্তবে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী বাণিজ্য নীতি মোকাবিলার জন্য বহু-বিলিয়ন ডলারের রাষ্ট্রীয় দায়কে "কূটনৈতিক মুদ্রা" হিসেবে ব্যবহার করছে। একই সাথে দেশীয় প্রতিযোগিতামূলক আইন উপেক্ষা করছে। এর মাধ্যমে বিমানের জন্য একটি ভয়াবহ বৈশ্বিক সুরক্ষা রেকর্ড উপেক্ষা করছে এবং জাতীয় কোষাগারের জন্য হুমকিস্বরূপ ঋণের পাহাড় তৈরি হয়েছে।

এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিমান চলাচল কৌশলের বিপরীত। বিমান বহরে ভিন্নতা আনতে বোয়িংয়ের পাশপাশি এয়ারবাস কেনার উদ্যোগ নেয় তৎকালীন আওয়ামী সরকার। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে, ফরাসি রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সফরে ১০টি এয়ারবাস A350 ওয়াইড-বডি কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হয় ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধ। এ সময় ওয়াশিংটন প্রথমে বাংলাদেশি রপ্তানির উপর ৩৭% প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপের হুমকি দেয়। ফলে তৈরি পোশাক খাত পড়ে হুমকির মুখে। তিন দফা আলোচনার মাধ্যমে হুমকি এই শুল্ক নামে ২০ শতাংশে। যদিও এই হার ১৫ শতাংশ হওয়া উচিত বলে মনে করেন অনেকে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশ্লেষকরা বলছেন, শুল্ক ত্রাণের মূল্য "পোশাকের জন্য তুলা" এবং ২৫টি বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনছে। এখন যে ১৪টি বিমান চূড়ান্ত করা হচ্ছে তা হলো প্রথম কিস্তি। এই পদক্ষেপটি ২০২৫ সালের জুন মাসেই নেয়া হয়। তবে ওই চুক্তি প্রকাশ্যে আসেনি। কারণ ইউরোপীয় কূটনীতিকদের বিরাগভাজন হতে চায়নি সরকার।

৩.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণের অর্থায়নের জন্য, সরকার নিজেদের জিম্মাদার হিসেবে উপস্থাপন করেন। যার ফলে বিমান খেলাপি হলে সরকারি কোষাগার থেকে এই ঋণ দিতে দায়বদ্ধ থাকবে। ২০২৫ সালের আগস্টে, বিমান ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ৯.৩৭ বিলিয়ন টাকার রেকর্ড নিট মুনাফা দাবি করেছিল, আগে নিরীক্ষকরা অডিট করার পর বিমান যে ঋণ পরিশোধ করতে পারবে, এমন সম্ভাবনা পায়নি। 

বিমান তার পুরো বার্ষিক মুনাফা ঋণের জন্য উৎসর্গ করলেও, রাষ্ট্রীয় সংস্থার পাওনা পরিশোধ করতে ১৫ বছরেরও বেশি সময় লাগবে। এর ঋণ-থেকে-ইকুইটি অনুপাত প্রায় ৪:১ যেখানে শিল্পের আদর্শ ১.৫:১। ৩.৭ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৫,০০০ কোটি টাকা) এর গ্যারান্টি আনুষঙ্গিক দায়কেও বাড়িয়েছে। অন্যদিকে কর থেকে আসা জিডিপি ৬.৮% । এছাড়া বৈদেশিক ঋণ ১১২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

নিরাপত্তা ঝুঁকিও রয়েছে এই চুক্তির আওতায় কিনতে চলা বিমানে। গেল তিন বছরে ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের অন্তত চারটি বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত করা হচ্ছে। ফলে এগুলোর ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

প্রসঙ্গত, সরকার এই চুক্তির ক্ষেত্রে দেশের প্রতিযোগিতা আইন ২০১২ সাংঘর্ষিক। এছাড়া আগামী নির্বাচিত সরকার এই এই চুক্তির অর্থ পরিশোধ করলেও একটি বিমানও সরকারের মেয়াদে আসবে না। সবকিছু ঠিক থাকলে এসব বিমান আসবে ২০৩১ সালের অক্টোবর মাসের পর।