পটুয়াখালী-৩: নুর ও মামুনের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘিরে সংঘর্ষের শঙ্কা, সেনা মোতায়েন
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষ্যে ১১৩ পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা–দশমিনা) আসনে নির্বাচনী উত্তাপ চরমে পৌঁছেছে। এই আসনের দুই হেভিওয়েট প্রতিদ্বন্দ্বী—গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি মো. নুরুল হক নুর (ট্রাক প্রতীক) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. হাসান মামুন (ঘোড়া প্রতীক)-এর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘিরে বড় ধরণের সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শনিবার (৩১ জানুয়ার) সকাল থেকে চরকাজল ইউনিয়নের চরশিবায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেনাবাহিনী ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। একইসাথে সংঘাত এড়াতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সাময়িকভাবে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওই এলাকায় অবস্থান করছে।
জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পটুয়াখালী জেলা বিশেষ শাখার (ডিএসবি) পুলিশ সুপার একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন যে, উভয় প্রার্থী একই তারিখে, একই স্থানে বা কাছাকাছি সময়ে জনসমাবেশ ও প্রচারণার ডাক দিয়েছেন। প্রতিবেদনে ৩১ জানুয়ারি, ৪, ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি—এই চার দিনকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩১ জানুয়ারি গলাচিপার চরকাজল ও চরবিশ্বাস ইউনিয়ন, ৪ ফেব্রুয়ারি রতনদী তালতলী ইউনিয়নের কাটাখালী এলাকা, ৫ ফেব্রুয়ারি গজালিয়া ইউনিয়নের আদানীবাজার, ৬ ফেব্রুয়ারি কলাগাছিয়া ও বকুলবাড়িয়া ইউনিয়ন। উল্লিখিত তারিখ ও স্থানগুলোতে দুই প্রার্থীই কাছাকাছি স্থানে নির্বাচনী প্রচারণা করবেন। পুলিশি প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এসব কর্মসূচিতে উভয় পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সম্ভাবনা রয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্যমতে, দশমিনা ও গলাচিপা উপজেলায় বিএনপির নেতাকর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। একটি অংশ স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুনের পক্ষে এবং অপর অংশ নুরুল হক নুরের পক্ষে প্রচারণায় নেমেছেন। এই বিভক্তি উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ইতোমধ্যে গত ২৬ জানুয়ারি দশমিনার পাগলা বাজার এবং ২৭ জানুয়ারি গলাচিপার পাতাবুনিয়া এলাকায় উভয় পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে একাধিক নেতাকর্মী আহত হন এবং সংশ্লিষ্ট থানায় চারটি মামলা দায়ের করা হয়। উভয় প্রার্থীই বিভিন্ন সময়ে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ‘সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫’-এর বিধি-৬ অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারণার শুরুর আগে (২২ জানুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে) রিটার্নিং অফিসারের কাছে কর্মসূচি দাখিল করার নিয়ম থাকলেও, উভয় প্রার্থী তা যথাযথভাবে পালন করেননি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন ২৬ জানুয়ারি এবং নুরুল হক নুর ২৮ জানুয়ারি তাদের সফরসূচি জমা দেন।
রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে কর্মসূচি সমন্বয়ের অনুরোধ জানানো হলেও, প্রার্থীরা নিজ নিজ সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। এমতাবস্থায়, জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী স্বাক্ষরিত ৩০ জানুয়ারির একটি চিঠিতে উভয় প্রার্থীকে কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে আচরণবিধি মেনে এবং প্রশাসনের অনুমোদন সাপেক্ষে নতুন করে কর্মসূচি ঘোষণার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহামুদুল হাসান বলেন, 'দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সাংঘর্ষিক নির্বাচনী কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো অবনতি যাতে না ঘটে, সে জন্য সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ কাজ করছে। তারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমতি না থাকায় ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওই এলাকায় তাদের নির্বাচনী সভা বন্ধ করা হয়েছে এবং লোকজনকে জড়ো হতে দেওয়া হচ্ছে না।'