১৫ অক্টোবর ২০২৪, ১১:৫৮

নৌকাস্কুল উদ্ভাবক রেজোয়ান পেলেন ‘নোবেল লাইফ প্রাইজ’

‘গ্লোবাল লাভ অব লাইফ অ্যাওয়ার্ডস’ গ্রহণ করছেন মোহাম্মদ রেজোয়ান  © টিডিসি

বাংলাদেশের নৌকাস্কুলের উদ্ভাবক স্থপতি মোহাম্মদ রেজোয়ান তাইওয়ানের সর্বোচ্চ সম্মানের অন্যতম ‘গ্লোবাল লাভ অব লাইভস অ্যাওয়ার্ডস’ পেয়েছেন। যা ‘নোবেল লাইফ প্রাইজ’ নামেও পরিচিত।

১৯৯৮ সাল থেকে তাইওয়ানের ‘চো তা-কুয়ান কালচারাল অ্যান্ড অ্যাডুকেশনাল ফাউন্ডেশন’ মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ এ পুরস্কার প্রদান করে আসছে।

‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা’র চিন্তা থেকে বাংলাদেশি স্থপতি মোহাম্মদ রেজোয়ান নৌকাস্কুল উদ্ভাবন করে দেশে-বিদেশে সাড়া ফেলেছেন। এ জন্য তিনি ২৭তম গ্লোবাল লাভ অব লাইভস অ্যাওয়ার্ডসের বিজয়ীদের একজন নির্বাচিত হয়েছেন।

পুরস্কারটি মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশ্বব্যাপী প্রদান করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে উদ্ভাবনী নৌকাস্কুলের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা সুবিধা প্রদান করার জন্য রেজোয়ানকে ‘মেডেল অব অ্যাচিভমেন্টস’ বিভাগে সম্মানিত করা হয়েছে।

মোহাম্মদ রেজোয়ানের প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা সোমবার (১৪ অক্টোবর) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানায়।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর রিপাবলিক অব চায়নার (তাইওয়ান) প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে তার কার্যালয়ে রেজোয়ান ও অন্যান্য পুরস্কার বিজয়ীদের সম্মানিত করেন। সেখানে প্রদত্ত ভাষণে প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে বলেন, ‘স্থপতি হিসেবে রেজোয়ান জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর একটি সমাধান তৈরি করেছেন, যা বিশ্বকে উপকৃত করছে। তার ভাসমান স্কুল শিশুদের জন্য আশা সঞ্চার ও শিক্ষা লাভের সুযোগ নিশ্চিত করেছে।’

সেখানে প্রতিনিধি দলের প্রধান হিসেবে রেজোয়ানও প্রেসিডেন্টসহ অন্যান্য সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সিটি কে ফাউন্ডেশনের কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক এবং পুরস্কার বিজয়ীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন।

আরও পড়ুন: পরিবেশ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বুয়েটকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন রাবি

১৬ সদস্যের জুরিবোর্ড সারাবিশ্ব থেকে মনোনীত ৩ হাজার ৪৯৯ প্রার্থীর মধ্য থেকে রেজোয়ানকে নির্বাচিত করে। তাকে নৌকাস্কুল উদ্ভাবনের জন্য এবং বিশ্বব্যাপী ভাসমান শিক্ষা আন্দোলন শুরু করার জন্য এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই বছর ১৬ ব্যক্তিকে পুরস্কার প্রদান করা হয়। প্রতিটি পুরস্কার বিজয়ীকে একটি সার্টিফিকেট ও একটি ট্রফি দেওয়া হয়। এই পুরস্কার সাহসিকতা, দয়া, অধ্যাবসায় ও অর্জনÑ এই চারটি বিভাগে দেওয়া হয়।

এক সপ্তাহব্যাপী পুরস্কারসংক্রান্ত জনকল্যাণ কার্যক্রম চলাকালীন বিজয়ীরা তাইপে, ইলান, চায়াই, তাইনান ও কাওশাং শহরের স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও সংবাদপত্র পরিদর্শন করে তাদের জীবনের গল্প বলেন।

এক প্রতিক্রিয়ায় সিটি কে ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চো চিন-হুয়া বলেন, “রেজোয়ানের উদ্ভাবন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার একটি কার্যকর পদ্ধতি এবং প্রকৃত অর্থেই তিনি ‘বাংলাদেশের আর্থ হিরো’। আমাদের পুরস্কার গত দুই দশকব্যাপী পরিবেশগত স্থায়িত্ব ও জলবায়ু অভিযোজনে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি দেয়।”

সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজোয়ান বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের মতো তাইওয়ানের জনগণও রেসিলিয়েন্ট, প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরে তারা তাদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনর্নির্মাণ করেছে। তাই আমাদের নৌকাস্কুলের জন্য তাইওয়ান থেকে এই স্বীকৃতি পেয়ে আমি সম্মানিত বোধ করছি। তারা আমাদের ফরমোসা (সুন্দর দ্বীপ) এর নদীতে একটি নৌকাস্কুল তৈরি করতে বলেছে। আমরা বাংলাদেশিরা এভাবে আরো অনেক জীবন বদলে দেওয়া সৃজন-উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর নানা সংকটের সমাধান বের করতে সক্ষম হব, এটাই আমি আশা করি।’

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের বন্যাপীড়িত অঞ্চলের দারিদ্র্য ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসার স্বপ্ন দেখতেন নাটোরের সন্তান মোহাম্মদ রেজোয়ান। নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ এই তিন জেলার ১০টি উপজেলায় বিস্তৃত বিশাল জলাভূমি চলনবিল পাড়ের গ্রামের বাড়িতে কেটেছে তাঁর শৈশব-কৈশোর। পানিবেষ্টিত মানুষের সমস্যা-জর্জরিত জীবন খুব কাছে থেকে দেখে কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করেছেন সেই স্কুলজীবন থেকেই। সেটাই পরিপক্ব হয় ১৯৯৮ সালে সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। আর ২০০২ সালে রেজোয়ান চলনবিলের অথৈ পানিতে ভাসান তাঁর অনবদ্য উদ্ভাবন ‘নৌকাস্কুল’।

জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে ক্রমবর্ধমান বন্যা ও দারিদ্র্য সত্ত্বেও সব শিশু, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত কন্যাশিশুদের স্কুলে পড়ালেখা শেখার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রেজোয়ান ও তাঁর প্রতিষ্ঠান সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা শিশুদের জন্য ভাসমান স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। যেগুলো দেশ-বিদেশে খ্যাতি পেয়েছে রেজোয়ানের নৌকাস্কুল নামে। বিশেষভাবে ডিজাইনকৃত নৌকায় ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি রয়েছে ভাসমান লাইব্রেরি, খেলার মাঠ ও স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিক এবং কিশোরী-তরুণীদের জন্য রয়েছে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। তাঁর নৌকাস্কুলের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে ২০১০ সাল থেকে অন্যান্য সংগঠনও চালু করে এই সেবা। বাংলাদেশ সরকার তার উদ্ভাবন (ভাসমান/নৌকা স্কুল) বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (২০২৩-২০৫০) অন্তর্ভুক্ত করেছে। রেজোয়ানের এই অনন্য উদ্ভাবনটি আজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে আরও আটটি দেশে।

আরও পড়ুন: পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বই পেলেন রিজওয়ানা

বাংলাদেশি স্থপতি মোহাম্মদ রেজোয়ানের নৌকাস্কুল ধারণাটি ‘উদ্ভাবন’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছে ইউনিসেফ, ইউএনইপি ও ইউএনডিপির মতো জাতিসংঘের বিভিন্ন তহবিল ও কর্মসূচির কাছ থেকে। এ ছাড়া ২০১৯ সালে প্রকাশিত ‘আর্থ হিরোস’ নামের প্রখ্যাত ব্রিটিশ গ্রন্থে বিশ্বেরর ২০ জন ‘আর্থ হিরো’র তালিকায় লিপিবদ্ধ হয়েছে রেজোয়ানের নাম। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, তাইওয়ানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্লাসের পাঠ্যপুস্তকে রেজোয়ান ও তাঁর ভাসমান স্কুল বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মোহাম্মদ রেজোয়ানের প্রতিষ্ঠিত সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা ১৬টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার বিজয়ী জাতীয় পর্যায়ের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন। এটি বাংলাদেশের নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার বন্যাপ্রবণ এলাকায় ভাসমান স্কুল, পাঠাগার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্লে-গ্রাউন্ড এবং ভাসমান প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে ২৬টি নৌকাস্কুল আছে।  প্রতিটি স্কুলের নৌকায় ৩০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি শ্রেণিকক্ষ আছে, যেখানে দৈনিক তিন শিফটে একেকটিতে ৩০ জন করে মোট ৯০ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে। এ ছাড়া রয়েছে ইন্টারনেট-সংযুক্ত ল্যাপটপ ও শত শত বই। নৌকাগুলো সৌরশক্তি ব্যবহার করে ল্যাপটপ চালায় এবং প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা দিয়ে থাকে। এই নৌকা স্কুল জাতীয় ও নদীভিত্তিক পরিবেশগত পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে, যা শিক্ষার্থীদের নদী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে শেখায়।