০৮ মার্চ ২০২৪, ১১:৩৬

৫২ বছরেও ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি হকার বাদল মিয়ার

হকার বাদল মিয়া  © টিডিসি ফটো

গরম খবর, গরম খবর। আজকে গরম খবর, জানতে পত্রিকা পড়ুন এমনিভাবে ডাকতে থাকে পত্রিকার হকারা। সেই কাক ডাকা ভোরে শহর থেকে অলিগলি রাস্তায়, বাসা বাড়ির সামনে, কিংবা গ্রামের মেঠো পথ ধরে গ্রামের হাটবাজারে পত্রিকা ফেরি করে হকাররা। হকারদের সম্পর্কে কেউ তেমন জানতে চান না। জানতে চান না তাদের সুখ-দুঃখের কথা। সমাজের আর দশটা মানুষের মতো তাদেরও আছে সুন্দর আগামীর স্বপ্ন, আছে জীবনের সুখ আর দুঃখের অনেক গল্প। কিন্তু তাদের জীবনপাতার গল্পগুলো লিখা হয় জীবন সংগ্রামের কাহিনি দিয়ে। নীরবে নিভৃতে তারা চালিয়ে যায় জীবন সংগ্রাম।

তেমনি একজন হকার বাদল মিয়া (৬২)। তার বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারোবাড়ি ইউনিয়নের তেলুয়ারি গ্রামে। তার পিতার নাম মৃত আলা উদ্দিন। তিনি এক মেয়ে ও তিন পুত্র সন্তানের জনক। তিনি দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে পত্রিকার হকার। পত্রিকার হকারি করেই চলে তার সংসার। ময়মনসিংহের পত্রিকা এজেন্ট মানিক মিয়ার অধীনে হকার হিসেবে কাজ করেন। তার বাড়ি থেকে কেন্দুয়া প্রায় ২০ কি.মি. দূরে।

প্রতিদিন ভোরে তিনি সিএনজি নিয়ে ময়মনসিংহ স্টেশন রোডে এজেন্ট মানিক মিয়ার কাছে আসেন পত্রিকা নিতে।এখান থেকে পত্রিকা নিয়ে প্রায় ৪০ কি.মি দূরে কেন্দুয়া উপজেলার উদ্দেশ্যে সিএনজি দিয়ে পত্রিকা বিলি করেন।

সোহাগী, আঠারোবাড়ি,গন্ডা,সাহিতপুর, মাশকা বাজার হয়ে সর্বশেষ কেন্দুয়া উপজেলায় পৌঁছানো দুপুরে। কেন্দুয়ায় পৌঁছে সাইকেলের প্যাডেল মেরে লুঙ্গি পড়ে উপজেলার আনাচে কানাচে পত্রিকা বিলি করে বাড়িতে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়ায়। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত এমনকি ঝড়ের দিনেও তার পত্রিকা বিলি বন্ধ নেই। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি পত্রিকা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। 

অনেক কষ্টে কাটছে তার জীবন। পত্রিকা বিক্রি করে যা উপার্জন হয় তা ছেলে মেয়ের লেখাপড়া খরচ এবং পরিবারের ভরণপোষণ মেটাতে মেটাতেই শেষ। তার নিজস্ব স্বাদ আহ্লাদ বলতে কিছু নেই। পত্রিকা বিক্রি থেকে যা রোজগার হয় তা দিয়ে কোনোমতে দিন পার করছেন বাদল মিয়া।
হকার বাদল মিয়া জানান,আমার বয়স যখন দশ বছর তখন থেকেই আমি কেন্দুয়া উপজেলার বিভিন্ন বাজারে পত্রিকা বিক্রি করে আসছি। এখন আমার বয়স ৬২ বছর। প্রতিদিন ছোট বড় প্রায় এক হাজার কপি পত্রিকা  বিক্রি করতে পারি। দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক প্রায় এক হাজার জন গ্রাহক রয়েছে আমার। এভাবে আমি মাসে প্রায় ১৫-২০ হাজার টাকার মতো আয় করি। তা দিয়ে কোনোমতে স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে খেয়ে-পড়ে চলছে আমার সংসার। 

পত্রিকা বিক্রি করেই ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করিয়েছেন। তার একমাত্র মেয়েকে কিছু লেখাপড়া করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। তিন ছেলের মধ্যে দুই ছেলে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ছোট খাট চাকুরি করছেন। ছোট ছেলে মাধ্যমিকে পড়ছে।

নির্বাচন সময় ও এক্সক্লুসিভ খবর হলে বেশি পত্রিকা বিক্রি হয় উল্লেখ করে তিনি  বলেন, মানুষ এখন সব বুজে তাই পত্রিকাগুলোকে আরও ভালো ভালো খবর পরিবেশন করতে হবে। মানুষ আসলে খবর খুঁজে। যদি ভালো ভালো খবর পরিবেশন হয় তবে পত্রিকা ভালো চলে। মোবাইল ও ইলেকট্রিক মিডিয়ার প্রতি মানুষের এখন আগ্রহ বেশি,আগের মতো পত্রিকা পড়তে চায়না। অনেক কষ্টে দিনকাল চলছে। এ ব্যবসা করে চলা এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এখন কি করবো? ৬-৭ ঘণ্টা পত্রিকার ব্যবসা করে পাশাপাশি যদি অন্য কিছু করা যায় তাহলে চলা যাবে। অন্যথায় পরিবার পরিজন নিয়ে চলা সম্ভব নয়। সংবাদ পত্র শিল্প টিকিয়ে রাখতে আমার মত হকারদের ভূমিকা থাকলেও হকারদের ভাগ্য পরিবর্তনে কেউ এগিয়ে আসেনি।

কেন্দুয়া রিপোর্টার্স ক্লাবের সভাপতি আসাদুল করিম মামুন বলেন, আমি সেই ছোট কাল থেকেই দেখে আসছি হকার বাদল ভাই লুঙ্গি পড়ে বাইসাইকেলে ছড়ে ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কেন্দুয়া উপজেলার বিভিন্ন বাজারে পত্রিকা বিক্রি করেন। বাদল ভাই খুব ভাল মানুষ। তবে পত্রিকা থেকে যে আয় হয় তা দিয়ে খুব কষ্ট করে সংসার চালান। বাদল মিয়ার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সমাজের দায়িত্বশীলদের প্রতি আমি আহ্বান জানাই।

এ ব্যাপারে ময়মনসিংহের পত্রিকা এজেন্ট মানিক মিয়া বলেন, হকার বাদল মিয়া খুব ভালো মানুষ। সে দীর্ঘদিন ধরে পত্রিকা বিক্রি করছেন। বর্তমানে পত্রিকা বিক্রি অনেক কমেছে। ডিজিটাল যুগে এই পেশায় জীবিকা নির্বাহ করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।