১৩ এপ্রিল ২০২৩, ১২:৫৬

ছুটিতে বাড়ির পথে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা, হলে কষ্টের ঈদ তাদের

হল ছাড়ছেন শিক্ষার্থীরা  © ফাইল ছবি

প্রায় শেষের দিকে রমজান মাস। দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদ উল ফিতর। করোনাকালে শিক্ষার্থীরা রমজানের ছুটির অনুভূতি পায়নি তিন বছর। তবে এবার সর্বত্র ছুটির আমেজ। করোনা সংকট শেষে পুরোদমে শুরু হয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম। এরই ধারাবাহিকতায় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুরু হচ্ছে স্বাভাবিক ঈদের ছুটি।

ছুটিতে নিজের ব্যস্ত জীবনকে একটু বিরতি দিতে মানুষ ছুটে যাবেন নিজেদের আপনজনদের কাছে। কিন্তু এই ছুটিও যেন অনেকের কাছে বিষাদময়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীরাই আছেন যারা চাইলেও পরিবারের সাথে ঈদে যোগ দিতে পারবেন না। পরিস্থিতির শিকার হয়ে হলে একাই কাটাবেন এ সময়টুকু।

দেশের বেশিরভাগ মানুষই সাধারণত গ্রামের বাড়ীতে ঈদ উপভোগ করেন। শিক্ষার্থী হোক বা কোন কর্মজীবী শত কষ্ট করে হলেও ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে তারা ছুটে যান স্বজনদের কাছে। তবে এ আনন্দেও মাঝে মাঝে দেখা যায় ভিন্নতা। কেউ বা নিজের পেশার জন্য এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হন আবার কেউবা আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মানুষ পান না। কেউ নিজের ঈদ আনন্দ মাটি করে দিয়ে নিজের ক্যারিয়ার গড়ায় ব্যস্ত, কারোর আবার ক্যারিয়ার থাকলেও থাকে না সেই আনন্দে আনন্দিত হওয়ার মন মানসিকতা।

পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষ্যে বিভিন্ন মেয়াদে ছুটি ঘোষণা করেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তো এবারের এই ঈদ আনন্দ উদযাপন করতে কি পরিকল্পনা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা? লম্বা এই ছুটিতে কি করবেন তারা?

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) ছুটি শুরু হয়েছে ৯ এপ্রিল থেকে। স্টার সানডে, শব-ই-কদর ও পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষ্যে ৯ এপ্রিল (রবিবার) থেকে ২৭ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত মোট ১৯ দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) বাংলা নববর্ষ, শব-ই কদর, জুমাতুল বিদা, ঈদুল ফিতর, মে দিবস, বুদ্ধ পূর্ণিমা, ও গ্রীষ্মকালীন অবকাশ উপলক্ষে টানা ৩৩ দিনের ছুটিতে যাচ্ছে। বাংলা নববর্ষ, শব-ই কদর, জুমাতুল বিদা, ঈদুল ফিতর, মে দিবস, বুদ্ধ পূর্ণিমা, ও গ্রীষ্মকালীন অবকাশ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে আগামী রবিবার ৯ এপ্রিল থেকে ৮ মে পর্যন্ত। এছাড়া ঈদ ও রমজান মাস উপলক্ষ্যে পুরো রমজান মাসই বন্ধ থাকছে সরকারি তিতুমীর কলেজ।

যদিও ঈদ আসতে প্রায় দিন দশেক তবে এরই মধ্যে অনেক শিক্ষার্থী হল ছাড়তে শুরু করেছেন। কিন্তু অনেকেই থেকে যাবেন হলে, তাদের ঈদ উদযাপন থাকবে হলের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ২৩ দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। স্টার সানডে, বাংলা নববর্ষ, শব-ই-কদর, জুমাতুল বিদা ও পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে আগামী  ৯ এপ্রিল রবিবার থেকে ২৭ এপ্রিল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ক্লাস বন্ধ থাকবে।

ঈদের এই লম্বা ছুটিতে কি পরিকল্পনা জানতে চাইলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলাম শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থী আশিকুল বলেন, ঈদের আনন্দের শুরুটা বাড়ি ফেরার জন্য রওনা দেয়ার সময়টাতেই শুরু হয়ে যায়। ছোটবেলায় ঈদ মানে মনে হতো নতুন কাপড় পড়ে এদিক ওদিক ঘোরাফেরা। এখন মনে হয় ঈদ মানে নিজের মানুষদের সাথে আনন্দপূর্ণ, সুন্দর সময় কাটানো।

আশিকুল আরও বলেন, ঈদের এ বন্ধ গুলো ছাড়া বছরের অন্যান্য সময়ে অনেক আত্মীয় স্বজন বা ছোটবেলার বন্ধুদের সাথে দেখা হয়ে উঠেনা। ঈদের নামাজ পড়ার পর আমার ঈদের সারাটি দিন পরিবারের সাথেই কাটাবো কারণ সব আত্মীয় স্বজন মিলে এইদিনেই একসাথে হবো আর বিকেল থেকে শুরু করে বাকি সময়টা আমার ছোটবেলার বন্ধুদের সাথেই কাটাবো।"

‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি’

ঈদ মানে যেন এক ঝুড়ি খুশির প্রজাপতি। অনেকেই এই ঈদের সময়টুকুই পান নিজের পরিবারের সাথে কাটানোর জন্য। ঈদে বাড়ি যাচ্ছেন, কেমন অনূভুতি জানতে চাইলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ বিভাগের চৈতি চাকি দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস প্রতিনিধিকে বলেন,  ‘৬ মাস পর বাড়িতে যাচ্ছি। সাথে ঈদ আর পহেলা বৈশাখ । মা-বাবা সবার জন্য সামান্য কেনাকাটা করেছি ৷  বাড়িতে গিয়ে সবাই একসাথে বসে ইফতার করবো ভাবতেই অন্যরকম আনন্দ লাগছে।

এছাড়াও সময়ের টানে বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে যাওয়া স্কুল - কলেজ জীবনের বন্ধুদের সাথে দেখা করার ও সুন্দর মুহূর্ত কাটানোর কথা রয়েছে । ছোট্ট চড়ুইভাতি র আয়োজন ও বাড়িতে চলছে।  বাড়িতে যাওয়ার আমেজটায় আলাদা।’

এই আনন্দের মাঝেই অনেকেই আবার পরীক্ষা নিয়ে চিন্তিত। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মোশতাক তাহসিন বলেন, ‘ঈদ নিয়ে পরিকল্পনার তো কোনো শেষ নেই।  কিন্তু এত সব পরিকল্পনার পর যখন মনে হয় ঈদের ছুটি শেষ  হতে না হতেই পরীক্ষা শুরু,  তখন সব মলিন হয়ে যায়। সব কিছুর ঊর্ধ্বে যেহেতু পড়াশোনা তাই ঈদ পরিকল্পনা থেকে পড়াশোনা কে কোনো ভাবেই বাদ দেওয়া যাবে না। পরিবার পরিজনের সাথে সবার  ঈদ কাটুক আনন্দে। ঈদ মোবারক।’

‘ঈদ নিয়ে আসে বিষাদ ও’

সবার জন্য ঈদ আনন্দের হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমনও অনেক শিক্ষার্থী আছেন যাদের ঈদের দিন কাটবে ক্যাম্পাসের হলে অন্যান্য দিনগুলোর মতোই কিংবা তারচেয়েও বিষাদময়। পরিস্থিতির শিকার হয়ে বা নিজের পরিবারকে একটু সহায়তা করতে পারবে এই আশায় ভুলে থাকবেন ঈদ আনন্দকে। তেমনই এক অভিজ্ঞতা জানালেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭/১৮ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী।

ওই শিক্ষার্থী বলেন, আমি একটা জায়গায় ইন্টার্নি হিসেবে ট্রেনিং করছি, সেখানে ঈদের দিনও ডিউটি করা লাগবে। ছুটি পাব ঈদের পর। এইবারই আমি প্রথম ক্যাম্পাসে ঈদ করবো পরিবার ছাড়া।

তবে ঈদে সুযোগ এবং ছুটি থাকলে আর্থিক কারণেও বাড়ি যাওয়া হবে না অনেকেরই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২১/২২ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী জানান, বাবা না থাকায় তার পড়াশোনার খরচ বহন করতো বড় ভাই। কিন্তু সেও গত দুই মাস ধরে কোন খরচ দিচ্ছে না। পরিবারের এই আর্থিক সমস্যায় তার কাছে বাড়ি যাওয়ার মত টাকা নেই বিধায় সে এইবার পরিবার ছাড়া ক্যাম্পাসেই ঈদ করবে।

এই আনন্দ ও বিষাদের মধ্য দিয়েই প্রতিবছর কেটে যায় আমাদের ঈদ যাত্রা। হয়তো বেশিরভাগ সময় সবার আনন্দটাই আমাদের চোখে পরে আর বিষাদগুলো থেকে যায় অগোচরে। নিজের আত্মসম্মানবোধের কারণে হয়তো অনেকেই এই অনুভূতিগুলো প্রকাশ করেন না। অনেকেই আবার মিথ্যে খুশির মুখোশ পরে থাকেন। তবুও সবার ঈদ হোক আনন্দময়, শুভ হোক সকলের ঈদ যাত্রা।