‘ই-কমার্স প্রতারণা ও অর্থ ফেরত পাওয়ার কৌশল’

মতামত
শেখ মঈনুল করিম ঢাকা আইনজীবী সমিতির একজন সদস্য ও ব্যারিস্টার  © সংগৃহীত

বর্তমান সময়ে প্রতারণার কৌশল বদলেছে। লোভনীয় অফার দিয়ে গ্রাহকদের পণ্য না দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে দেশের বেশকিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার এসব প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো সুরাহা পাচ্ছেন না ভুক্তভোগী গ্রাহকরা। অর্ডার করা পণ্য তো পাননি, এখন অগ্রিম দেওয়া টাকা ফেরত পাবেন কি না—এ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা। কোনো উপায় না দেখে অনেক গ্রাহক দণ্ডবিধি আইনে মামলা করেছেন আত্মসাৎকারী ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। অধিকাংশ মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় অভিযোগ আনা হচ্ছে।

এছাড়া প্রতারক প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে কেউ কেউ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও মামলা করছেন। এসব মামলার ধারাগুলোতে সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছরের কারাদণ্ড। এছাড়া আদালত আসামিদের অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডেও দণ্ডিত করতে পারেন।

হাজার হাজার কোটি টাকার ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে গড়ে ওঠা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে গ্রাহকদের পাওনা অর্থের পরিমাণ অনেক। গ্রাহকদের করা মামলা গুলোতে আসামিদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান থাকলেও আইনে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার সুযোগ খুব কম।

দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় মামলার আসামিরা যদি আপস-মীমাংসা করেন, কেবল তখনই টাকা ফেরত পেতে পারেন ভুক্তভোগীরা। আমার মতে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে আটকে থাকা বিপুল অংকের এ অর্থ ফেরত পেতে দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় অভিযোগ না করে গ্রাহকদের দেওয়ানি আদালতে মামলার পাশাপাশি যাদের হাতে চেক আছে তারা চেকের মামলা করতে পারেন।

সম্প্রতি ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, কিউকম ও রিং আইডির মতো কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেন প্রতারণার শিকার গ্রাহকরা।এদের বিরুদ্ধে বর্তমানে দণ্ডবিধি আইনের ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় অধিকাংশ মামলা হয়েছে।

দণ্ডবিধির ৪০৬ ধারায় অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের শাস্তির বিষয়টি বলা আছে। ওই ধারা অনুসারে, কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ করে, তবে সে ব্যক্তি তিন বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্ৰম কারাদণ্ডে অথবা অর্থদণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডেই দণ্ডিত হবে।

দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় বলা আছে, প্রতারণা ও সম্পত্তি সমর্পণ করার জন্য অসাধুভাবে প্রবৃত্ত করা কোনো ব্যক্তি যদি প্রতারণা করে এবং প্রতারিত ব্যক্তিকে অসাধুভাবে অন্য কোনো ব্যক্তি যদি কোনো সম্পত্তির অংশ বা অংশবিশেষ প্রণয়ন, পরিবর্তন বা বিনাশসাধনে প্রবৃত্ত করে অথবা অসাধুভাবে প্রতারিত ব্যক্তিকে এমন কোনো স্বাক্ষরিত বা সিল মোহরযুক্ত বস্তুর সমুদয় অংশ বা অংশবিশেষ প্রণয়ন পরিবর্তন বা বিনাশসাধনে প্রবৃত্ত করে, যা মূল্যবান জামানতে রূপান্তরযোগ্য, তবে ওই ব্যক্তি সাত বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং তদুপরি অর্থদণ্ডও হতে পারে।

সম্প্রতি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান কিউকম কোম্পানির মালিকের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্টন থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও প্রতারণার অভিযোগে মামলা করেন একজন ভুক্তভোগী। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ অক্টোবর তাকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মতিঝিল বিভাগ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করলেও জেল জরিমানা হবে কিন্তু টাকা আদায় সম্ভব না।

তাই যে আইনে মামলা হয়েছে সে আইন অনুযায়ী এ মামলাগুলোর মাধ্যমে গ্রাহকদের পাওনা টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই। কেবল দুপক্ষের আপস-মীমাংসার মাধ্যমেই গ্রাহকরা টাকা ফেরত পেতে পারেন।

টাকা আদায় করতে চাইলে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের যেতে হবে দেওয়ানি আদালতে। সেখানে মামলা করলে তবেই টাকা ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। অথবা যাদের হাতে চেক আছে তারা চেকটি মেয়াদ থাকতে ব্যাংকের মাধ্যমে ডিজঅনার করে এন আই এ্যাক্ট এর ১৩৮ এবং ১৪০ ধরা অনুযায়ী মামলা করে টাকা আদায় করতে পারেন। আর মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সামারি সুট ফাইল করতে পারেন।

লেখক পরিচিতি: ঢাকা আইনজীবী সমিতির একজন সদস্য ও ব্যারিস্টার। 


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ

x