মহিউদ্দিন ভাইয়ের গড়া প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের গর্ব: আলী রিয়াজ

আলী রিয়াজ ও মহীরুহ মহিউদ্দিন আহমেদ
আলী রিয়াজ ও মহীরুহ মহিউদ্দিন আহমেদ  © সংগৃহীত

বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতের পথিকৃৎ ও মহীরুহ মহিউদ্দিন আহমেদ আর নেই– এই সংবাদ আমার কাছে অবিশ্বাস্য বলেই মনে হয়। মহিউদ্দিন ভাই দীর্ঘ দিন ধরে অসুস্থ্য ছিলেন; কিন্ত অপরিমেয় জীবনী শক্তি দিয়ে তিনি তা মোকাবেলা করেছেন। পরিণত বয়স বা অসুস্থ্যতা আমাদেরকে কোনও মৃত্যুর জন্যেই প্রস্তত করেনা। যাঁদের ছায়া দীর্ঘ, যাঁদের কাজ একটি ক্ষেত্রকে আমূল বদলে দিয়েছে তাঁদের জীবনাবসানের সংবাদ আমাদেরকে কেবল বেদনাহতই করেনা, আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় তাঁদের কাজ কী করে অন্যদের জীবনকে বদলে দিয়েছে। যাঁদের কাজ অন্যদের সৃজনশীলতা এবং গবেষণাকে বদলে দিয়েছে তাঁদের অনুপস্থিতি স্মরণ করিয়ে দেয় তাঁরা কতটা প্রয়োজনীয় ছিলেন।

মহিউদ্দিন আহমেদকে প্রচলিত পরিচয়ে আমরা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই বর্ণনা করবো। কিন্ত তাঁর পরিচয় আমার কাছে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন গবেষণার ক্ষেত্রকে প্রতিষ্ঠিত করার একজন নিবেদিত মানুষ হিসেবে। বাংলাদেশে বাংলাদেশ বিষয়ে যে সব কাজ হচ্ছে তার সঙ্গে বিশ্বকে পরিচয় করিয়ে দেয়া, একই সঙ্গে সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশ বিষয়ে যে সব গবেষণা হচ্ছে তাঁকে বাংলাদেশের পাঠকের হাতে তুলে দেয়া – এটাই তিনি করেছেন সারা জীবন ধরে। এক বাক্যে যত সহজে তা লেখা যায় সেই কাজ করা যে কতটা কঠিন সেটা কেবল তাঁর কাজের প্রভাব থেকেই উপলব্ধি করা সম্ভব।

অন্তরালের মানুষ ছিলেন তিনি। কিন্ত তাঁকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প এবং মানসম্পন্ন প্রকাশনার ইতিহাস রচনা করা যাবেনা। সাংবাদিকতা দিয়ে তাঁর জীবনের সূচনা হয়েছিলো। স্থায়ীভাবে একাডেমিক জগতে প্রবেশের ডাক এসেছিলো তাঁর, যখন তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি-তে ভর্তির সুযোগ পান, কিন্ত অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির (ওইউপি) প্রকাশনা ও সম্পাদনা তাঁকে বেশি আকর্ষণ করেছিলো, সেটা ১৯৬৯ সাল। এক সময় সাংবাদিকতার পাশাপাশি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতাও করেছিলেন। মহিউদ্দিন ভাই ১৯৯৭/৮ সালে লন্ডনে আমাকে তাঁর জীবনের এই পর্বের কথা বললে আমার স্বতস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া ছিলো যে – ভাগ্যিস আপনি পিএইচডি না করে ওইউপি’র সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর স্বভাবসিদ্ধ হাসিতে উজ্জ্বল মুখে বলেছিলেন – ‘আমিও তাই ভাবি’। তারপরে আরও কথা হয়েছিলো। কি করে ১৯৭৫ সালে ইউপিএল প্রতিষ্ঠা পেলো সেই সব গল্প।

বাংলাদেশে গবেষণা-ভিত্তিক ইংরেজি বইয়ের প্রকাশনার যে ধারা তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন তা কি অন্য আর কারও হাতে তৈরী হতে পারতো? যে সময়ে তিনি প্রকাশনার জগতের জন্যে নিজেকে নিবেদন করলেন, যেভাবে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন তা কেবল ধৈর্য্য, নিষ্ঠা আর ভালোবাসা দিয়েই সম্ভব। যে দেশে প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনা, যেখানে প্রতিষ্ঠানের অকাল মৃত্যুই ভবিতব্য বলে বিবেচিত সেখানে মহিউদ্দিন ভাই তৈরি করেছেন এমন প্রতিষ্ঠান যা নিয়ে বাংলাদেশ গর্ব করতে পারে। বাংলাদেশ সময় সোমবার দিবাগত রাতে মহিউদ্দিন আহমেদ ৭৭ বছর বয়সে ঢাকায় পরলোক গমন করেন। তাঁর আপনজনদের প্রতি আমার সমবেদনা।

লেখক: বাংলাদেশী আমেরিকান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিজ্ঞানী ও লেখক।

রিলেটেড সংবাদ: ইউপিএলের মহিউদ্দিন আহমেদের ইন্তেকাল


মন্তব্য