১৫ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:১৩

জাপানের মেইজি পুনরুত্থান ও বাঙ্গলার নবজাগরণের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা

  © ফাইল ফটো

১. ভূমিকা

এশিয়ার ইতিহাসে জাপানে সংঘটিত মেইজি পুনরুত্থান(১৮৫৩-১৯১২) ও ব্রিটিশ বাঙ্গলায় সংঘটিত বাঙ্গলার নবজাগরণ(১৭৫১-১৯১১ খ্রিস্টাব্দ)হলো—দু’টি অনন্য সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনা। এ দু’টি সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনা পূর্ব যুগের বহু সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ঘটনা পরম্পরার ফলশ্রুতি বিশেষ, যা পরবর্তী যুগে জাপানে ও ব্রিটিশ বাঙ্গলার বহু সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা করে।

এই দু'টি সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনা ইউরোপে উত্থিত বিপ্লব-শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়ার ফলশ্রুতি বিশেষ। বস্তুত: মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের ক্রান্তিকালে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপে জ্ঞানদীপ্তি (Enlightenment) নামক এক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের সংঘটিতে হয়, যার ফলশ্রুতিতে ইউরোপের জনগণ নতুন রাজনৈতিক চেতনায় জেগে উঠে এবং এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ বিশ্বজুড়ে বিপ্লবের পর বিপ্লব সংঘটিত হতে থাকে। এই বিপ্লবগুলোর পরম্পরাকে বিপ্লব-শৃঙ্খল হিসাবে বর্ণনা করা হয়। সে অনুসারে, মেইজি পুনরুত্থান (১৮৫৩-১৯১২) ও বাঙ্গলার নবজাগরণ(১৭৫১-১৯১১ খ্রিস্টাব্দ)—এই দু’টি সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনাকে বিপ্লব-শৃঙ্খল-প্রতিক্রিয়ার সম্প্রাসারণ হিসাবে দেখা হয়।

২. ইউরোপে সংঘটিত জ্ঞানদীপ্তি আন্দোলনের নিরিখে রাজনৈতিক বিপ্লবের পটভূমি

জ্ঞানদীপ্তি আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ইউরোপের জনগণ রাজনৈতিকভাবে জেগে উঠে এবং ইউরোপে রাজনৈতিক বিপ্লবের সূচনা হয়। এই বিপ্লব ১৮৪৮ সালের দিকে সর্বাত্মক হয়ে উঠে, যখন পর্যায়ক্রমে অনেকগুলো বিপ্লব সংঘটিত হয়। ইউরোপে সংঘটিত এই বিপ্লবসমূহকে জাতীয়তাবাদের বসন্ত হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। এই বিপ্লব এক শতাব্দী ধরে চলতে থাকে। ইউরোপে সংঘটিত ফরাসি বিপ্লবকে (১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দ) উক্ত বিপ্লব-শৃঙ্খল-প্রতিক্রিয়ার সূত্রপাত বলে ধরা হয়। তবে এর আগে ফ্রান্স, স্পেন ও নেদারল্যাণ্ডের সহযোগিতায় আমেরিকায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন (১৭৭৫-১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দ) সংঘটিত হয় এবং ফলশ্রুতিতে আমেরিকা স্বাধীনতা লাভ করে। আমেরিকার এই স্বাধীনতা সংগ্রাম ইউরোপের উদারনৈতিক আন্দোলনের অনুঘটক হিসাবে কাজ করে। এরপর ইউরোপে এর প্রতিক্রিয়া পরিব্যপ্ত হতে থাকে।

ফলশ্রুতিতে ইউরোপের জনগণ রাজনৈতিক অধিকার ও জাতীয়তবাদের মন্ত্রে উদ্দীপিত হতে থাকে। শক্তিশালী রাজতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়, যার উপর নতুন জাতিরাষ্ট্রের ভিত নির্মিত হয় এবং তা ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্রকে সম্পূর্ণরূপে পাল্টিয়ে দেয়। কিন্তু এই বিপ্লবী চেতনা শুধু ইউরোপে স্থিত থাকেনি, বরং তা ইউরোপীয় উপনিবেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে এবং এক সময় তা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। কাজেই মেইজি পুনরুত্থান ও বাঙ্গলার নবজাগরণকে কোনো বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা হিসাবে না দেখে, এগুলোকে বিপ্লব-শৃঙ্খল-প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসাবে দেখা যেতে পারে।

৩. জাপানের মেইজি পুনরুত্থান ও বাঙ্গলার নবজাগরণের মধ্যকার তুলনামূলক বর্ণনা

জাপান ও বাঙ্গলা এ দুটি এশিয়া মহাদেশভুক্ত দেশ। কিন্তু এই দুটি দেশ ভৌগলিক অবস্থানের দিক থেকে যথাক্রমে পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থিত। মেইজি পুনর্জাগরণ ও বাঙ্গলার নবজাগরণ সংঘটনের সময় এই দুই দেশের রাজনৈতিক পটভূমি এক ছিলো না।
মেইজি পুনর্জাগরণ নামক বিপ্লব সংঘটনকালে জাপান ছিলো একটি স্বাধীন সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্র, যার রাজনৈতিক শক্তি ইউরোপীয় সামন্ততন্ত্রের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল।

এখানে জনগণের কোনো রাজনৈতিক অধিকার ছিলো না। কিন্তু অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ধারায়, প্রথাগত সামুরাইদের সম্মান ও প্রতিপত্তি দুর্বল হয়ে আসছিলো। অন্যদিকে শিক্ষা ও বাণিজ্যের কারণে বণিক শ্রেণির বিকাশ হচ্ছিলো, যারা সম্মান ও প্রতিপত্তিতে এগিয়ে যাচ্ছিলো। এখানে রাজা ছিলো, কিন্তু রাজতন্ত্র ছিলো না।

অন্যদিকে বাঙ্গলা ছিলো ব্রিটিশ ভারতের অধীনে একটি উপনিবেশ। এখানে বাঙ্গলা বলতে বর্তমান বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ এবং ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও ঝাড়খণ্ড প্রদেশের কিয়দংশ নিয়ে গঠিত অঞ্চলকে বুঝায়। বাঙ্গলায় সাধারণ জনগণের কোনো রাজনৈতিক অধিকার ছিলো না। কিন্তু ব্রিটিশরা এদেশের জনগণের মধ্য থেকে সামন্ততন্ত্রের একটি সুবিধাভোগী শ্রেণী সৃষ্টি করে, যারা জমিদার নামে অভিহিত ছিলো। ব্রিটিশরা এই অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপনের সময় কলকাতায় রাজধানী স্থাপন করে। এই কলকাতা থেকেই ব্রিটিশ সরকার সারা ব্রিটিশ ইণ্ডিয়া শাসন ও শোষণ করছিলো।

কিন্তু ১৯১১সালে ইংরেজরা এই রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লীতে স্থানান্তর করে। কাজেই কলকাতা ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ার রাজধানী হওয়ার সুবাদে বাঙ্গলার জনগণ ব্রিটিশদের কৃত সমস্ত রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে অভিজ্ঞতা লাভ করতে থাকে। তারা ব্রিটিশদের প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ইউরোপীয় সমসাময়িক দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা দ্বারা সমৃ্দ্ধ হওয়ার সুযোগ পায়। বাঙ্গলায় সংঘটিত অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ধারায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্য থেকে একটি শিক্ষিত ও বিত্তশালী শ্রেণী গড়ে উঠে, যারা ভদ্রলোক নামে অভিহিত হয়। এই ভদ্রলোক শ্রেণীই নবজাগরণের চালিকা শক্তি হিসাবে অবির্ভূত হয়।

৪. জাপানের মেইজি পুনরুত্থান ও বাঙ্গলার নবজাগরণের মধ্যকার আদর্শগত প্রস্তুতির তুলনামূলক বর্ণনা

ভূমিকাতে যেমনটি ধার্য করা হয়েছিলো, ইউরোপে সৃষ্ট জ্ঞানদীপ্তি আন্দোলন পরিব্যপ্ত হয়েই বিশ্বজুড়ে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। সেজন্য বিপ্লব সংঘটনের অনুঘটক হিসাবে জ্ঞানদীপ্তি কীভাবে জাপান ও বাঙ্গলায় পরিব্যপ্ত হলো তা এখানে আলোচনা করা প্রয়োজন।

জাপান ১৬২৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে বদ্ধ পররাস্ট্র নীতি (সাকোকু) পালন করেছিলো, যেন বিদেশের কোনো আদর্শ ও শক্তি দেশকে অধিকার না করতে পারে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এই নীতি গ্রহণ করা হয়েছিলো মূলত: দুটি ঘটনার প্রেক্ষিতে। এর একটি হলো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তি স্পেনের ফিলিপাইন অধিকার ও উপনিবেশ স্থাপন। অন্যটি হলো খ্রীস্টধর্মের বিস্তৃতি, যা ওদা নবুনাগা (১৫৭৮-১৫৮২ খ্রিস্টাব্দ)ক্ষমতার বলয় বিস্তৃতিতে ব্যবহার করে আসছিলেন। সে যুগে মূলত: ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ বিভিন্ন দেশে খ্রীস্টধর্মে ধর্মান্তরের মাধ্যমে রাজনৈতিক শক্তির বলয় বৃ্দ্ধি করতো বলে, সে সময়কার জাপানের রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে বিদেশি বণিকদের সম্পর্কে সন্দেহ দানা বাঁধে। কাজেই এই দ্বিবিধ কারণে জাপান তকুগাওয়া রাজনৈতিক শক্তির উত্থানকাল থেকে এই বদ্ধনীতি গ্রহণ করে। এই বদ্ধনীতির ফলে জাপান বহি:দেশের সাথে সরাসরি অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন না করে, স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতি সৃষ্টিতে সক্ষম হয়।

কিন্তু এই বদ্ধ অবস্থার মধ্যেই ইউরোপীয় সমসাময়িক রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা ও ঘটনার খবর জাপান জুড়ে পরিব্যপ্ত হতে থাকে থাকে। কারণ এই বদ্ধ অবস্থায় জাপানের প্রয়োজন ছিলো ইউরোপের প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি আয়ত্ত্ব করতে জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমের কতকগুলো সামন্তরাজ্য নেদারল্যাণ্ডের সহয়তায় ইউরোপীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চা চালিয়ে যায়। কিন্তু আড়ালে এসব সামন্তরাজ্যস্থ প্রশাসকগণ ও অভিজাতগণ সমসাময়িক ইউরোপীয় চিন্তাধারা চর্চা শুরু করে এবং কয়েকটি সামন্তরাজ্য গোপনে আগ্নেয় অস্ত্র সংগ্রহ করতে থাকে, তকুগাওয়া রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি সঞ্চয় করে। কাজেই বদ্ধ নীতি গ্রহণ করা হলে, জাপানে বিপ্লবী চিন্তাধারা পরিব্যপ্ত হবে না বলে মনে করা হলেও, বাস্তবে জাপানের একটি আলোকিত বুদ্ধিজীবি শ্রেণী গড়ে উঠেছিলো যারা বিপ্লবী চিন্তাধারা দ্বারা সমৃদ্ধ হচ্ছিলো। এই বিপ্লবীদের চিন্তাধারা বাস্তবে বিপ্লবের প্রেরণা যোগায়। বিপ্লব শেষ হলে, যখন সংস্কার কর্মসূচী তখন স্পষ্টতই প্রমাণিত হয় যে, ইউরোপের জ্ঞানদ্বীপ্তির কারণে উত্থিত উদারনীতিবদই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে প্রতিফলিত হয়েছে।

অন্যদিকে, বাঙ্গলায় বিপ্লবী রাজনৈতিক চিন্তাধারা বিকশিত ও লালিত হয়, ঔপনিবেশিক শক্তি সৃষ্ট শিক্ষা অবকাঠামোতে। ব্রিটিশ ভারতে রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা কর্ষণের সূত্রপাত হয়, ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ার সরকার কর্তৃক রাজধানী কলকাতায় ১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপনের মাধ্যমে। এই কলেজ স্থাপনের ফলে আধুনিক জ্ঞানচর্চার সূত্রপাত হয়, যা কালক্রমে পরিব্যপ্ত হতে থাকে। ফলশ্রুতিতে ধর্মীয় কুপমণ্ডকতায় নিমজ্জিত হিন্দু সমাজে যৌক্তিক ও উদারতাবাদী চিন্তাধারার স্ফূরণ ঘটে।

এর ফলে শিক্ষিত হিন্দু সমাজ ধর্মান্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় ব্যপৃত হয়। এ সময় সারা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে বাংলা ভাষায় যে সাহিত্য গড়ে উঠে তা পরিমাণে ও মানে যে কোনো ভাষায় রচিত সাহিত্যের চেয়ে উৎকৃষ্ট হিসাবে পরিগণিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় যে জ্ঞানদীপ্তি ঘটে তাই বাঙ্গলার নবজাগরণ নামে খ্যাত হয়। কিন্তু এই নবজাগরণের প্রক্রিয়ায় উচ্চ শ্রেণীর হিন্দুরা আলোকিত হলেও, মুসলমান সমাজ ও নিম্নবর্গের হিন্দু সমাজ এই প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যায়। নবজাগরণের ফলে যে রাজনৈতিক আধুনিক চিন্তা-চেতনার স্ফূরণ ঘটে, তা বিকশিত হতে থাকে এবং ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৭ সালে এ দেশ ত্যাগ করা পর্যন্ত, তার তীব্রতা ও ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তবে নবজাগরণের সূচনার পূর্বে ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ার ইতিহাসে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে অন্য একটি বিপ্লব সংঘটিত হয়। এই বিপ্লবের নাম সিপাহী বিপ্লব।

এই বিপ্লব বাঙ্গলা ছাড়িয়ে বৃটিশ ইণ্ডিয়ার সর্বত্র পরিব্যপ্ত হয়েছিলো। তবে ঐতিহাসিকগণ এই বিপ্লবকে ইউরোপীয় বিপ্লব-শৃঙ্খল-প্রতিক্রিয়া হিসাবে মানতে নারাজ। যাই হোক, বাঙ্গলার নবজাগরণ যে, বাঙ্গলায় একটি বিপ্লবী রাজনৈতিক চেতনার জন্ম দিয়েছিল তা নি:সন্দেহ। বাঙ্গলায় উত্থিত এই বিপ্লবী রাজনৈতিক চেতনার কারণে পুরো ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন (indian indepence movement) নামে খ্যাত হয়।

৫. জাপানের মেইজি পুনরুত্থান ও বাঙ্গলার নবজাগরণের ফলশ্রুতির তুলনামূলক বর্ণনা

মেইজি পুনরুত্থান ও বাঙ্গলার নবজাগরণ দু’টি ভিন্ন দেশে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সংঘটিত সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনা বিশেষ। কিন্তু এ দু’টি সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনার ফলশ্রুতিতে অনেক মিল রয়েছে। কারণ এ দু’টি সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনা ইউরোপে সংঘটিত জ্ঞানদীপ্তি আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে উত্থিত বিপ্লব-শৃঙ্খল-প্রতিক্রিয়ার পরিবর্ধিত রূপ বিশেষ।

মেইজি পুনরুত্থান সময়কালকে বিপ্লবী কাল (১৮৫৩-১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দ) ও রাজনৈতিক পুনর্গঠন কাল (১৮৬৮-১৯১২ খ্রিস্টাব্দ)―এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়। জাপান তোকুগাওয়া শাসনামলের দুই শতাব্দি ধরে যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জিত হয়েছিলো, তা এই পুনরুত্থানের ফলশ্রুতিতে সম্পূর্ণভাবে গুঁড়িয়ে যায় এবং গুঁড়িয়ে যাওয়া এই ভিত্তির উপর রাজনৈতিক সৌধ নির্মিত হয়। জাপানে সংঘটিত মেইজি পুনরুত্থানের ফলশ্রুতিতে খেতাব সর্বস্ব মেইজি সম্রাট জাপানের রাজনৈতিক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ফলে মেইজি সম্রাট অনুগত সামন্ত ও সামুরাইগণের সহায়তায় ব্যাপক সংস্কার কর্ম শুরু করে। এই সংস্কারের মধ্যে ছিলো সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সংস্কার। এই সংস্কারের ফলে সম্রাট রাষ্ট্রের সর্বাত্নক ক্ষমতা লাভ করে এবং তকুগাওয়া রাজনৈতিক শক্তি ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাছাড়া এই সংস্কারের ফলে সমাজের প্রথাগত শ্রেণিবিভাগ ভেঙ্গে যায় এবং বংশানুক্রমিক সামুরাই প্রথার বিলোপ সাধিত হয়।

ফলশ্রুতিতে নিরাপত্তা ও সামরিক বাহিনীতে দক্ষতা অনুসারে সব শ্রেণির মানুষ সুযোগ পায়। সামন্তরাজ্যের স্থলে প্রশাসনিক প্রদেশ গঠন করা হয়। সেখানে কেন্দ্র থেকে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গঠন করা হয়। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনে জাপানে একটি জাতীয়তাবাদি চেতনা গড়ে উঠ। একটি সার্বজনীন ও এজমালি ভাষা সৃষ্টির প্রয়োজনীতা দেখা দেয়। ফলে মেইজি সরকার টোকিওতে কথিত সামুরাই অভিজাতদের কথ্য ভাষাকে ভিত্তি করে একটি প্রমিত জাপানি ভাষা গড়ে তুলে।

অন্যদিকে, বাঙ্গলায় সংঘটিত নবজাগরণের ফলে যে পরিবর্তন সাধিত তার পরিমাণ নগণ্য। এই নবজাগরণের ফলে হিন্দু সমাজে বর্ণবৈষম্য কিছুটা কমে আসে। যেহেতু ব্রিটিশ ভারতের ক্ষমতা নিহিত ছিল বিদেশি ঔপনিবেশিক শক্তির হাতে, কাজেই বাঙ্গলার নবজাগরণে পরিবর্তনসমূহ এসেছে ব্রিটিশ সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী। তবে এই নবজাগরণের ফলে হিন্দুসমাজ অনেক কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসে। সমাজে যৌক্তিক চিন্তাধারা বিকশিত হতে থাকে। ব্যাপক সামাজিক সংস্কার সম্পন্ন হয়। ফলে সতীদাহ প্রথার মত অমানবিক প্রথার বিলুপ্তি ঘটে এবং বিধবা বিবাহের প্রথা চালু হয়।

এই নবজাগরণের অংশ হিসাবে ভারতীয় স্বরাজ আন্দোলন (The Indian Home Rule movement)নামক একটি নতুন রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয়। নবজাগরণের ফলশ্রুতিতে ব্রিটিশ সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নীতি পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তনের আওতায় ব্রিটিশ ঔপনেবিশক সরকার ভারত শাসন আইন (১৯১৯) নামক সাংবিধানিক আইন প্রণয়ন করে। পরবর্তীতে এই ভারত শাসন আইন (১৯৩৫) প্রণয়ন করে এর আওতা আরো বাড়ানো হয়। এই সাংবিধানিক আইন প্রণয়নের ফলে ব্রিটিশ ভারতের জনগণের সীমিত পর্যায়ে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বৃটিশ ভারতের অভিজাতদের মনোনয়ন প্রথায় প্রাদেশিক আইন সভায় অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

ব্রিটিশ সরকারের রাজনৈতিক সংস্কারের আওতায় সাম্প্রদায়িক রোয়েঁদাদ (communal award) চালু করে, যাতে বাঙ্গলায় ও অন্যান্য প্রদেশের জনগণকে ধর্ম, বর্ণ ও বংশগতি অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করে, শ্রেণী প্রতিনিধিত্বশীল প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় আইনসভাসমূহ গঠনের প্রস্তাব করা হয়। ফলে প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বাঙ্গলার জনগণের রাজনৈতিক ও প্রশানিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়।কিন্তু রোয়েঁদাদ-কে ভারতীয় হিন্দু অভিজাত শ্রেণি মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে প্রত্যাখান করে। ফলে বাঙ্গলা ও ব্রিটিশ ভারতে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ শুরু হয়। এই মেরুকরণের ফলে সমস্ত সংখ্যা লঘিষ্ট হিন্দু জনগোষ্ঠী ব্রাহ্মণ্য অভিজাতদের কাছে অস্তিত্ত্ব হারায়। আর হিন্দু-মুসলমান বিভেদের সৃষ্টি হয়। ফলে বাঙ্গলার নবজাগরণের ফলে আংশিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন আসে। তবে নবজাগরণের ফলে যে রাজনৈতিক চেতনা সৃষ্টি হয়, তার প্রভাব বিস্তৃত হতে থাকে এবং স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। এই আন্দোলনের অংশ হিসাবে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে উঠে।

বাঙ্গলায় একটি প্রমিত ভাষা প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ফলে নবজাগরণের বিদ্যোৎসাহী শ্রেণির প্রচেষ্টায় বাঙ্গলার মধ্যযুগের রাজধানী গৌড় ও নবদ্বীপের ভাষা ছাঁচে একটি প্রমিত ভাষার গড়ে উঠে।

৬. উপসংহার

ইউরোপে জ্ঞানদীপ্তির ফলশ্রুতিতে সংঘটিত বিপ্লব-শৃঙ্খল-প্রতিক্রিয়ায় উত্থিত মেইজি বিপ্লব ও বাঙ্গলা নবজাগরণের মধ্যকার তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হল-যা থেকে দুটি ভিন্ন বিপ্লবের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য, এজমালি বৈশিষ্ট্য ও সার্বজনীন বৈশিষ্ট্য পরিস্ফূট হয়েছে।

 

লেখক: অধ্যাপক, জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগ, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।