১৫ আগস্ট ২০১৯, ১৪:২১

আমি বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি!

শেখ মুজিবুর রহমান

শিরোনাম টা একটু চমকে যাওয়ার মতোই। এ প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু কে দেখে নাই। আমাদের আগের প্রজন্ম দেখেনি, আমরাও দেখিনি ( যদিও কথাটা একটু ভারিক্কি ) কিন্তু হিমালয়কে তো দেখিয়াছি। তিনি হিমালয় সমান ছিলেন। আলজেরিয়ায় ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত জোট-নিরপেক্ষ সম্মেলনে কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ট্রোর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ( ফিদেল কাস্ট্রো ) এ মহান নেতাকে বণর্না করেছিলেন এভাবে -"I have not seen the Himalayas. But I have seen Sheikh Mujib . In personality and in courage, this man is the Himalayas. I have thus had the experience of witnessingi the Himalayas. "অথর্াৎ আমি হিমালয় দেখিনি, তবে আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এই মানুষটি হিমালয়ের সমতুল্য। আর এভাবেই আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।

নিউজ উইক সাময়িকীর রিপোর্টার রবাটর্ জেন্কিন্স বঙ্গবন্ধু কে (Poet of Politics) রাজনীতির কবি বলেছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন দর্শনের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করলে খুব সহজেই এই দিকটার পরিচয় পাওয়া সম্ভব । তিনি অসমাপ্ত আত্মজীবনীর কাহিনি শুরু করেছেন শেখ বংশের পরিচয় দেওয়ার মাধ্যমে। শেখ বংশ কোথা থেকে কীভাবে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় আসল সেসব ইতিহাসের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। আবার এটাও অকপটে স্বীকার করেছেন যে তাদের পরিবার নিয়ে যেসব ঘটনা তিনি লিখছেন তার কোনটি সত্য আবার কোনটি কিংবদন্তির উপর ভিত্তি করে তুলে ধরেছেন। শেখ বোরহানউদ্দীন নামক এক পুরুষ শেখ বংশের গোড়াপত্তন করেন । বঙ্গঁবন্ধুর ৮ম পূবর্পুরুষ শেখ আবদুল আউয়াল টুঙ্গিপাড়ায় বসবাস শুরু করেন। তাঁর পরিবার ঐতিহ্যগতভাবেই রাজনীতি সচেতন ছিল। বিশেষ করে জমিদারি তদারকি করতে গিয়ে তাদেরকে প্রজাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হয়েছিল। সুতরাং তিনি ছোটবেলা থেকেই একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবারে বড় হতে থাকেন।


প্রিয় শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক , ইতিহাসবিদ ড. মুনতাসীর মামুন স্যার প্রায়ই ক্লাসে বলতেন, বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার কথা, বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মাচর্ের ভাষণের কথা। তিনি বলতেন, ৬ দফা না জানলে বাংলাদেশের ইতিহাস জানা হবে না, ৭ ই মাচর্ের ভাষণ না জানলে, জানা যাবেনা স্বাধীনতার ইতিহাস। সম্প্রতি UNESCO , ৭ ই মাচর্ের ভাষণ কে স্বীকৃতি দিয়েছে ( সমগ্র জাতির অহংকারের বিষয় )। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ই মাচর্ের জনসভায় ইয়াহইয়ার বেতার ভাষণের জবাবে ৪ টি দাবীর কথা উল্লেখ করেছিলেন। তিনি শেষে বলেছিলেন, "The struggle this time is a struggle for emancipation. The struggle this time is a struggle for independence ". সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের হলো।


জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এমন একজন নেতা , যাকে নিয়ে পাকিস্তানের নেতাদের মাথা ব্যাথার কোন সীমা ছিলনা। তাই তারা বঙ্গবন্ধু কে একের পর এক কারাগারে পাঠিয়েছে। পাকিস্তানি শাসনামলের অর্ধেক সময়ই বঙ্গবন্ধুর কেটেছে কারাগারে। বঙ্গঁবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব ও ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুথানের নেতা তোফায়েল আহমেদ সম্প্রতি বঙ্গঁবন্ধুর কারাবাসের যে পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন, তা দেখে শিহরিত হতে হয়। তাঁর জীবনের ৪ হাজার ৬৮২ দিন কেটেছে কারাগারে। এর মধ্যে স্কুলের ছাত্র অবস্থায় ব্রিটিশ আমলে ৭ দিন কারাভোগ করেন । বাকি ৪ হাজার ৬৭৫ দিন তিনি কারাভোগ করেন পাকিস্তান সরকারের আমলে। তিনি ১৯৩৮ সালে প্রথম কারাগারে যান। এরপর ১৯৪৮ সালের ১১ মাচর্ থেকে ১৫ মাচর্ পযর্ন্ত তিনি ৫ দিন কারাগারে ছিলেন। একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর আটক হয়ে মুক্তি পান ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারী । এ দফায় তিনি ১৩২ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল আবার ও কারাগারে গিয়ে ৮০ দিন কারাভোগ করে মুক্তি পান ২৮ জুন। ওই দফায় তিনি ২৭ দিন কারাভোগ করেন। একই বছরের ১৯৪৯ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পযর্ন্ত ৬৩ দিন এবং ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারী থেকে ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারী টানা ৭৮৭ দিন কারাগারে ছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয় লাভের পরও বঙ্গবন্ধু কে কারাগারে যেতে হয়। সে সময় বঙ্গবন্ধু ২০৬ দিন কারাভোগ করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারির পর বঙ্গবন্ধু ১১অক্টোবর গ্রেপ্তার হন। এ সময়ে টানা ১ হাজার ১৫৩ দিন তাঁকে কারাগারে কাটাতে হয়। এরপর ১৯৬২ সালের ৬ জানুয়ারী আবারও গ্রেপ্তার হয়ে মুক্তি পান ওই বছরের ১৮ জুন। এ দফায় তিনি কারাভোগ করেন ১৫৮ দিন। এরপর ১৯৬৪ ও ১৯৬৫ সালে বিভিন্ন মেয়াদে তিনি ৬৬৫ দিন কারাগারে ছিলেন। ছয় দফা দেওয়ার পর বিভিন্ন মেয়াদে ৯০ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ১৯৬৬ সালের ৮ মে আবারও গে্রপ্তার হয়ে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী গণ-অভ্যুথানের মধ্য দিয়ে মুক্তি পান। এ সময় তিনি ১ হাজার ২১ দিন কারাগারে ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মাচর্ের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষনা দেওয়ার পর পরই পাকিস্তান সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এ দফায় তিনি কারাগারে ছিলেন ২৮৮ দিন। ( জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা, প্রথম আলো , ৭ মাচর্ ২০১৭) ।

আগস্ট মাস ( বিশেষ করে পনেরো আগস্ট ) বাঙালির শোকের মাস । আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধু কে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর জবানিতে -ই একটু শোনা যাক। সাংবাদিক ডিভিড ফ্রস্ট তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "তোমার গুণ কী "? জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, "আমি এ দেশের মানুষকে ভালোবাসি"। ফ্রস্ট আবার প্রশ্ন করলেন , "আর দোষ?", বঙ্গবন্ধু হেসে বলেছিলেন, "আমি তাদেরকে বড় বেশি ভলোবাসি।" দেশকে এত বেশি ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত কাল হলো। তাঁকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয় ১৫-ই আগস্ট । হত্যা করে তারা যারা বাংলাদেশকে বিশ্বাস করতো না। প্রতিটি বাঙালীর তার প্রতি রক্তের ঋণ। এই ঋণ শোধ হবে সেইদিন যেদিন আমরা দেখবো আমাদের প্রাণপ্রিয় এই স্বদেশভূমি মুক্তিযুদ্ব্রের সকল মুল্যবোধ এবং চেতনা নিয়ে সগৌরবে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

আগষ্ট মাস, বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করার মাস। যতদিন বাংলাদেশ নামে দেশটি পৃথিবীতে টিকে থাকবে, ততদিন এই মানুষটিও পৃথিবীর ইতিহাসে বেঁচে থাকবেন। বাংলাদেশ এবং বঙ্গঁবন্ধু সমার্থক শব্দ। যদি বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হতো তাহলে এই বাংলাদেশেরও জন্ম হতো না। তাঁর জন্য এ প্রজন্মের পক্ষ থেকে ভালোবাসা এবং ভালোবাসা। প্রিয় কবি গুণ'দা কে একটু স্মরণ করে বলি -আমি আজ কারে রক্ত চাইতে আসিনি,
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলতে এসেছিলাম।।

লেখক: গবেষক ও প্রভাষক, তাজপুর ডিগ্রী কলেজ, সিলেট।