০১ জুলাই ২০১৯, ১৭:০৮

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: যে ভাবে জন্ম হলো

  © সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের প্রাচীনতম, সর্ববৃহৎ এবং উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ১৯২০ সালে ভারতীয় বিধানসভায় গৃহীত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইনবলে ১৯২১ সালের ১ জুলাই আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়।

ঢাকার রমনা এলাকার প্রায় ৬০০ একর জমি নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর প্রাথমিক অবকাঠামোর বড় একটি অংশ গড়ে উঠে ঢাকা কলেজের শিক্ষকমন্ডলী এবং কলেজ ভবনের (বর্তমান কার্জন হল) উপর ভিত্তি করে। ৩টি অনুষদ (কলা, বিজ্ঞান ও আইন), ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক, ৮৪৭ জন ছাত্র-ছাত্রী এবং ৩টি আবাসিক হল নিয়ে এ প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। কলা অনুষদের অধীনে ছিল ৮টি বিভাগ: সংস্কৃত ও বাংলা, ইংরেজি, শিক্ষা, ইতিহাস, আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ, ফার্সি ও উর্দু, দর্শন এবং রাজনৈতিক অর্থনীতি; বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে ছিল পদার্থবিদ্যা, রসায়ন এবং গণিত; আইন অনুষদের অধীনে ছিল শুধুমাত্র আইন বিভাগ। ৩টি অনুষদের ৮৪৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩৮৬ জন ঢাকা (শহীদুল্লাহ) হলে, ৩১৩ জন জগন্নাথ হলে এবং ১৭৮ জন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ও অনাবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি হয়।

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩টি অনুষদ, ১২টি ইনস্টিটিউট, ৮৪টি বিভাগ, ৫৪টি গবেষণাকেন্দ্র, ১২৩টি উপাদানকল্প কলেজ ও ইনস্টিটিউট রয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখন প্রায় ৪০ হাজার। আর পাঠদান ও গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন প্রায় দুই হাজার শিক্ষক।

বর্তমান শিক্ষকদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত; অনেকেই শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র বাংলাদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মোহাম্মদ ইউনুস ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পূরস্কার লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকই বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল আছেন। প্রাথমিক বছরগুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকগণ কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে শিক্ষার উচ্চমান বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে এ প্রতিষ্ঠান ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করে।

নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ছাত্র-শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিগত নয় দশকে এর গৌরবময় ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে। আজ যাঁরা দেশের শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রশাসন, কূটনীতি, জনসংযোগ, রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প কারখানায় নিয়োজিত রয়েছেন, তাঁদের প্রায় ৭০% এসেছেন এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষালাভ করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় নি। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ভারত সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হলে বঙ্গভঙ্গ রদের রাজকীয় ক্ষতিপূরণ হিসেবে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হন স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ। তিনি এর আগে ১৭ বছর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা রেজিস্ট্রার হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সদস্য ছিলেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে মুসলিম সংখ্যাগুরু পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের জনগণের মনে এক নতুন আশা ও উদ্দীপনার সঞ্চার হয়।

কিন্তু মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রবল বিরোধিতার মুখে এ বিভক্তি রদ করা হলে মুসলমান সমাজ একে তাদের অগ্রযাত্রায় একটি বড় ধরনের আঘাত বলে মনে করে। প্রতীচ্য শিক্ষায় পঞ্চাশ বছর পশ্চাদ্বর্তী মুসলমানগণ বুঝতে পারে যে, শিক্ষাক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ হওয়াটাই সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রে তাদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। ব্রিটিশ কর্তৃক প্রবর্তিত শিক্ষা কার্যক্রম সাদরে গ্রহণের মাধ্যমে হিন্দু সম্প্রদায় সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়। পক্ষান্তরে, মুসলিম সম্প্রদায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পেছনে পড়ে থাকে। এ মনোভাব সম্পর্কে অন্তত চারটি কমিশন মন্তব্য করে, যার মধ্যে ছিল ১৮৮২ সালের হান্টার কমিশন, ১৯১২ সালের নাথান কমিটি, ১৯১৩ সালের হর্নেল কমিটি এবং ১৯১৭ সালের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন।

ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ বাংলা বিভক্তি বাতিলের সিদ্ধান্তে মুসলিম সম্প্রদায়ের অসন্তোষের বিষয় উপলব্ধি করে তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। তখন মুসলিম সম্প্রদায়ের কয়েকজন বিশিষ্ট নেতা ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ, নওয়াব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী এবং এ.কে ফজলুল হক। সাক্ষাৎকালে তাঁরা বঙ্গভঙ্গ রহিত করায় শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। বঙ্গবিভক্তি বিলোপের ক্ষতিপূরণ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে তারা ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানান। লর্ড হার্ডিঞ্জ এ প্রস্তাবের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং বিষয়টি তিনি ব্রিটিশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর নিকট সুপারিশ করবেন বলেও অঙ্গীকার করেন।

১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক সরকারি ঘোষণায় এ বিষয়টি স্বীকৃত হয়। লর্ড হার্ডিঞ্জ স্বীকার করেন যে, ১৯০৬ সাল থেকে পূর্ববাংলা ও আসাম উন্নতির পথে অনেকটা এগিয়ে গেছে। তিনি জানান যে, ওই বছর পূর্ববাংলা ও আসামে ১,৬৯৮ জন উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ছাত্র-ছাত্রী ছিল এবং ওই খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১,৫৪,৩৫৮ টাকা। অবস্থার উন্নতির ফলে ওই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২,৫৬০ ছাত্রছাত্রীতে এবং অর্থব্যয় হয়েছে ৩,৮৩,৬১৯ টাকা। ১৯০৫ থেকে ১৯১০-১১ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা ৬,৯৯,০৫১ হতে ৯,৩৬,৬৫৩-তে উন্নীত হয় এবং প্রাদেশিক কোষাগার থেকে এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ১১,০৬,৫১০ টাকা থেকে ২২,০৫,৩৩৯ টাকায় বৃদ্ধি করা হয়। একইভাবে স্থানীয় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খরচ ৪৭,৮১,৮৩৩ টাকা থেকে বেড়ে ৭৩,০৫,২৬০ টাকায় দাঁড়ায়

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারি সিদ্ধান্তে হিন্দু নেতৃবৃন্দ ক্ষুব্ধ হন। কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট ড. রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ভাইসরয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, ঢাকায় একটি পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বস্ত্তত হবে বাংলাকে ‘অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্তির’ শামিল। তাঁরা আরও মত প্রকাশ করেন যে, পূর্ববাংলার মুসলিম সম্প্রদায় বেশির ভাগই কৃষক এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাদের কোনো উপকার হবে না। লর্ড হার্ডিঞ্জ প্রতিনিধিদলকে আশ্বস্ত করেন যে, বাংলাকে পুনরায় বিভক্ত করার কোনো পদক্ষেপ সরকার কর্তৃক গৃহীত হবে না। তিনি আরও বলেন যে, এ নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হবে আবাসিক এবং তা সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।


এক পর্যায়ে লর্ড হার্ডিঞ্জ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জীকে জানিয়ে দেন যে, তাঁদের বিরোধিতা সত্ত্বেও ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। উপরিউক্ত প্রতিরোধ ছাড়াও এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় আরও কিছু আইনগত ও বস্ত্তগত জটিলতা ছিল।


লন্ডনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাভের পর ভারত সরকার ১৯২১ সালের ৪ এপ্রিল এক পত্রের মাধ্যমে বাংলা সরকারকে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত বিশদ পরিকল্পনা এবং এর আর্থিক সংশ্লেষ সংক্রান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। এতদুদ্দেশ্যে ২৭ মে লন্ডনের ব্যারিস্টার রবার্ট নাথানকে প্রধান করে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি নিয়োগ করা হয়।

এ কমিটির সদস্য ছিলেন বাংলার গণশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক জি.ডব্লিউ কুচলার, কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট ড. রাসবিহারী ঘোষ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, নবাব সিরাজুল ইসলাম, ঢাকার জমিদার ও উকিল আনন্দচন্দ্র রায়, ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ ডব্লিউ.এ.টি আর্চবোল্ড, জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ ললিতমোহন চট্টোপাধ্যায়, ঢাকা মাদ্রাসা (পরবর্তীকালে ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ, বর্তমান কবি নজরুল সরকারি কলেজ) সুপারিন্টেন্ডেন্ট শামসুল উলামা আবু নসর মুহম্মদ ওয়াহেদ, আলীগড়ের মোহাম্মদ আলী, কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষ এইচ.আর জেমস, প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক সি.ডব্লিউ পিক এবং কলকাতা সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ সতীশচন্দ্র আচার্য। নাথান কমিটি নামে পরিচিত এ কমিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি প্রকল্প প্রণয়ন করেন। প্রস্তাবে বলা হয় যে, এ বিশ্ববিদ্যালয় হবে শিক্ষাদান ও আবাসিক কার্যক্রম সম্বলিত প্রতিষ্ঠান এবং কেবল শহরের কলেজগুলি এর আওতাধীন থাকবে। কমিটি অতি দ্রুত ২৫টি বিশেষ উপকমিটির পরামর্শ গ্রহণ করে এবং ওই বছর শরৎকালের মধ্যেই তাদের প্রতিবেদন পেশ করে।

প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত অবকাঠামোর ইমারতের নকশাসহ ৫৩ লাখ টাকা (পরবর্তীকালে গণপূর্ত বিভাগ কর্তৃক ৬৭ লাখ ঢাকায় উন্নীত) মূল ব্যয় এবং ১২ লাখ টাকা বাৎসরিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্তকাজ ও পাঠদানবিষয়ক তথ্যাদি বিশদ আকারে বর্ণিত হয়। কমিটির মতে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার, লিডস, লিভারপুল প্রভৃতি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় এ প্রতিষ্ঠানটি হবে একক আবাসিক শিক্ষাক্ষেত্র। ঢাকা কলেজ,জগন্নাথ কলেজ মোহামেডান কলেজ, উইমেন্স কলেজসহ সাতটি কলেজ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় থাকবে। কলা ও বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর শিক্ষাসহ আইন, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও অন্যান্য বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের আওতাভুক্ত থাকবে। পরবর্তীকালে এলাহাবাদ, বেনারস, হায়দ্রাবাদ, আলীগড়, লক্ষ্ণৌ এবং আন্নামালাইতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেল অনুসরণ করা হয়।

সরকারের প্রশাসনিক দপ্তর প্রতিষ্ঠার জন্য রমনা এলাকায় ইতিপূর্বে অধিগ্রহণ করা ২৪৩ একর ভূমি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত হয়। কার্জন হল, ঢাকা কলেজ, নতুন সরকারি ভবন, সচিবালয়, সরকারি ছাপাখানা, সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসস্থল ও ছোটখাট ইমারত ওই এলাকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তীকালে এ সকল ইমারত, ভূমি ও স্থাপনা বার্ষিক এক হাজার টাকায় বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থায়ী ইজারা দেওয়া হয়।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকান্ডে পরিবর্তন আসে। ওই বছর পূর্ববাংলার শিক্ষা অর্ডিন্যান্স ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক-কাম শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে কলেজ অধিভুক্তির এখতিয়ার যুক্ত করলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ৫৫টি কলেজের এফিলিয়েশন ও তত্ত্বাবধানের ভার এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ন্যস্ত হয়।


পূর্ব পাকিস্তান সরকার অফিস ও অন্যান্য দাপ্তরিক কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বাড়ি দখল করে নেয়। এতে করে বাসস্থান সমস্যার সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান সরকার এসব সমস্যার ব্যাপারে উদাসীন ছিল, কারণ ছাত্ররাজনীতি বন্ধের লক্ষ্যে তারা বিশ্ববিদ্যালয়টিকে শহরের বাইরে স্থানান্তরে সচেষ্ট ছিল। ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান কর্তৃক ক্ষমতা দখলের আগেই পূর্ব পাকিস্তানে শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৯২০ সালের আইনে প্রদত্ত একাডেমিক স্বাধীনতা ও ঐতিহ্যের বিপরীতে ১৯৬১ সালের অর্ডিন্যান্স জারি করে। কালাকানুন হিসেবে চিহ্নিত এ অর্ডিন্যান্স বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্যোগেই গড়ে উঠে ১৯৬৮ সালের এগারো দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান। পরবর্তী সামরিক সরকার সারা দেশব্যাপী নির্যাতন ও ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করলে ১৯৭১ সালে বাঙালির মুক্তির লক্ষ্যে দেশের জনগণের সঙ্গে এক হয়ে ছাত্ররা দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী স্বাধীনতা যুদ্ধে লিপ্ত হয়।

পরিকল্পনার শিকার হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যাপলয়ের ১৯ জন শিক্ষক। ২৫ মার্চ রাতে আরো শহীদ হন ১০৪ জন ছাত্র, ১ জন কর্মকর্তা ও ২৮ জন কর্মচারী।

১৯৭১ সালের ২ মার্চ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবনের পশ্চিমগেটের দোতলার ছাদের উপর প্রথম ‘স্বাধীন বাংলার পতাকা’ উত্তোলন করে। ৭১’-এর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান বাহিনী অপারেশন সার্চ লাইট নামে অতর্কিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপর হামলা করলে অনেকে শহীদ হন। মহান মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের শহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য উপাচার্য ভবনের সম্মুখস্থ সড়ক দ্বীপে ২৬ মার্চ ১৯৯৪ তারিখে উদ্বোধন করা হয় ‘বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক’। এই স্থিতিফলকে ১৯ জন শিক্ষক, ১০৪ জন ছাত্র, ১ জন কর্মকর্তা, ২৮ জন কর্মচারীসহ ১৫০ জন শহীদের নাম লিপিবদ্ধ হয়েছে।

মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে ‘ডাকসু’ কলাভবনের সামনে ১৯৭২ সালে ‘অপরাজেয় বাংলা’ ভাস্কর্য স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ১৯৭৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষে ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করা হয়। টিএসসি সড়ক দ্বীপে ১৯৮৮ সালে শামীম শিকদার নির্মাণ করেন ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’ ভাস্কর্যটি। স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্যটি শামীম শিকদার নির্মাণ করেন ১৯৯১ সালে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ছাড়াও বায়ান্নর মহান ভাষা দিবস, ছেষট্টির স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন, উনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান প্রাধান্য পেয়েছে এ ভাস্কর্যে। এ ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে উৎসর্গকৃত সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্য (১৯৯৭)।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিক্ষা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বাধীনতা পুরস্কার-২০১১ প্রদান করা হয়। এছাড়াও এ পর্যন্ত ১৯ জন শিক্ষককে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়; মুক্তবুদ্ধি চর্চা ও জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয় নতুন দিগন্তের। শিক্ষক ও ছাত্রদের স্বাধীনভাবে পড়ালেখা ও জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স ১৯৬১ রদ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩ জারি করে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুজ্জীবিত হয়। স্বাধীনতা উত্তরকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের সংখ্যা অভাবনীয়রূপে বৃদ্ধি পায়। ছাত্র, শিক্ষক ও সাধারণ কর্মচারীদের বাসস্থান, শ্রেণীকক্ষ ও গবেষণাগারের জন্য স্থান সংকুলানের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতা সম্প্রসারণ করা হয় এবং এজন্য বর্ধিত আকারে অর্থ বরাদ্দও করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিগত প্রায় ১০০ বছরে নিঃসন্দেহে বহু ভালো গবেষণা, উদ্ভাবন ও সৃষ্টিশীল কাজ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, দার্শনিক জি সি দেব, এফ সি টার্নার, ডাব্লিউ জেনকিন্স, রমেশ চন্দ মজুমদার, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রাষ্ট্রবিজ্ঞনী আবদুর রাজ্জাক, ড. আহমদ শরীফ, সরদার ফজলুল করিম, কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, ড. আনিসুজ্জামান, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. হাসিনা খানমসহ অনেক অসামান্য গবেষক-পণ্ডিত ও কবি-লেখকের নাম আমরা উল্লেখ করতে পারি।তবে বর্তমানে গবেষণার অবস্থা খুব একটা সন্তোষজনক নয়।দেশে শীর্ষ স্থান ধরে রাখলেও বহিবিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর তুলনায় তা নগন্য।

পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলার উৎকর্ষ সাধন এবং শরীরচর্চার মাধ্যমে সুস্থ-সবল জনগোষ্ঠী সৃষ্টির লক্ষ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের খেলাধুলা ও শরীরচর্চার জন্য রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্র। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ ছাড়াও রয়েছে একটি আধুনিক সুইমিং পুল কমপ্লেক্স। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র প্রতিবছর আন্তঃবিভাগ, আন্তঃহল, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় পর্যায়ে প্রায় সব ধরনের খেলাধুলার ব্যবস্থা করে থাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে একাডেমিক শিক্ষা ও জ্ঞানের পাশাপাশি অন্যান্য জ্ঞান, সুকুমারবৃত্তির চর্চার প্রয়োজনে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটি দেশের সংস্কৃতি পৃষ্ঠপোষকতা, সমাজের অন্যান্য সম্প্রদায়ের জন্য পরিষেবা রুপে আবির্ভূত হয়েছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক -সামাজিক সংগঠনে টিএসসি আজ স্বয়ংসম্পূর্ন। মাইম একশন, ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, সাংবাদিক সমিতি, জয়োধ্বনি ,স্লোগান ৭১,নাট্য সংসদ,ব্যান্ড সোসাইটি, কালচারাল সোসাইটি,আইটি সোসাইটি, চলচ্চিত্র সংসদ, ডান্স সোসাইটি, প্রভাতফেরি সহ বিভিন্ন সংগঠনের দরুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) সাংস্কৃতিমনাদের জন্য তীর্থ স্থানে পরিণত হয়েছে।

গৌরবের ৯৮ বছরে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সফলভাবে মাথা উচু করে দাড়িয়েছে। শুধু কবি,সাহিত্যিক কিংবা বিজ্ঞানী বা বুদ্ধিজীবী নয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি দেশের জন্ম দিয়েছে। এই গৌরব বিশ্বের অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। ভালো থাকুক প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই প্রত্যাশায়....

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়