১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:৪৮

ফিনিক্স পাখি হয়ে ফিরে আসা তারেক রহমানের কাছে জনপ্রত্যাশা

ব্যারিস্টার মাহাবুবুর রহমান ও তারেক রহমান  © সংগৃহীত

গ্রীক পুরাণের ফিনিক্স পাখির মতো বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরে আসলেন তারেক রহমান। বারবার ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য শত অপচেষ্টার পরও এদেশের মানুষ অভাবনীয় ভালোবাসায় বরণ করে নিয়েছে আপনাকে। অবশেষে অসংখ্য ষড়যন্ত্র ও নানামুখী অপপ্রচারের বেড়াজাল ছিন্ন করে আপনি হয়ে উঠলেন সবার আস্থার প্রতীক। নতুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, আপনাকে অভিনন্দন। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হিসেবে এবার আপনিও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন। এটি মহান আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমত এবং পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। জীবনের ঝুঁকি, নিপীড়ন ও নির্যাতনের কঠিন পথ অতিক্রম করে নেতৃত্বগুণে আজ আপনি এই অবস্থানে পৌঁছেছেন। নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আপনার ক্যারিশমেটিক নেতৃত্বে দেশের মানুষ যে ভালোবাসা ও সমর্থন দেখিয়েছে, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে ১২ ফেব্রুয়ারি যা দেশজুড়ে ‘তারেক বসন্ত’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। বাংলার প্রকৃতিতেও বসন্ত ঋতুর আর্বিভাব হতে যাচ্ছে।

'সবার আগে বাংলাদেশ' ‘প্রার্থী নয়, মার্কা দেখে ভোট দিন’, ‘শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়াকে ভোট দিন’, ‘তারেক রহমানকে ভোট দিন’- এই আহ্বানগুলোতে সাড়া দিয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। দেশে ফিরেই আপনার ঘোষণা “I have a plan for the people of my country” সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তারই প্রতিফলন দেখা গেছে ব্যালটে। সারাদেশে ধানের শীষকে বিজয়ী করেছে জনগণ। মা বেগম খালেদা জিয়াকে হারানোর শোকের মধ্যেও যেভাবে আপনি গণমানুষের দুয়ারে পৌঁছেছেন, তা ছিল অনেকের কল্পনারও বাইরে। বিরামহীনভাবে জেলা, মহানগর ও বিভাগীয় শহরগুলোতে ভ্রমণ করেছেন। আপনার আহ্বানে মানুষ সাড়া দিয়েছে, আপনাকে সমর্থন জানিয়েছে। যে বাংলাদেশ থেকে ষড়যন্ত্রকারীরা আপনাকে ২০০৮ সালে আহত অবস্থায় দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল, যে দেশের ফ্যাসিবাদী শক্তি আপনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক রেড অ্যালার্ট জারি করেছিল, সেই বাংলাদেশের মানুষই আজ আপনাকে দেশ পুনর্গঠনের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে। ইংরেজ কবি রবার্ট ব্রাউনিং-এর The Patriot কবিতার ভাষায় বলতে হয়, বাংলার মানুষ আপনার চলার পথে গোলাপের পাপড়ি বিছিয়ে দিয়েছে। শহর ও গ্রামজুড়ে রাস্তা, দালান ও জনপদে প্রতিধ্বনিত হয়েছে আপনার বিজয়ধ্বনি। পতাকা হাতে মানুষ আপনাকে অভিবাদন জানিয়েছে এবং সর্বশেষ নির্বাচনের আপনার প্রতি তাদের পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেছে।

এখন সময় আপনার। শত-সহস্র লেখক, কবি ও সাংবাদিক আপনার এই বিজয়গাঁথা নিয়ে উচ্ছ্বসিত লেখনী প্রকাশ করবেন। বিজয়ের পেছনের গল্প লিখবেন অনেকেই। আপনার পরিকল্পনা ও অঙ্গীকার, পাশাপাশি নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও ত্যাগ- সবই তাদের লেখায় স্থান পাবে। একই সঙ্গে অনেকে আসন্ন প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার হিসাব-নিকাশ কষবেন। দীর্ঘ ১৮ বছর পর আপনার দল বিএনপি ক্ষমতায় আসায় নেতাকর্মীদের মনে নতুন করে আশার আলো জেগেছে। এই আশা ও প্রত্যাশার সঠিক ব্যবস্থাপনা, এবং জনগণের কাছে দেওয়া ‘পরিকল্পনা’ ও ‘অঙ্গীকার’ বাস্তবায়নই আপনার প্রধানমন্ত্রীত্বের মূল দায়িত্ব হয়ে উঠবে। আপনার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পথ যেমন কঠিন ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ ছিল, তেমনি বর্তমান ভঙ্গুর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর বাংলাদেশ পরিচালনাও সহজ হবে না। জনগণের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার যথাযথ প্রতিফলন ঘটাতে পারাই হবে আপনার প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

দেশের মানুষ মূলত নেতার ওপর আস্থা রাখেন শর্ত দিয়েই। আপনার ওপর আস্থা রাখতে মানুষের প্রধান শর্তই হলো, দেশে শান্তি ফেরানো। দুর্নীতি-অনিয়মের লাগাম টেনে ধরে মানুষকে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর সুযোগ করে দেয়া। এখন এই কাজটি এতো সহজ হবে না। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন নির্বাচিত সরকারের ওপর মানুষের আস্থা তৈরি করা কঠিন বিষয়। এই কঠিন দায়িত্বটি পালন করার উপযুক্ত লোক হিসেবে জনগণ আপনাকেই বেছে নিয়েছেন। তাদের আকাঙ্খা পূরণ করতে আপনাকে কঠোর এবং বিচক্ষণতা দেখাতে হবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই। এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের সামান্য কয়েকটি উল্লেখ করছি-

প্রথমত, সৎ, দক্ষ এবং গতিশীল ব্যক্তিদের নিয়েই কেবিনেট গঠন করতে হবে। শহীদ জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভাকে এক্ষেত্রে মডেল হিসেবে রাখা যায় নিঃসন্দেহে। তিনি দেশের বিভিন্ন সেক্টরের সবচেয়ে সফল প্রফেশনালদের তাঁর মন্ত্রিসভায় অর্ন্তভুক্ত করেছিলেন, যেটি আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে সফল কেবিনেট হিসেবে বিবেচিত। আপনার মন্ত্রী পরিষদে একজন সদস্যও অর্থনৈতিক ও নৈতিকতার নিরিখে অসৎ হওয়ার সুযোগ নেই। আপনার কেবিনেটকে কার্যকর ও সৎ রাখতে মন্ত্রী পরিষদের রিভিউ এবং ওয়াচডগ সিস্টেম রাখা অত্যাবশ্যক।

দ্বিতীয়ত, দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই হবে আপনার সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের জনগণ চায়, যে কোন সরকারি দপ্তরে গেলে মানুষ হয়রানি ছাড়া তার কাঙ্খিত সেবা পাবে। এটুকু নিশ্চিত করতে পারলেই ভবিষ্যত সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা বজায় থাকবে। এক্ষেত্রে প্রধান বাঁধা আমলাতন্ত্র। আপনি নিশ্চয় অবগত আছেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে আমলাতন্ত্রই তাদের প্রধান টুলস হিসেবে কাজ করেছিল। আমলাতন্ত্র, পুলিশ ও বিচার বিভাগের কাঠামোগত সংস্কার করে জনগণের সেবা নিশ্চিত করার জন্য আপনাকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।

তৃতীয়ত, নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেয়া সকল ইশতেহার বা প্ল্যান বাস্তবায়নে আপনাকে নিয়মিত ফলোআপ কার্যক্রম রাখতে হবে। সবকিছু একদিনে আলাদ্বীনের চেরাগের মতো বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, তবে জনগণের কাছে দৃশ্যত আপনার আন্তরিকতা ও চেষ্টার প্রমাণ রাখা জরুরী।

চতুর্থত, বিএনপির নেতাকর্মীদের বিষয়ে 'নেগেটিভ ব্রান্ডিং' বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আপনি আগেই বলেছেন, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি বন্ধে টু স্টেজ পদক্ষেপ নেবেন। কোনো নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উঠলে দলীয়ভাবে তাতক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যেটা আপনি গত দেড় বছরে করেছেন। দল ও সরকারে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আপনাকে সদা তৎপর থাকতে হবে।

পঞ্চমত, নতুন প্রজন্মের সাথে আপনার ডায়ালগ অব্যাহত রাখতে হবে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ছাত্রদের হাতে ছাত্রদলের রাজনীতি নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো শান্ত রাখতে হবে। কারণ ক্যাম্পাস শান্ত থাকলে দেশও শান্ত থাকবে। এছাড়া নতুন প্রজন্মের মধ্যে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির চর্চার জন্য সৃজনশীল উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যা ভবিষ্যতে সরকারকে উন্নয়নমুখী কাজে সময় বেশী দেয়ার সুযোগ করে দেবে। 

ষষ্ঠত, সরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে এবং আপনার প্লান ও ভিশনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ করা নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক-বীমায় যে হাজার কোটি টাকার লোপাট হয়েছে, নতুনভাবে যেন এমন লুটেরার আর্বিভাব না হয় - সেটা আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে।

সপ্তমত, জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ যে ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখছে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব ভবিষ্যৎ সরকারগুলোকে নিতে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ও তরুণ প্রজন্মের মাঝে জুলাই আরো অনেকদিন সক্রিয় থাকবে। সরকার পরিচালনায় জুলাইয়ের এই আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলন ঘটাতে আপনাকে সজাগ থাকতে হবে।

জনগণের এমন হাজারো প্রত্যাশা পূরণে আপনি হয়ত প্রতিটি দিন ও রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করবেন। তবে এই পরিশ্রমের মাঝেও ইংরেজ কবি রবার্ট ব্রাউনিং-এর The Patriot কবিতার শেষাংশ স্মরণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। যে জনতা একদিন একজন নেতাকে গোলাপের পাপড়ি বিছিয়ে বরণ করে নেয়, সেই জনতাই প্রয়োজনে সম্পূর্ণ বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। জীবনের সমস্ত সময় ও শ্রম দিয়েও যদি একজন নেতা তার অঙ্গীকার পূরণে ব্যর্থ হন, মানুষ শেষ পর্যন্ত মুখ ফিরিয়ে নেয়। রবার্ট ব্রাউনিং-এর ভাষায় প্রশ্ন উঠে আসবে- সৃষ্টিকর্তা কি আমার কাজের যথাযথ প্রতিদান দিলেন? অতএব, আপনি যে সততার সঙ্গে মানুষের কল্যাণে কাজ করছেন, তা জনগণকে যেমন উপলব্ধি করতে হবে, তেমনি তা তাদের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।

আপনার রাজনৈতিক দর্শন 'সবার আগে বাংলাদেশ’ বাস্তবায়ন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রত্যাশায় ১৭ কোটি মানুষ। শুভ কামনা, দেশনায়ক তারেক রহমান।

লেখক: আইনজীবী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক