০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৭

চায়ের আড্ডা: তরুণদের কণ্ঠ, নতুন রাজনীতি এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

চায়ের আড্ডা: তরুণদের কণ্ঠ, নতুন রাজনীতি এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ  © সংগৃহীত

রাজনীতিতে সংলাপের ধরন বদলাচ্ছে। এ কথা অনেক দিন ধরেই বলা হচ্ছিল। কিন্তু গতকালের “চায়ের আড্ডা” আয়োজন সেই পরিবর্তনকে দৃশ্যমান করেছে বাস্তবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ। যারা আজ শিক্ষার্থী, আগামীর শ্রমশক্তি, উদ্যোক্তা ও নাগরিক নেতৃত্বের ভিত্তি। এই তরুণ জনগোষ্ঠীর দক্ষতা, মনোভাব ও অংশগ্রহণই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ উন্নয়ন ও মধ্যম আয়ের ফাঁদ অতিক্রম করতে পারবে কি না। ঢাকার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জাইমা রহমান এর এই অনানুষ্ঠানিক আলোচনা তাই কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক সমাবেশ ছিল না; বরং এটি ছিল তরুণদের জীবনের বাস্তবতা, হতাশা, স্বপ্ন ও নীতিনির্ভর প্রস্তাব শোনার একটি খোলা পরিসর, যেখানে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের চালিকাশক্তির কণ্ঠ সরাসরি উঠে এসেছে।

এই আড্ডার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কে কথা বলছে, এবং কীভাবে কথা বলা হচ্ছে। এখানে কোনো মুখস্থ বক্তৃতা, দলীয় স্লোগান বা একমুখী ভাষণ ছিল না। শিক্ষার্থীরা নিজেরা কথা বলেছেন - কেউ বলেছেন কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা নিয়ে, কেউ বলেছেন শিক্ষা ও বাস্তব দক্ষতার মধ্যকার ব্যবধান নিয়ে, কেউ বলেছেন ঢাকার নাগরিক জীবনের চাপ, যানজট ও দূষণের কথা, আবার কেউ তুলে ধরেছেন মেয়েদের অনলাইন হেনস্তা, নিরাপত্তাহীনতা ও মানসিক চাপের অভিজ্ঞতা।

এই বক্তব্যগুলো নতুন নয়। কিন্তু এতদিন এগুলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে খুব কমই জায়গা পেয়েছে। “চায়ের আড্ডা” সেই ব্যবধানটি স্পষ্ট করেছে: তরুণরা কেবল সুবিধাভোগী বা ভবিষ্যতের ভোটার নয়, তারা এখনই রাষ্ট্রের অংশীদার হতে চায়।

তরুণদের প্রশ্ন: শুধু অভিযোগ নয়, নীতিগত চ্যালেঞ্জ
অনেকেই তরুণদের বক্তব্যকে ‘অভিযোগ’ বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু এই আড্ডায় স্পষ্ট হয়েছে এই অভিযোগগুলো আসলে নীতিগত ব্যর্থতার প্রতিফলন।
যখন একজন শিক্ষার্থী বলেন, “ডিগ্রি আছে, কিন্তু কাজ নেই,” তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত হতাশা নয়; সেটি শিক্ষা ব্যবস্থা, শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয়হীনতার প্রশ্ন।
যখন একজন ছাত্রী অনলাইন বুলিং বা নিরাপত্তাহীনতার কথা বলেন, সেটি কেবল সামাজিক সমস্যা নয়; সেটি ডিজিটাল শাসন, আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক মানসিকতার ব্যর্থতার দিক নির্দেশ করে।
এই আড্ডা দেখিয়েছে, তরুণরা শুধু সমস্যার কথা বলছে না। তারা জানতে চায়, রাষ্ট্র তাদের জন্য কী পরিকল্পনা করছে, এবং তারা নিজেরা সেই পরিবর্তনের অংশ হতে পারবে কি না।
শোনার রাজনীতি: একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

এই আয়োজনের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো: শোনা।
জাইমা রহমান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই সারিতে বসে, টেবিল থেকে টেবিলে গিয়ে কথা শুনেছেন। এটি প্রতীকী হলেও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শোনা সাধারণত ক্ষমতার শীর্ষে বসে হয় না; বরং সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে চলে এসেছে।

এই শোনার ভঙ্গি একটি ভিন্ন বার্তা দেয়। রাজনীতি যদি আবার বিশ্বাসযোগ্য হতে চায়, তাহলে তাকে মানুষের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে, যারা আগের রাজনৈতিক ভাষা ও প্রতিশ্রুতিতে ক্রমশ আস্থা হারাচ্ছে।

তারেক রহমানের ‘নীতিনির্ভর রাজনীতি’ এবং নতুন প্রজন্ম
এই আয়োজনকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বৃহত্তর এক রাজনৈতিক প্রবণতার অংশ, যেখানে তারেক রহমান এর নেতৃত্বে বিএনপি রাজনীতিকে স্লোগান ও সংঘাতের জায়গা থেকে নীতি, পরিকল্পনা ও সংলাপের দিকে নেওয়ার একটি সুস্পষ্ট প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর প্রবর্তিত “The Plan” এর আওতায় গড়ে ওঠা আটটি নীতিগত স্তম্ভ: স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, কৃষকের ক্ষমতায়নে কৃষক কার্ড, নারীর অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতায় ফ্যামিলি কার্ড, পরিবেশ ও জলবায়ু, খেলাধুলা, এবং ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বের কল্যাণ, এই নতুন ধারার রাজনীতির ভিত্তি। “চায়ের আড্ডা” সেই নীতিনির্ভর রাজনীতিরই একটি বাস্তব প্রয়োগ, যেখানে তরুণদের অভিজ্ঞতা ও মতামত ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তরুণদের সঙ্গে এমন সরাসরি আলোচনা সেই বার্তাই দেয়। আগামী দিনের রাজনীতি আর কেবল অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের একচেটিয়া বিষয় থাকবে না; সেখানে শিক্ষার্থী, তরুণ পেশাজীবী ও নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

এক দিনের আড্ডা নাকি ধারাবাহিক সংলাপ?
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই: এই “চায়ের আড্ডা” কি একটি প্রতীকী আয়োজন হয়ে থাকবে, নাকি এটি ধারাবাহিক সংলাপের সূচনা?
যদি তরুণদের কথা শোনা হয় কিন্তু নীতিতে তার প্রতিফলন না ঘটে, তাহলে হতাশা আরও গভীর হবে। কিন্তু যদি এই ধরনের আলোচনা থেকে শিক্ষা সংস্কার, কর্মসংস্থান নীতি, নগর ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল নিরাপত্তার মতো বিষয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হয় তাহলে এই আড্ডা ইতিহাসে একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবেই স্মরণীয় হবে।

শেষ কথা
“চায়ের আড্ডা” আমাদের মনে করিয়ে দেয় রাজনীতি কেবল ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া নয়; এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি সামাজিক চুক্তি। তরুণরা সেই চুক্তি নতুন করে লিখতে চায়। আর শর্ত একটাই: সম্মান, অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ। এই আড্ডা যদি সত্যিই সেই পথের সূচনা হয়, তবে বাংলাদেশ শুধু তরুণদের কথা শুনবে না, তরুণদের হাত ধরেই এগিয়ে যাবে।

লেখক: বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা