৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ২০:৫৪

শহর বাঁচাও বুড়িগঙ্গা বাঁচবে

ধুঁকছে বুড়িগঙ্গা  © টিডিসি ছবি

বুড়িগঙ্গা শহরের বুকে এক অপার নাম, যে নামে মিশে আছে না জানি কত শত শতাব্দীর ইতিহাস । একসময় বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষেই গড়ে উঠেছিল রাজধানী শহর ঢাকা। রাজধানীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই নদী নগরীর হাজারো ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে যুগ যুগ ধরে বহমান। সময়ের স্রোতে ইতিহাসের ধারক-বাহক বুড়িগঙ্গা নদী আজ ভয়াবহ অবহেলা ও দূষণের কবলে মৃত্যুপথযাত্রী। নদীর এই করুণ পরিণতির সঙ্গে সঙ্গে নগরীর সামগ্রিক অবক্ষয়ও দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। 

আমরা কি চিরকাল কেবল এই শহরকে ভোগের বস্তু হিসেবেই দেখব? এ শহরও তো  আমাদের কাছে কিছু চাওয়া-পাওয়া প্রত্যাশা করে, চায় সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ । তার সেই ন্যায্য চাহিদা পূরণ করা তো আমাদেরই কর্তব্য।নগরীর অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডের ফলে একদিকে যেমন শহরের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে , অন্যদিকে তেমনি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদী। এই শহর যদি বাঁচে, তবেই বাঁচবে বুড়িগঙ্গা। আর বুড়িগঙ্গা বাঁচলে তবেই টিকে থাকবে এই নগরীর প্রাণ। 

বুড়িগঙ্গার আর্তনাদের গল্প শুনতে শুনতেই বড় হচ্ছে এ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা। একসময়ের প্রাণচঞ্চল এই নদী আজ যেন নগরীর ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে। মানুষ নদীতে নির্দিধায় ফেলছে— শিল্প কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য, গৃহস্থলির বর্জ্য, পচা ফলমূল, প্লাস্টিক বোতল, দোকানের অবৈধ দখলদারিত্ব এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে নগরীর পরিবেশ দূষিত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। পাশাপাশি এইসব বিষাক্ত বর্জ্য ও আবর্জনা বুড়িগঙ্গার পানিতে মিশে নদীর গভীরতা যেমন হ্রাস পেয়েছে তেমনি নদী তার স্বাভাবিক শক্তি ও স্রোত হারিয়েছে বহুকাল আগেই । এই অবস্থায় বুড়িগঙ্গা নদীর সুরক্ষার দায়িত্ব আসলে কার এমন প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। বুড়িগঙ্গা কি আদৌ ফিরে পাবে কখনও অতীতের সেই স্রোতধারা? 

নগরীর অধিকাংশ বাসাবাড়ির পয়োবর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গা নদীতে গিয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে প্রতিদিন নদীতে চলাচলকারী লঞ্চগুলোর বর্জ্যও নির্বিচারে নদীতে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। ফলে নদীর পাশাপাশি পুরো নগরীর পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য তা গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃষ্টির দিনে পুরান ঢাকার অলি-গলির অবস্থা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। রাস্তার পাশের ফুটপাত ও বাসাবাড়ির আবর্জনা বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেনে গিয়ে জমে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দেয়। ফলে ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা উপচে রাস্তায় উঠে আসে এবং চরম জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়।

মানুষের তীব্র অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে বুড়িগঙ্গা যেমন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, ঠিক তেমনি জীবন বাঁচানোর তাগিদে শহুরে কাকও মুখ ফিরিয়ে অন্যত্র গমন করেছে। নির্বিচারে নগরীর বড় বড় গাছ কেটে কাক ও ছোট ছোট পাখিদের বাসা ভেঙে অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে উঁচু উঁচু দালান।তাছাড়াও অতিমাত্রার শব্দদূষণ, যানবাহনের কালো ধোঁয়া আর নগরীর কোলাহলে ক্লান্ত পাখিরা একে একে নগর ত্যাগ করেছে।এক সময় এই নদীর পাড়ে সকাল-বিকেল দেখা যেত কাকেদের ঝাঁক। মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, তবে শহর ছেড়ে কোথায় গেল শহুরে কাক, কোথায় গেল শহরের সব পাখিরা?

কয়েক বছর পুরান ঢাকায় কাটিয়ে এতটুকু বুঝেছি, বুড়িগঙ্গা নদী নিয়ে আমাদের ভাবনা ও আবেগ খুব একটা নেই বললেই চলে । এই নগরীর মানুষকে এমনও অভিযোগ করতে শুনেছি—“আমার জাতি হিসেবেই খারাপ, বুড়িগঙ্গার এই দুর্দশার মূলে আমরাই।”  কথাটি নির্মম হলেও অস্বীকার করার উপায় নেই। বুড়িগঙ্গা নদী নিয়ে গণমাধ্যমে শত শত সংবাদ প্রকাশিত হলেও নদী রক্ষায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ আজও চোখে পড়ে না। ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতাই যেন এই নদীর ক্রমাগত মৃত্যুর পথকে আরও নিশ্চিত করে তুলছে।

যখন আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তখন পাঠ্যবইয়ে জেনেছি বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে রাজধানী ঢাকা অবস্থিত। কিন্তু সে সময় রাজধানী ঢাকা আমার কাছে ছিল একেবারেই অপরিচিত এক নাম। এরপর বহুবার রাজধানী শহরে এলেও নগরীর যানজট পেরিয়ে বুড়িগঙ্গার স্রোতধারা প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য তখন আমার হয়নি।

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলের পর ২০২২ সালে কয়েক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি চক্কর কাটিয়ে শেষমেশ পুরান ঢাকার কবি নজরুল সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগে ঠাঁই হলো আমার। আশ্চর্যের বিষয়, তখনও বুড়িগঙ্গা নদী আমার অদেখাই । ভর্তি হয়ে কয়েক মাস কেটে যায় বন্ধুদের সঙ্গে পরিচিত হতে হতেই। 

তারপর একদিন প্রবল কৌতূহল ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমি বেরিয়ে পড়লাম বুড়িগঙ্গা নদী দর্শনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু নদীর তীরে পৌঁছে থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম—মনে প্রশ্ন জাগল, ভুল কোনো জায়গায় এসে পড়িনি তো? তখন এক দোকানিকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হলাম, এটাই আমাদের বুড়িগঙ্গা। এতকাল কল্পনায় যে বুড়িগঙ্গার স্বপ্ন বুনে রেখেছিলাম, তা মুহূর্তেই যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। যে প্রত্যাশা নিয়ে নদীর রূপ দর্শনে গিয়েছিলাম, তার বদলে চোখে পড়ল জীর্ণশীর্ণ, কালচে ও দূষিত পানি এবং তীরে ছড়িয়ে থাকা ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। সেই দৃশ্য দেখে মনটা বিষন্নতায় ভরে উঠল। একসময় যে নদী ছিল যাত্রাপথের প্রাণকেন্দ্র, আজ তা নগরীর বুকে কেবল এক অবহেলিত নাম হিসেবেই টিকে আছে।

ব্যস্ত শহরের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা এই শহুরে নদী অদ্ভূত এক মায়ায় বারবার আমাকে টেনে নিয়ে গেছে নদীর পাড়ে। কতসময় যে এই বুড়িগঙ্গার তীরে কাটিয়েছি তার সঠিক হিসেব আমার জানা নেই। একসময় যে নদী ছিল প্রাণচঞ্চল, যার বুকে রুপালি ইলিশের ঝাঁক দল ধরে ছুটে বেড়াত , আজ সেই বুড়িগঙ্গার এই বেহাল দশা আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। 

দূষণ আর অবহেলার ভারে নদীর জল আজ কালচে, তার স্রোত ক্লান্ত। এই নদীর পেটে লুকিয়ে আছে নগরীর হাজারো সভ্যতা ও ইতিহাসের গল্প, একসময়ের জীবন্ত ঢাকার স্মৃতি। বুড়িগঙ্গা আজ নীরব, অথচ সেই নীরবতার মধ্যেই যেন নদী তার হারানো দিনের স্মৃতিগান গেয়ে যাচ্ছে এবং তাকে রক্ষার আকুতি প্রকাশ করছে নিঃশব্দে নীরবে নিভৃতে।

বর্ষার মৌসুমে বুড়িগঙ্গাও আর পাঁচ দশটা নদীর মতোই ফুলে ফেঁপে উঠতে শুরু করে , তবে তা বেশিদিন দীর্ঘায়িত হয় না । নগরীর বিপুল পরিমাণ ময়লা-আবর্জনা গিলে খেতে খেতেই নদীটি পেট ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। বর্ষায় নদীতে পানি বৃদ্ধি পেলেও, শুষ্ক মৌসুমে নদী থেকে ভয়াবহ দুর্গন্ধ ছড়ায়।

এই অপরিচিত নগরীতে তখন আমি সদ্য আগত এক অনার্স পড়ুয়া প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। শহরটা আমাকে তখনো আপন করে নেয়নি, কলতা বাজার ছোট মসজিদ এলাকার একটি বাসার মেসে দিন কাটছিল আমার অচেনা-অজানা এই শহরে।একদিন গভীর রাতে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল । তখন চারদিকে ছড়িয়ে ছিল এক ভয়াবহ দুর্গন্ধ যা সহ্য করা হয়ে উঠছিল কঠিন। বিস্মিত হয়ে বিষয়টি জানতে রুমমেট বড় ভাইকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, বুড়িগঙ্গা নদীর পানি কমে গেলে এমন দুর্গন্ধ ছড়ায় রাতে,  নদী থেকেই এই দুর্গন্ধ ভেসে আসছে। নদীর পানি থেকেও এমন নোংরা দুর্গন্ধ ছড়াতে পারে তা বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হচ্ছিল সেদিন। 

রাতের বুড়িগঙ্গা গ্রাম বাংলার চিরচেনা নদীর মতোই মোহ ছড়ায়। শান্ত, নির্জন এই নদীর কোমল বাতাস হৃদয়ের পরশ ছুঁয়ে যায়। নদীর বুকে একটু পরপর টিপটিপে জোনাকি-জ্বলা আলো জ্বালিয়ে ভেসে চলছে যাত্রীবাহী ও মালবাহী ছোট ছোট নৌকা। অনেক যাত্রীরা লালকুঠি ঘাটে ছুটে আসছে বাসায় ফেরার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। তবে পানি কমে গেলে নদীর বুক থেকে ভেসে আসে তীব্র দুর্গন্ধ, যা রাতের এই সৌন্দর্যকে কিছুটা ম্লান করে দেয়।

বুড়িগঙ্গা নদী রক্ষা করতে হলে সবার আগে দরকার একটি পরিচ্ছন্ন ও সচেতন শহর। এই সচেতনতার সূচনা আমাদের নিজেদের থেকেই শুরু হতে হবে। নাগরিক হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণ না করলে বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। আমরা যত বেশি সচেতন হব, নদী ততটাই সুরক্ষিত থাকবে। একই সঙ্গে যেখানে-সেখানে ময়লা ও বর্জ্য ফেলা পরিহার করে নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। শিল্পকারখানার ক্ষতিকর বর্জ্য নদীতে ফেলা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং বুড়িগঙ্গা সুরক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। তবেই আমরা জীবন্ত ও সুস্থ বুড়িগঙ্গা ফিরে পাব।

লেখক
সংবাদকর্মী ও শিক্ষার্থী, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, ঢাকা।