ভোটের ইশতেহারে কওমী শিক্ষা: বাস্তবতা ও প্রত্যাশা
বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষার বড় একটি অংশ নির্ভর করে কওমী শিক্ষার উপর। প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজার কওমী শিক্ষার্থী দাওরায়ে হাদীস শিক্ষা সম্পন্ন করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একটি জাতিকে কোরআন, হাদীস ও ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে ভূমিকা রাখেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠী নৈতিকতা গঠন, দরিদ্রদের শিক্ষা ও আধুনিক অভিযোজনে জাতীয় মাদ্রাসা শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও তারা এখনো অবহেলিত।
২০১৮ সালে দাওরায়ে হাদীসকে মাস্টার্সের সমমান প্রদান করা হলেও, জাতীয় শিক্ষাধারা ও কর্মসংস্থানের মূল স্রোতে তাদের পূর্ণাঙ্গ সম্পৃক্ততা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। কওমি মাদ্রাসাগুলোর প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের কোনও স্বীকৃতি নেই। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক দলগুলো কওমী শিক্ষাকে জাতীয়করণ ও স্বীকৃতি প্রদান করবে বলে কামনা আমাদের সকলের।
সারাদেশে সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীদের অনুদানে পরিচালিত অন্তত ৩৩ হাজার কওমি ধারার মাদ্রাসা ও হেফজখানা প্রতিবছর একলাখেরও বেশি শিশুর স্বাক্ষরজ্ঞান নিশ্চিত করে আসছে। এই শিশুদের একটি বড় অংশই এসব প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে খাবার ও পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। শুধু ধর্মীয় শিক্ষাই নয় পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের সাধারণ শিক্ষাও দেওয়া হচ্ছে।
কওমী শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও জাতীয়করণ করার লক্ষ্যে আসন্ন নির্বাচিত সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা হলো- এই শিক্ষাকে আইনি স্বীকৃতি ও গেজেট বাস্তবায়ন। পাশাপাশি ২০১৮ সালের 'কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা সনদ আইন'-এর ধারাবাহিকতায় 'সানাবিয়া' স্তরকে এসএসসি এবং 'সানাবিয়া উলইয়া' স্তরকে এইচএসসি এর সমমান প্রদান করে দ্রুত গেজেট প্রকাশ করতে হবে।
দাওরায়ে হাদীসকে মাস্টার্স (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান দেওয়া হলেও এর প্রয়োগ এখনো সীমিত। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সকল প্রতিষ্ঠানে যেখানে মাস্টার্স সমমানের যোগ্যতা চাওয়া হয়, সেখানে কওমী সনদধারীদের আবেদনের আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রশাসনিক পদমর্যাদা সুনির্দিষ্ট করতে হবে।
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কওমী শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চতর গবেষণা এমফিল, পিএইচডি, আরবি সাহিত্য ও ইসলামিক ফিন্যান্সের মতো বিষয়গুলোতে সরাসরি ভর্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে তাদের জন্য বিশেষ আসন বরাদ্দ করতে হবে।
প্রতিরক্ষা বাহিনী (সেনা, নৌ ও বিমান), পুলিশ, কারাগার এবং সরকারি মডেল মসজিদগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষক ও ইমাম-খতিব নিয়োগে কওমী আলেমদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিসিএস, ব্যাংক, শিক্ষকতা ও অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে কওমী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা হলে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী তাদের নির্দিষ্ট গন্ডী থেকে বের হয়ে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ পাবে।
কওমী মাদ্রাসার মূল কাঠামো ঠিক রেখে সেখানে আইটি ল্যাব স্থাপন এবং কারিগরি শিক্ষার বিশেষ প্রকল্প চালু করতে হবে। এছাড়া, জাতীয় বাজেটে মাদ্রাসাগুলোর অবকাঠামো ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে।
বেফাক ও হাইআতুল উলইয়ার প্রশাসনিক কার্যক্রমে কোনো প্রকার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই তাদের অভ্যন্তরীণ স্বকীয়তা নিশ্চিতের সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি কওমী শিক্ষার্থী ও আলেমদের সামাজিক ও রাজনৈতিক হয়রানি থেকে সুরক্ষা প্রদানের জন্য কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।
সর্বোপরি কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এদেশেরই সম্পদ। ধর্মচর্চা, নৈতিকতা ও আদর্শিক দিক থেকে তারা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এক জনশক্তি। আমরা বিশ্বাস করি, উপরোক্ত দাবিগুলো বাস্তবায়িত হলে এই বিশাল জনগোষ্ঠী জাতীয় সম্পদে পরিণত হবে। আসন্ন নির্বাচনে যে রাজনৈতিক শক্তি এই প্রস্তাবনাগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করবে এবং বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেবে কওমী জনসমাজ তাদের প্রতি আস্থাশীল হবে বলে আমরা আশা করছি।